শিক্ষক দিবসে এমন একজন মানুষকে মনে করা যায়, যাঁর কর্মজীবনের শুরু হয়েছিল শিক্ষকতা দিয়ে, অথচ পরবর্তীকালে সিনেমার জগতে তৈরি করেছিলেন নিজের আলাদা সাম্রাজ্য। অঙ্ক ও বিজ্ঞানের অধ্যাপক থেকে ক্যামেরার নেপথ্যের কর্মী, সেখান থেকে বলিউডের অন্যতম সফল পরিচালক—হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায়ের জীবন যেন সিনেমারই এক গল্প।
অঙ্ক-বিজ্ঞানের অধ্যাপক ছিলেন হৃষিকেশ
সিনেমায় আসার আগে অল্প সময়ের জন্য অধ্যাপনা করেছিলেন হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায়। অঙ্ক ও বিজ্ঞানের মতো তুলনামূলক কঠিন বিষয় পড়ানোর অভিজ্ঞতা ছিল তাঁর। কিন্তু শিক্ষকতার গণ্ডিতে বেশিদিন আটকে থাকেননি তিনি। সৃজনশীলতার টানে পা রাখেন চলচ্চিত্রের জগতে।
নিউ থিয়েটার্স থেকে মুম্বইয়ের পথে
১৯৪০-এর দশকের শেষদিকে কলকাতায় বি. এন. সরকারের নিউ থিয়েটার্সে কাজ শুরু করেন তিনি। প্রথমে ক্যামেরার কাজের সঙ্গে যুক্ত হন, পরে ফিল্ম এডিটিংয়ের দায়িত্বও সামলান।১৯৫১ সালে মুম্বইয়ে গিয়ে পরিচালক বিমল রায়ের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পান। এডিটর এবং সহকারী পরিচালক হিসেবে তিনি বিমল রায়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ‘দো বিঘা জমিন’ এবং ‘দেবদাস’-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ ছবির কাজের অভিজ্ঞতা তাঁর পরবর্তী পরিচালনার জীবনে বড় প্রভাব ফেলেছিল।
প্রথম ছবি ব্যর্থ, তারপরই বদলে গেল গল্প
১৯৫৭ সালে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায়। তাঁর প্রথম ছবি ছিল ‘মুসাফির’। ছবিটি প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। কিন্তু ব্যর্থতায় থেমে যাননি তিনি।এরপর ১৯৫৯ সালে মুক্তি পায় ‘আনারি’। এই ছবির মাধ্যমে পরিচালক হিসেবে নিজের দক্ষতার পরিচয় দেন তিনি। তারপর একের পর এক জনপ্রিয় ছবি তৈরি করে বলিউডে নিজের জায়গা শক্ত করেন।
সাধারণ মানুষের গল্পই ছিল তাঁর ছবির প্রাণ
হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায়ের সিনেমার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল সাধারণ জীবনকে অসাধারণ করে তুলে ধরা। মধ্যবিত্ত পরিবার, সম্পর্ক, বন্ধুত্ব, মূল্যবোধ, হাসি-কান্না—এসবই তাঁর গল্পের মূল উপাদান হয়ে উঠত।‘অনুরাধা’, ‘ছায়া’, ‘আসলি-নকলি’, ‘অনুপমা’, ‘সত্যকাম’, ‘গুড্ডি’, ‘আনন্দ’, ‘বাওয়ার্চি’, ‘মিলি’, ‘চুপকে চুপকে’, ‘আলাপ’, ‘গোল মাল’, ‘খুবসুরত’ এবং ‘বেমিসাল’-এর মতো একাধিক ছবি তাঁর পরিচালনার কৃতিত্বকে সমৃদ্ধ করেছে।
জয়া ভাদুড়ির কেরিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ ছবি ‘গুড্ডি’
হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায়ের ‘গুড্ডি’ ছবির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জয়া ভাদুড়ির হিন্দি সিনেমায় পরিচয়ের গল্প। পরবর্তীকালে জয়া বচ্চন হয়ে ওঠা এই অভিনেত্রীকে দর্শকদের সামনে নতুনভাবে তুলে ধরেছিল ছবিটি।তাঁর পরিচালনায় জয়ার অভিনয়ও প্রশংসিত হয়েছিল। ফলে ‘গুড্ডি’ শুধু একটি জনপ্রিয় ছবি নয়, অভিনেত্রীর কেরিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবেও বিবেচিত হয়।
‘আনন্দ’-এ রাজেশ খান্না-অমিতাভের যুগলবন্দি
১৯৭১ সালের ‘আনন্দ’ হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায়ের অন্যতম স্মরণীয় ছবি। রাজেশ খান্নার সঙ্গে অমিতাভ বচ্চনকে একই ছবিতে দেখা গিয়েছিল। এই ছবিতে অমিতাভ বচ্চনের চরিত্র দর্শকদের বিশেষভাবে নজর কাড়ে এবং তাঁর কেরিয়ারে এটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হয়ে ওঠে।ফলে ‘আনন্দ’ শুধু একটি আবেগঘন ছবি হিসেবেই নয়, অমিতাভ বচ্চনের কেরিয়ারের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হিসেবেও স্মরণীয়।
‘চুপকে চুপকে’-তে অন্য অবতারে ধর্মেন্দ্র
গম্ভীর ও রোম্যান্টিক চরিত্রে পরিচিত ধর্মেন্দ্রকে একেবারে অন্য মেজাজে দর্শকদের সামনে হাজির করেছিলেন হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায়। ‘চুপকে চুপকে’-তে তাঁর কমেডি অভিনয় আজও হিন্দি সিনেমার অন্যতম জনপ্রিয় উদাহরণ।এই ছবির সাফল্যও প্রমাণ করে দিয়েছিল, একজন অভিনেতার পরিচিত ইমেজের বাইরে গিয়ে তাঁকে নতুনভাবে ব্যবহার করার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল পরিচালকের।
আজও স্মরণীয় তাঁর সিনেমা
হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায়ের ছবির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল মানুষের সঙ্গে তার সহজ যোগাযোগ। তাঁর গল্পে বড় কোনও জাঁকজমক না থাকলেও চরিত্রগুলির আবেগ, সম্পর্ক এবং দৈনন্দিন জীবনের টানাপোড়েন দর্শকদের খুব সহজেই ছুঁয়ে যেত।অঙ্ক ও বিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা সেই মানুষটিই শেষ পর্যন্ত ভারতীয় সিনেমায় এমন এক অধ্যায় তৈরি করেন, যা আজও দর্শক ও চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে সমান প্রাসঙ্গিক।
একসময় অঙ্ক ও বিজ্ঞানের অধ্যাপনা করতেন। পরে ক্যামেরার নেপথ্যে কাজ শুরু করে হয়ে ওঠেন ভারতীয় সিনেমার অন্যতম জনপ্রিয় পরিচালক। তাঁর সহজ-সরল গল্প, হাসি-কান্নায় মেশানো চরিত্র এবং মধ্যবিত্ত জীবনের ছবি আজও দর্শকদের মনে জায়গা করে আছে। তিনি হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায়।









