কাশ্মীর, উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও নকশালপ্রভাবিত এলাকায় নিরাপত্তার উন্নতি, ২০২৯ সালের মধ্যে ভারতকে মাদকমুক্ত করার লক্ষ্য পুনর্ব্যক্ত অমিত শাহের

জাতীয় পুলিশ স্মৃতি দিবসে অমিত শাহ জানান, কাশ্মীর, উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও নকশালপ্রভাবিত এলাকায় নিরাপত্তার উন্নতি হয়েছে। ৩১ ডিসেম্বর ২০২৯-এর মধ্যে ভারতকে মাদকমুক্ত করার লক্ষ্য পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।

জাতীয় পুলিশ স্মৃতি দিবসে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন, জম্মু-কাশ্মীর, উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং নকশালপ্রভাবিত এলাকায় অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। এই অঞ্চলগুলিতে শান্তি প্রতিষ্ঠায় পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন তিনি। পাশাপাশি, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৯-এর মধ্যে ভারতকে মাদকমুক্ত করার লক্ষ্য পুনর্ব্যক্ত করে এই উদ্দেশ্য পূরণে পুলিশ বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।

দিল্লির জাতীয় পুলিশ স্মৃতিসৌধে আয়োজিত অনুষ্ঠানে কর্তব্যরত অবস্থায় প্রাণ হারানো পুলিশকর্মীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান অমিত শাহ। তিনি বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বজায় রাখা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা এবং নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পুলিশকর্মীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

শাহ শহিদ পুলিশকর্মীদের আত্মত্যাগ স্মরণ করে বলেন, দেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় তাঁদের অবদান ভোলার নয়। তিনি শহিদদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বলেন, তাঁদের ক্ষতির পূরণ সম্ভব নয়, তবে গোটা দেশ তাঁদের আত্মত্যাগকে সম্মান করে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, স্বাধীনতার পর থেকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিচালনা এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।

অমিত শাহ দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে থাকা তিনটি প্রধান চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করেন। এর মধ্যে রয়েছে জম্মু-কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদ, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি অংশে উগ্রবাদ এবং নকশালপ্রভাবিত এলাকাগুলির নিরাপত্তা পরিস্থিতি।

তিনি বলেন, এই অঞ্চলগুলিতে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ধারাবাহিক প্রচেষ্টা শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেছে। সংশ্লিষ্ট এলাকায় মোতায়েন কর্মীদের অভিযান, সাহস ও নিষ্ঠার প্রশংসা করেন তিনি।

নকশালবাদের বিরুদ্ধে অভিযানে কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ বাহিনী (CRPF), বাহিনীর CoBRA ব্যাটালিয়ন এবং ছত্তিশগড় পুলিশের অবদানের বিশেষভাবে উল্লেখ করেন শাহ। তিনি বলেন, এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নিরাপত্তাকর্মীরা কঠিন পরিস্থিতিতে কাজ করেছেন এবং তাঁদের মধ্যে অনেকে প্রাণ দিয়েছেন।

নকশালবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রায় ৩,৬০০ জন নিরাপত্তাকর্মীর আত্মত্যাগের কথা উল্লেখ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। নিরাপত্তা অভিযানে প্রাণ হারানো কর্মীদের অবদান তুলে ধরতেই তিনি এই পরিসংখ্যান উল্লেখ করেন।

দেশজুড়ে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন অমিত শাহ। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ৩১ ডিসেম্বর ২০২৯-এর মধ্যে ভারতকে মাদকমুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য পুলিশ, তদন্তকারী সংস্থা এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করতে হবে।

শাহ মাদক ব্যবসাকে সমাজ ও অর্থনীতির জন্য একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, মাদকের বিস্তার যুবসমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ক্ষতি করে। এর প্রভাব পরিবার ও সমাজের ওপরও পড়ে।

তিনি আরও বলেন, মাদকের অবৈধ ব্যবসা দেশবিরোধী কার্যকলাপে যুক্ত সংগঠনগুলিকে আর্থিক সহায়তা দিতে পারে। সেই কারণে মাদকের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত।

মাদক পাচার এবং এর সঙ্গে যুক্ত নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য পুলিশ বাহিনীকে আহ্বান জানান শাহ। এই অভিযানে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সহযোগিতা ও সমন্বয়ের ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।

জাতীয় পুলিশ স্মৃতি দিবসের অনুষ্ঠানে অমিত শাহ জানান, স্বাধীনতার পর থেকে কর্তব্য পালন করতে গিয়ে ৩৬,৮৫২ জন পুলিশকর্মী শহিদ হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে চলতি বছরে শহিদ হওয়া ১৫৪ জন পুলিশকর্মীও রয়েছেন।

তিনি বলেন, দেশের নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা এবং নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য এই কর্মীরা প্রাণ দিয়েছেন। তাঁদের আত্মত্যাগকে শুধু পরিসংখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না, কারণ প্রত্যেক শহিদের সঙ্গে একটি পরিবার এবং তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বহু আবেগ রয়েছে।

শহিদ পুলিশকর্মীদের পরিবারের প্রতি সম্মান জানিয়ে শাহ বলেন, তাঁদের অবদানের জন্য দেশ কৃতজ্ঞ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পুলিশ বাহিনীর নিষ্ঠা ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।

অনুষ্ঠানের আগে অমিত শাহ প্রায় ৯০ জন পুলিশ রাইডারের একটি দেশব্যাপী বাইক র‍্যালির সূচনা করেন। এই র‍্যালিতে বিভিন্ন কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা ও তদন্তকারী সংস্থার কর্মীরা অংশ নেন।

অংশগ্রহণকারী সংস্থাগুলির মধ্যে ছিল কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ বাহিনী (CRPF), কেন্দ্রীয় শিল্প নিরাপত্তা বাহিনী (CISF), সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনী (BSF), সশস্ত্র সীমা বল (SSB), ভারত-তিব্বত সীমান্ত পুলিশ (ITBP) এবং জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষী (NSG)। এ ছাড়া রেলওয়ে সুরক্ষা বাহিনী (RPF), জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (NDRF) এবং জাতীয় তদন্ত সংস্থার (NIA) কর্মীরাও অংশ নেন বলে জানানো হয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, র‍্যালিটি বিভিন্ন রাজ্যের মধ্য দিয়ে গুজরাটের একতা নগরে পৌঁছবে। সেখানে ৩১ অক্টোবর ২০২৬-এ সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত একতা প্যারেডে রাইডাররা অংশ নেবেন। ৩১ অক্টোবর জাতীয় ঐক্য দিবস হিসেবে পালিত হয়।

এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য নিরাপত্তা বাহিনীর অংশগ্রহণের মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য এবং মাদকবিরোধী সচেতনতার বার্তা বৃহত্তর পরিসরে পৌঁছে দেওয়া।

ভারতে প্রতি বছর ২১ অক্টোবর জাতীয় পুলিশ স্মৃতি দিবস পালিত হয়। কর্তব্য পালন করতে গিয়ে যেসব পুলিশকর্মী প্রাণ দিয়েছেন, তাঁদের স্মরণে এই দিনটি উৎসর্গ করা হয়েছে।

এই দিবসের ঐতিহাসিক যোগসূত্র রয়েছে ২১ অক্টোবর ১৯৫৯ সালের একটি ঘটনার সঙ্গে। ওই দিন লাদাখের হট স্প্রিংস এলাকায় চিনা সেনাদের অতর্কিত হামলার মোকাবিলা করতে গিয়ে কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ বাহিনীর ১০ জন জওয়ান শহিদ হন।

সেই জওয়ানদের আত্মত্যাগের স্মরণে প্রতি বছর এই দিবস পালন করা হয়। এই উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর শহিদ কর্মীদের স্মরণ করা হয় এবং তাঁদের পরিবারের প্রতি সম্মান জানানো হয়।

জাতীয় পুলিশ স্মৃতি দিবস পুলিশকর্মীদের কর্তব্য, সাহস ও সেবার প্রতি সম্মান জানানোর পাশাপাশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাঁদের ভূমিকা তুলে ধরারও একটি উপলক্ষ।

Leave a comment