১০ অক্টোবর দিল্লির যন্তর মন্তরে প্রস্তাবিত বিক্ষোভের আগে ককরোচ জনতা পার্টি (CJP) এবং স্টুডেন্টস ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়া (SFI) কর্মীদের আটক করার অভিযোগ তুলেছে। অন্যদিকে, দিল্লি পুলিশ হোটেল ও গেস্ট হাউসের নথিপত্র যাচাই এবং রাজধানীতে আসা বিভিন্ন গোষ্ঠীর ওপর নজরদারি জোরদার করেছে।
CJP-র অভিযোগ, পুনে থেকে দিল্লি আসা কয়েকজন শিক্ষার্থীকে যাত্রাপথে আটক করা হয়েছে। দলের দাবি, ওই শিক্ষার্থীদের বাস থেকে নামিয়ে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সংগঠনটি মধ্যপ্রদেশের একটি ভিডিওও সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করেছে, যেখানে বাসের ভিতরে কয়েকজন তরুণকে দেখা যাচ্ছে। ভিডিওতে এক যুবক দাবি করেছেন, মধ্যপ্রদেশ পুলিশ তাঁকে আটক করেছিল।
তবে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও এবং আটকের সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্ত দাবির স্বাধীনভাবে যাচাই করা নিশ্চিত তথ্য উপলব্ধ নেই। ফলে পুলিশি বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই না করে এই ঘটনাগুলি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
CJP এবং দলের সঙ্গে যুক্ত সমর্থকদের অভিযোগ, পুলিশ কর্মীদের বাড়িতে গিয়ে তাঁদের পরিবারের সদস্যদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। সংগঠনটির দাবি, এই ধরনের পদক্ষেপের ফলে ১০ অক্টোবরের বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করা ব্যক্তিদের মধ্যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
বামপন্থী ছাত্র সংগঠন SFI-ও অভিযোগ করেছে, পুলিশ তাদের এবং অন্যান্য গণতান্ত্রিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের বাড়িতে যাচ্ছে। সংগঠনটির দাবি, কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের ভয় দেখানো হয়েছে।
আটক হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে SFI-এর সাহারানপুর জেলা সমন্বয়ক আরিফের নামও উল্লেখ করেছে সংগঠনটি। এ ছাড়া, অল ইন্ডিয়া কিষান সভার নেতা দাউদ রাওকে আটক করারও অভিযোগ উঠেছে।
এই অভিযোগগুলির ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হল, প্রস্তাবিত বিক্ষোভে যোগ দিতে যাত্রা করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না। সংশ্লিষ্ট পুলিশ আধিকারিকদের বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রতিটি ঘটনার পরিস্থিতি স্পষ্ট হলেই জানা যাবে, কাদের আটক করা হয়েছে, কী কারণে পদক্ষেপ করা হয়েছে এবং তাঁদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে কি না।
১০ অক্টোবরের বিক্ষোভের আগে দিল্লি পুলিশ রাজধানীতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে। হিন্দুস্তান টাইমসের ৯ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুলিশ আধিকারিকেরা হোটেল, গেস্ট হাউস এবং অন্যান্য আবাসনে গিয়ে অতিথিদের ভ্রমণের উদ্দেশ্য ও থাকার সময়কাল সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। কয়েকজন অতিথি এবং হোটেলকর্মীও পুলিশের এই ধরনের পরিদর্শনের কথা নিশ্চিত করেছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিক্ষোভে যোগ দিতে দিল্লিতে আসতে পারে এমন গোষ্ঠীগুলিকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে পুলিশ। এ জন্য অতিথিদের থাকার নথি, পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য এবং ঘর বুকিংয়ের বিবরণ যাচাই করা হচ্ছে।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রস্তাবিত বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে দিল্লি পুলিশ অতিরিক্ত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থাও গ্রহণ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যন্তর মন্তরে প্রস্তাবিত বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হয়নি এবং সম্ভাব্য জমায়েত নিয়ন্ত্রণের প্রস্তুতি নিয়েছিল প্রশাসন।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ১০ অক্টোবর দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের ঘোষণা করেছিল CJP। দলের নেতা অভিজিৎ দীপকে এর আগে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করে বলেছিলেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার পদত্যাগ না করলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সমর্থকেরা দিল্লিতে আসবেন।
দীপকে তাঁর বার্তায় বিক্ষোভকে গণতান্ত্রিক অধিকার এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতার সঙ্গে যুক্ত করে সরকারের সমালোচনা করেন। তিনি আরও দাবি করেন, মানুষকে আটক করে প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করা যাবে না।
নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (Special Intensive Revision বা SIR) নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কের সঙ্গেও এই বিক্ষোভ যুক্ত। বিরোধী দল এবং কয়েকটি নাগরিক সংগঠনের অভিযোগ, ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করা ও বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবির পেছনে নির্বাচন কমিশনের কার্যপ্রণালি নিয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশি গত ১০ মাসে SIR-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত ও নির্দেশের বিষয়ে অন্তত ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছিলেন।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, কয়েকটি সিদ্ধান্ত তাঁদের অবগত করা বা তাঁদের সুপারিশ নেওয়া ছাড়াই গ্রহণ করা হয়েছিল বলে ওই দুই আধিকারিক প্রশ্ন তুলেছিলেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আপত্তির বিষয়গুলির মধ্যে ছিল ভোটার তালিকায় নতুন নাম অন্তর্ভুক্ত করা, নাম বাদ দেওয়া, কিছু নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করা এবং নির্বাচনী তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সফটওয়্যারে প্রবেশাধিকার। ভোটার নিবন্ধনের জন্য ব্যবহৃত ফর্ম-৬-এ SIR-সংক্রান্ত প্রশ্ন যুক্ত করার বিষয়েও আপত্তির কথা উঠে এসেছিল।
তবে এই প্রতিবেদনগুলির জবাবে নির্বাচন কমিশনের আধিকারিকেরা বলেছিলেন, কমিশনের সিদ্ধান্তগুলি সর্বসম্মতিক্রমে নেওয়া হয়েছিল এবং নথিভুক্ত মন্তব্যগুলি সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ারই অংশ ছিল। ফলে উভয় পক্ষের বক্তব্য এবং উপলব্ধ নথিপত্র পৃথকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
দিল্লিতে প্রস্তাবিত বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রতিবাদ, নাগরিক স্বাধীনতা এবং জনশৃঙ্খলা বজায় রাখার মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। CJP এবং SFI-এর মতো সংগঠনগুলি আটকের অভিযোগকে প্রতিবাদের অধিকারের সঙ্গে যুক্ত করছে। অন্যদিকে, পুলিশ প্রশাসন রাজধানীতে সম্ভাব্য জমায়েত নিয়ন্ত্রণ এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এই ঘটনাপ্রবাহ দিল্লির বাইরেও রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কর্মীদের আসার সম্ভাবনা, ছাত্র সংগঠনগুলির অংশগ্রহণ এবং নির্বাচন কমিশনের কার্যপ্রণালি নিয়ে ওঠা প্রশ্ন এই পরিস্থিতিকে জাতীয় রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
এখনও পর্যন্ত আটক ব্যক্তিদের মোট সংখ্যা, প্রতিটি ক্ষেত্রে পদক্ষেপের আইনি ভিত্তি এবং বিক্ষোভে সম্ভাব্য অংশগ্রহণকারীদের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্যের অভাব রয়েছে। ১০ অক্টোবরের ঘটনাপ্রবাহে পুলিশের পদক্ষেপ, বিক্ষোভকারীদের প্রতিক্রিয়া এবং প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের মাধ্যমে পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হতে পারে।












