ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেই এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আনুষ্ঠানিকতা শুক্রবার থেকে শুরু হয়েছে। প্রায় চার মাসের অপেক্ষার পর শুরু হওয়া এই কর্মসূচি ৯ জুলাই পর্যন্ত চলবে। তেহরানে শুরু হওয়া এসব অনুষ্ঠানকে কেবল ধর্মীয় বা রাষ্ট্রীয় বিদায় হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, ধর্মীয় ঐক্য এবং জনসমর্থনের প্রদর্শন হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রে থাকা অবস্থায় এই অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা ইরনার তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ তেহরানে আসছেন। কর্মকর্তাদের ধারণা, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ও শ্রদ্ধাঞ্জলি কর্মসূচিতে কয়েক কোটি মানুষ অংশ নিতে পারেন।
তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা মসজিদে আয়াতুল্লাহ খামেনেই এবং তাঁর পরিবারের একাধিক সদস্যের কফিন সর্বসাধারণের শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য রাখা হয়েছে। খামেনেইর মরদেহ ইরানের জাতীয় পতাকায় মোড়ানো হয়েছে এবং কফিনের ওপর শিয়া ঐতিহ্যের প্রতীক ‘ইয়া হুসাইন’ লেখা লাল পতাকা রাখা হয়েছে।
ইরানের সরকার এবং ধর্মীয় নেতৃত্ব নাগরিকদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় সর্বোচ্চ সংখ্যায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অনুষ্ঠান কেবল শোক প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই বার্তা দেওয়ার প্রচেষ্টা যে, বহিরাগত চাপ ও আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যেও ইরানের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ব্যবস্থা দৃঢ় রয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এই অনুষ্ঠান বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাপক জনঅংশগ্রহণের মাধ্যমে ইরান সম্ভাব্য কূটনৈতিক আলোচনা এবং আঞ্চলিক কৌশলগত ইস্যুতে নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী হিসেবে তুলে ধরতে চায়।
![]()
তেহরানে আয়োজিত শ্রদ্ধাঞ্জলি অনুষ্ঠানে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি, পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ এবং প্রধান বিচারপতি গোলামহোসেইন মোহসেনি এজেইসহ বহু জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
নিরাপত্তাজনিত কারণে বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনেই কোনো জনসমাবেশে অংশ নেবেন না। কর্মকর্তাদের মতে, তাঁর নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
ইরানের তথ্য অনুযায়ী, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় ৩০টির বেশি দেশের সরকারি প্রতিনিধি এবং প্রায় ৯০টি দেশের ধর্মীয় প্রতিনিধির অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাকিস্তান, রাশিয়া, চীন, ইরাক, ওমান এবং জর্জিয়াসহ একাধিক দেশ তাদের প্রতিনিধিদল পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। ভারতের পক্ষ থেকেও একটি সরকারি প্রতিনিধিদল তেহরানে পৌঁছে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে। এছাড়া বিভিন্ন দেশের ধর্মীয় নেতা ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের উপস্থিতি এই অনুষ্ঠানকে আন্তর্জাতিক গুরুত্ব দিয়েছে।
বিপুল জনসমাগমের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে ইরানজুড়ে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। রাজধানী তেহরানসহ প্রধান শহরগুলোতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে এবং জনসমাগম নিয়ন্ত্রণে বিশেষ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
নিরাপত্তা সংস্থাগুলো বিশেষ সতর্ক রয়েছে, কারণ ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহোল্লাহ খোমেনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া এবং পরে জেনারেল কাসেম সোলেইমানির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে পদদলিত হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছিল। এবার প্রশাসন এমন পরিস্থিতি এড়াতে আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা এবং বিস্তৃত নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, আয়াতুল্লাহ খামেনেইর মরদেহ গত চার মাস ধরে নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রার ফরেনসিক কোল্ড স্টোরেজে সংরক্ষণ করা হয়েছিল। ইসলামি প্রথায় রাসায়নিক সংরক্ষণের অনুমতি না থাকায় শুধুমাত্র শীতল সংরক্ষণ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। শিয়া ধর্মীয় আলেমরা বিশেষ পরিস্থিতির কারণে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় বিলম্ব এবং মরদেহ নিম্ন তাপমাত্রায় সংরক্ষণের ধর্মীয় অনুমতি দিয়েছিলেন।
অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার কর্মসূচি একাধিক ধাপে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তেহরানে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর শেষযাত্রা দেশের বিভিন্ন এলাকা অতিক্রম করে ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ শহর কোমে পৌঁছাবে। এরপর ইরাকের নাজাফ ও কারবালায়ও শ্রদ্ধাঞ্জলি কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে শিয়া সম্প্রদায়ের জন্য অত্যন্ত পবিত্র ধর্মীয় স্থান অবস্থিত।











