রাজস্থানে নগর ও পঞ্চায়েত নির্বাচন নিয়ে বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক অপব্যবহারের অভিযোগ গেহলতের

অশোক গেহলত রাজস্থানের বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে নগর ও পঞ্চায়েত নির্বাচনে প্রশাসনিক যন্ত্রের কথিত অপব্যবহার, আইনশৃঙ্খলা এবং লোহাওয়াট হত্যাকাণ্ড নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন।

রাজস্থানের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলত রবিবার জয়পুরে নিজের বাসভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে রাজ্যের বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে নগর ও পঞ্চায়েত নির্বাচন নিয়ে প্রশাসনিক যন্ত্রের কথিত অপব্যবহারের অভিযোগ তুলেছেন। গেহলত দাবি করেন, নির্বাচনে বিজেপিকে সুবিধা পাইয়ে দিতে প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে ব্যবহার করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, বিজেপির পক্ষে কাজ করার জন্য জেলা কালেক্টর ও পুলিশ সুপারদের ওপর চাপ তৈরি করা হচ্ছে।

গেহলত বলেন, তিনি কোনও রাজনৈতিক অনুমানের ভিত্তিতে এই অভিযোগ করছেন না, বরং তাঁর কাছে থাকা ফিডব্যাকের ভিত্তিতে অভিযোগ তুলছেন। তাঁর বক্তব্য, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রশাসনের সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকা উচিত এবং কোনও রাজনৈতিক দলের পক্ষে কাজ করার জন্য কর্মকর্তাদের ওপর চাপ দেওয়া উচিত নয়।

গেহলত অভিযোগ করেন, রাজ্যের বিজেপি সরকার নগর ও পঞ্চায়েত নির্বাচনে সম্ভাব্য পরাজয় নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাঁর দাবি, সেই কারণেই নির্বাচনের আগে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করা হচ্ছে এবং শাসক দলের পক্ষে নির্বাচনী পরিবেশ তৈরির জন্য তাঁদের প্রভাবিত করা হচ্ছে।

গেহলত দাবি করেন, মুখ্যমন্ত্রীর পক্ষ থেকে কালেক্টর ও এসপিদের দলবদ্ধভাবে ডেকে নির্বাচনী প্রস্তুতি নিয়ে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, কর্মকর্তাদের বিজেপিকে নির্বাচনে জেতানোর দায়িত্ব দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে গেহলতের এই অভিযোগের সমর্থনে কোনও প্রকাশ্য নথি বা প্রত্যক্ষ প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। রাজ্য সরকার বা বিজেপির পক্ষ থেকেও এই অভিযোগের বিষয়ে কোনও সরকারি প্রতিক্রিয়া সামনে আসেনি।

অশোক গেহলত আরও অভিযোগ করেন, বিজেপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার শুরু থেকেই নগর ও পঞ্চায়েত নির্বাচন আয়োজন করতে আগ্রহী ছিল না। তাঁর দাবি, আদালতের মন্তব্য এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার চাপের পর সরকারকে নির্বাচন আয়োজনের দিকে এগোতে হয়েছে।

গেহলতের বক্তব্য, নির্বাচন ঘনিয়ে আসতেই সরকার প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক নির্বাচনে প্রশাসনের ভূমিকা নিরপেক্ষ হওয়া উচিত এবং সব রাজনৈতিক দলকে সমান সুযোগ দেওয়া উচিত।

তিনি সরকারের কাছে নির্বাচনী প্রক্রিয়া স্বচ্ছ রাখা এবং কর্মকর্তাদের যেকোনও রাজনৈতিক চাপ থেকে মুক্ত রাখার দাবি জানান।

সংবাদ সম্মেলনে গেহলত বিজেপি সরকারের অভ্যন্তরে প্রশাসন নিয়ে কথিত অসন্তোষের বিষয়টিও তোলেন। তিনি বলেন, রাজ্যে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে সরকারের এক মন্ত্রীকেই কালেক্টর ও কমিশনারের বিরুদ্ধে প্রায় ছয় ঘণ্টা ধরনায় বসতে হয়েছে।

গেহলত বলেন, এই ঘটনা প্রশাসনিক ব্যবস্থার পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তাঁর বক্তব্য, সরকারের নিজস্ব মন্ত্রীরাই যদি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ধরনায় বসতে বাধ্য হন, তাহলে প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে সমন্বয়ের পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

তিনি এই ঘটনাকে বিজেপি সরকারের প্রশাসনিক কাজকর্ম নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রসঙ্গ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে আরও ভালো সমন্বয় নিশ্চিত করার দাবি জানান।

গেহলত যোধপুর জেলার লোহাওয়াটে হওয়া ব্লাইন্ড মার্ডার মামলাটি নিয়েও রাজ্য সরকারের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ঘটনার কয়েক দিন পেরিয়ে গেলেও অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা হয়নি।

সাবেক মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে অভিযুক্তদের গ্রেফতারের লিখিত আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও মামলায় প্রত্যাশিত পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

গেহলত মুখ্যমন্ত্রী এবং পুলিশ মহাপরিচালকের কাছে মামলার বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্ট করার দাবি জানান। তাঁর প্রশ্ন, পুলিশের কাছে মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত সূত্র থাকলে তদন্ত ও গ্রেফতারে দেরি হচ্ছে কেন।

তবে কোনও তদন্তকারী সংস্থা অভিযুক্তদের পরিচয়, গ্রেফতার বা রাজনৈতিক চাপের অভিযোগ নিশ্চিত করেছে কি না, তা সরকারি ভাবে স্পষ্ট নয়।

সংবাদ সম্মেলনে গেহলত বন্দে মাতরম নিয়ে চলমান রাজনৈতিক বিতর্ক নিয়েও মন্তব্য করেন। বিজেপি ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের সমালোচনা করে তিনি বলেন, বন্দে মাতরম ইস্যুতে কথা বলার নৈতিক অধিকার তাদের নেই।

গেহলত দাবি করেন, স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় বিজেপি ও আরএসএসের কোনও ভূমিকা ছিল না। তিনি বর্তমান রাজনৈতিক বিতর্ককে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে যুক্ত করে বিরোধী দলগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

সাম্প্রতিক দিনগুলিতে বন্দে মাতরম নিয়ে বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে রাজনৈতিক বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্য বেড়েছে। দুই দলই বিষয়টিকে ভিন্ন রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে তুলে ধরছে। গেহলতের মন্তব্য এই বৃহত্তর রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ।

বিভিন্ন দাবিতে অনশনরত যুবক ও অন্যান্য আন্দোলনকারীদের কাছেও গেহলত আবেদন জানান। তিনি বলেন, আন্দোলনকারীরা নিজেদের দাবির জন্য সংগ্রাম করুন, কিন্তু নিজেদের স্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলবেন না।

তিনি অনশনের পরিবর্তে ধরনা, বিক্ষোভ এবং অন্যান্য গণতান্ত্রিক মাধ্যমে সরকারের কাছে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার পরামর্শ দেন। গেহলত বলেন, যে কোনও গণতান্ত্রিক সরকারের দায়িত্ব আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনা করা এবং তাঁদের সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা।

সাবেক মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, বর্তমান সরকার আন্দোলনরত মানুষের দাবি ও স্বাস্থ্যের বিষয়কে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না। তিনি সরকারের কাছে আলোচনার প্রক্রিয়া শুরু করার আবেদন জানান।

গেহলত রাজস্থানের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, ধারাবাহিকভাবে সামনে আসা অপরাধমূলক ঘটনার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি বাড়ছে।

সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানান। তাঁর বক্তব্য, আইনশৃঙ্খলা যে কোনও সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব এবং মানুষের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা উচিত।

গেহলত স্বাস্থ্য পরিষেবা ও জনকল্যাণমূলক প্রকল্প নিয়েও রাজ্য সরকারের সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, আগের সরকারের একাধিক প্রকল্পকে দুর্বল করা বা তাতে পরিবর্তন আনার ফলে দরিদ্র ও প্রয়োজনমতো সহায়তা প্রয়োজন এমন মানুষ সমস্যার মুখে পড়ছেন।

রাজস্থানে নগর ও পঞ্চায়েত নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়ার মধ্যে গেহলতের অভিযোগে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। প্রশাসনিক যন্ত্রের কথিত অপব্যবহারের অভিযোগ তুলে কংগ্রেস আসন্ন নির্বাচনে নিরপেক্ষতার বিষয়টি সামনে আনছে।

গেহলত সরকারের কাছে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ওপর যেকোনও ধরনের রাজনৈতিক চাপ এড়ানো, আইনশৃঙ্খলা জোরদার করা এবং জনসাধারণের সমস্যায় সংবেদনশীলতার সঙ্গে কাজ করার দাবি জানান।

Leave a comment