প্যাংগং লেকের পরিচিত সৌন্দর্য পেরিয়ে এবার অজানা এক পাহাড়ি ভূখণ্ডের দিকে পা বাড়ালেন বাংলার পর্বতারোহীরা। ভারত-চিন সীমান্তের দুর্গম চ্যাং চেনমো শৃঙ্গ জয়ের লক্ষ্যে সোনারপুর থেকে রওনা হয়েছে ১৫ সদস্যের একটি দল। এভারেস্টজয়ী রুদ্রপ্রসাদ হালদারের নেতৃত্বাধীন এই অভিযানে রয়েছেন সেভেন সামিট সম্পূর্ণ করা সত্যরূপ সিদ্ধান্তও। তবে এই অভিযান সাধারণ পর্বতারোহণের মতো নয়—শেরপা বা স্থানীয় গাইড তো দূরের কথা, ওয়াকিটকি কিংবা ড্রোনের মতো আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থাও ব্যবহার করতে পারবেন না অভিযাত্রীরা।
‘এক্সপেডিশন ইনটু দ্য আনক্নোন’
চ্যাং চেনমো শৃঙ্গ অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘এক্সপেডিশন ইনটু দ্য আনক্নোন’। সোমবার সোনারপুরে একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে অভিযানের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। এরপর মঙ্গলবার দুর্গম শৃঙ্গের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন ১৫ জন সদস্য।সোনারপুর আরোহী, ক্যাফে পজিটিভ এবং সিটিজেনস ফর সোশ্যাল জাস্টিসের উদ্যোগে এই অভিযানের আয়োজন করা হয়েছে। লক্ষ্য শুধু একটি শৃঙ্গে ওঠা নয়, বরং এমন একটি এলাকায় পর্বতারোহণের নতুন দিগন্ত তৈরি করা, যেখানে এখনও কোনও আরোহীর পদচিহ্ন পড়েনি বলে দাবি করা হচ্ছে।
প্যাংগং লেকের উত্তরে ফোব্রাং থেকে শুরু হবে মূল অভিযান
অভিযাত্রীদের যাত্রাপথও বেশ দীর্ঘ এবং কঠিন। জম্মু থেকে সোনমার্গ, কার্গিল এবং লেহ হয়ে তাঁরা পৌঁছবেন ফোব্রাংয়ে। প্যাংগং হ্রদের উত্তরে অবস্থিত এই এলাকা থেকেই চ্যাং চেনমো উপত্যকার দিকে এগোবেন তাঁরা।দুর্গম ভূপ্রকৃতি, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং সীমান্ত এলাকার কঠোর বিধিনিষেধ—সবকিছু সামলে অভিযাত্রীদের এগোতে হবে। ফলে এই অভিযান শারীরিক সক্ষমতার পাশাপাশিমানসিক দৃঢ়তারও বড় পরীক্ষা হতে চলেছে।
নেতৃত্বে এভারেস্টজয়ী রুদ্রপ্রসাদ
এই বিশেষ অভিযানের নেতৃত্বে রয়েছেন এভারেস্টজয়ী পর্বতারোহী রুদ্রপ্রসাদ হালদার। তাঁর সঙ্গে দলে রয়েছেন একাধিক অভিজ্ঞ পর্বতারোহী।১৫ সদস্যের দলটি হল—রুদ্রপ্রসাদ হালদার, সত্যরূপ সিদ্ধান্ত, অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায়, নৈতিক নস্কর, দেবাশিস মজুমদার, তুহিন ভট্টাচার্য, দীপশ্রী পাল, বৃকরাজ রায়, নিরঞ্জন পাল, অপারেশ শানিগ্রাহী, ভাস্কর হালদার, ইয়াসমিনা খান, রাহুল হালদার, রতন আচার্য এবং মলয় পুরকাইত।
দলে ‘সেভেন সামিট’ জয়ী সত্যরূপও
এই অভিযানের অন্যতম উল্লেখযোগ্য সদস্য সত্যরূপ সিদ্ধান্ত। তিনি বিশ্বের সাত মহাদেশের সর্বোচ্চ সাতটি শৃঙ্গ—অর্থাৎ ‘সেভেন সামিট’—জয় করার কৃতিত্ব অর্জন করেছেন।তাঁর মতো অভিজ্ঞ পর্বতারোহীর উপস্থিতি দলের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে আরও সমৃদ্ধ করবে বলেই মনে করা হচ্ছে। তবে চ্যাং চেনমোর মতো অনাবিষ্কৃত বা অত্যন্ত দুর্গম শৃঙ্গের ক্ষেত্রে পূর্ব অভিজ্ঞতার পাশাপাশি পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সেনার বিশেষ অনুমতি নিয়ে সংবেদনশীল এলাকায় প্রবেশ
চ্যাং চেনমো অঞ্চল ভারত-চিন সীমান্তের অত্যন্ত সংবেদনশীল এলাকার মধ্যে পড়ে। সাধারণ নাগরিকদের এই এলাকায় অবাধে প্রবেশের অনুমতি নেই। তাই বিশেষ সরকারি অনুমতির প্রয়োজন হয়।দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর অভিযাত্রী দলটি ভারত সরকারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অনুমতি পেয়েছে বলে জানা গিয়েছে। তবে অনুমতির সঙ্গে একাধিক কঠোর শর্তও জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
ওয়াকিটকি-ড্রোন নিষিদ্ধ, বিপদে ফিরতে হবে হেঁটে
এই অভিযানের সবচেয়ে কঠিন দিকগুলির একটি হল যোগাযোগ ব্যবস্থা। অভিযানের সময় ওয়াকিটকি, ড্রোন-সহ আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহারের অনুমতি নেই।পাহাড়ে কোনও বিপদ বা জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে অভিযাত্রীদের নিজেরাই হেঁটে নিচে নেমে এসে সেনাবাহিনীকে খবর দিতে হবে। অর্থাৎ জরুরি পরিস্থিতিতেও তাৎক্ষণিকযোগাযোগের সুযোগ থাকবে না।
শেরপা বা স্থানীয় গাইডও থাকছেন না
সাধারণত দুর্গম উচ্চতায় অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে শেরপা বা স্থানীয় গাইডদের সাহায্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। কিন্তু এই অভিযানে সেই সুবিধাও থাকছে না।সরকারি বিধিনিষেধের কারণে কোনও শেরপা বা স্থানীয় গাইডের সহায়তা নেওয়া যাবে না। ফলে পুরো অভিযান নিজেদের দক্ষতা, প্রস্তুতি এবং অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করেই সম্পন্ন করতে হবে ১৫ সদস্যের দলকে।
অজানা শৃঙ্গে প্রথম পদচিহ্নের অপেক্ষা
চ্যাং চেনমো শৃঙ্গের সবচেয়ে বড় আকর্ষণই হল এর অজানা চরিত্র। এখনও পর্যন্ত সেখানে কোনও পর্বতারোহীর পদচিহ্ন পড়েনি বলে দাবি করা হয়েছে। তাই অভিযান সফল হলে শুধু সোনারপুর বা বাংলার জন্য নয়, ভারতীয় পর্বতারোহণের ক্ষেত্রেও এটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য হয়ে উঠতে পারে।অবশ্য দুর্গম এবং সংবেদনশীল সীমান্ত এলাকায় অভিযান হওয়ায় নিরাপত্তাই থাকবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
ভারত-চিন সীমান্তের অত্যন্ত দুর্গম চ্যাং চেনমো শৃঙ্গ জয়ের লক্ষ্যে অভিযানে নেমেছে সোনারপুরের ১৫ সদস্যের পর্বতারোহী দল। প্যাংগং লেকের উত্তরে ফোব্রাং হয়ে চ্যাং চেনমো উপত্যকায় প্রবেশ করবেন তাঁরা। এই শৃঙ্গে এখনও কোনও পর্বতারোহীর পদচিহ্ন পড়েনি বলে অভিযাত্রীদের দাবি। এভারেস্টজয়ী রুদ্রপ্রসাদ হালদারের নেতৃত্বে এই দলে রয়েছেন সেভেন সামিট সম্পূর্ণ করা সত্যরূপ সিদ্ধান্তও। সীমান্তের সংবেদনশীল এলাকার কারণে একাধিক কঠোর বিধিনিষেধ মেনেই অভিযান চালাতে হবে।












