যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন বাণিজ্য নীতিকে ঘিরে একটি বড় আইনি বিরোধ তৈরি হয়েছে। ডেমোক্রেটিক পার্টি-শাসিত ২৫টি অঙ্গরাজ্য ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত নতুন আমদানি শুল্ক (ট্যারিফ)কে অবৈধ ও অসাংবিধানিক দাবি করে আদালতে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। অঙ্গরাজ্যগুলোর দাবি, এই ট্যারিফের প্রভাব শুধু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এটি মার্কিন ভোক্তা, শিল্প এবং মূল্যস্ফীতির ওপরও বিস্তৃত প্রভাব ফেলবে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের কোর্ট অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডে আবেদন করে ট্যারিফ সংক্রান্ত আদেশ বাতিলের দাবি জানিয়েছে। এমন সময় এই মামলা সামনে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতি, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক ইতোমধ্যেই বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি ৬০টি অর্থনীতি থেকে আমদানি হওয়া পণ্যের ওপর নতুন ট্যারিফ কার্যকর করেছে। প্রশাসনের দাবি, যেসব দেশে জোরপূর্বক শ্রম (Forced Labour) সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, যেসব দেশের ওপর ট্যারিফ আরোপ করা হয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের মোট আমদানির প্রায় ৯৯.৪ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে। নতুন শুল্কহার ১০ শতাংশ থেকে ১২.৫ শতাংশের মধ্যে নির্ধারণ করা হয়েছে। ভারতসহ ১৭টি দেশের ওপর ১০ শতাংশ ট্যারিফ আরোপ করা হয়েছে, আর কিছু অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রে এর চেয়ে বেশি হার প্রয়োগ করা হয়েছে।
আবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট প্রশাসন ট্রেড অ্যাক্ট ১৯৭৪-এর ধারা ৩০১-এর ভুল এবং অতিরিক্ত বিস্তৃত ব্যবহার করেছে। অঙ্গরাজ্যগুলোর যুক্তি, এই আইন বিশেষ পরিস্থিতিতে বাণিজ্যিক ভারসাম্যহীনতা বা অন্যায্য বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুমতি দেয়, তবে এটি ব্যাপক ও ইচ্ছামতো প্রয়োগ করা যায় না। আবেদনকারীদের দাবি, কংগ্রেসের স্পষ্ট অনুমোদন ছাড়া প্রেসিডেন্টের এত বড় পরিসরে নতুন আমদানি শুল্ক আরোপের ক্ষমতা নেই। তাদের মতে, এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে নির্ধারিত ক্ষমতার ভারসাম্যের পরিপন্থী।
নিউইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমস বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী বাণিজ্য ও করসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে কংগ্রেসের ভূমিকা সর্বোচ্চ। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট নিজের ইচ্ছামতো কোনো দেশের ওপর ট্যারিফ আরোপ করতে পারেন না। তাঁর অভিযোগ, ট্রাম্প প্রশাসন আইনের সীমা অতিক্রম করে নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করেছে। লেটিশিয়া জেমস আরও বলেন, আদালত যদি এই সিদ্ধান্তে স্থগিতাদেশ না দেয়, তবে এর অর্থনৈতিক প্রভাব পুরো যুক্তরাষ্ট্রে অনুভূত হবে।
আবেদনে অঙ্গরাজ্যগুলো একাধিক অর্থনৈতিক ও আইনি উদ্বেগ তুলে ধরেছে। তাদের মতে, নতুন ট্যারিফ কার্যকর হলে আমদানি করা পণ্যের ব্যয় বাড়বে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে মার্কিন ভোক্তাদের ওপর। অঙ্গরাজ্যগুলোর বক্তব্য, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত খরচ ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দিতে পারে, ফলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। এছাড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য কাঁচামালের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করা হয়েছে। আবেদনে আরও বলা হয়েছে, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল প্রভাবিত হলে বিভিন্ন শিল্পের উৎপাদন ব্যয়ও বৃদ্ধি পেতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, নতুন ট্যারিফের উদ্দেশ্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে আরও ন্যায্য করা এবং জোরপূর্বক শ্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পণ্যের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। প্রশাসনের যুক্তি, মানবাধিকার লঙ্ঘন বা Forced Labour-এর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে এমন পণ্যের আমদানি নিরুৎসাহিত করাই এই পদক্ষেপের লক্ষ্য। এছাড়া প্রশাসনের মতে, এই উদ্যোগ মার্কিন শিল্পকে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা দিতেও সহায়তা করবে। তবে আদালতে আবেদন দায়েরের পর এই নীতির আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নতুন ট্যারিফের প্রভাব ভারতসহ যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার দেশের ওপর পড়তে পারে। ভারতের ওপর ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ হওয়ায় কিছু রপ্তানি খাতের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা প্রভাবিত হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্যারিফ দীর্ঘ সময় কার্যকর থাকলে বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রবাহ, বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত এবং রপ্তানি কৌশলেও প্রভাব পড়তে পারে। তবে বিভিন্ন দেশের সরকার পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে এবং পরবর্তী কৌশল নিয়ে বিবেচনা করছে।
এখন যুক্তরাষ্ট্রের কোর্ট অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড এই মামলার শুনানি করবে। আদালত নির্ধারণ করবে, প্রেসিডেন্ট ট্রেড অ্যাক্ট ১৯৭৪-এর অধীনে নিজের ক্ষমতার যথাযথ ব্যবহার করেছেন কি না, নাকি সাংবিধানিক সীমা লঙ্ঘন করেছেন। আদালত যদি অঙ্গরাজ্যগুলোর পক্ষে রায় দেয়, তাহলে ট্রাম্প প্রশাসনকে ট্যারিফ সংক্রান্ত আদেশ সংশোধন করতে হতে পারে অথবা তা পুরোপুরি প্রত্যাহার করতে হতে পারে। অন্যদিকে, আদালত যদি প্রশাসনের পক্ষে রায় দেয়, তবে ভবিষ্যতে প্রেসিডেন্টের বাণিজ্যিক ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করার সিদ্ধান্ত হিসেবে এটি বিবেচিত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় আমদানিকারক দেশের ব্যাপক ট্যারিফ আরোপের প্রভাব শুধু অভ্যন্তরীণ বাজারে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, সরবরাহ শৃঙ্খল, উৎপাদন খাত এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও পড়তে পারে। আইনি বিরোধ দীর্ঘায়িত হলে বিভিন্ন দেশের রপ্তানিকারক এবং বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে নীতিগত অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে হতে পারে।








