দুর্গাপুজো মানেই মাটি, খড়, বাঁশ আর শিল্পীর নিপুণ হাতে দেবী দুর্গার রূপ ফুটিয়ে তোলা। কিন্তু সেই প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে একেবারে অন্য উপকরণে প্রতিমা তৈরি করে নজর কেড়েছেন পূর্ব বর্ধমানের পূর্বস্থলীর রাজু বাগ। তাঁর শিল্পের প্রধান উপাদান মরচে ধরা পেরেক, নাট-বল্টু, জিআই তার আর ফেলে দেওয়া ব্লেড! যেসব জিনিস সাধারণত আবর্জনা বলে ফেলে দেওয়া হয়, সেগুলিকেই সৃজনশীলতার ছোঁয়ায় দুর্গাপ্রতিমায় রূপ দিচ্ছেন তিনি। তাঁর এই অভিনব উদ্যোগ এখন স্থানীয় এলাকার গণ্ডি ছাড়িয়ে পৌঁছে যাচ্ছে ভিনরাজ্যেও।
মাটি-খড়ের বদলে বাতিল সামগ্রী, এভাবেই তৈরি হচ্ছে দুর্গাপ্রতিমা
পূর্ব বর্ধমান জেলার পূর্বস্থলী ১ নম্বর ব্লকের বড়কোবলা এলাকার বাসিন্দা রাজু বাগ। দুর্গাপ্রতিমা তৈরির ক্ষেত্রে সাধারণত মাটি, খড় ও অন্যান্য প্রচলিত উপকরণ ব্যবহার করা হলেও রাজু বেছে নিয়েছেন সম্পূর্ণ আলাদা পথ। তাঁর শিল্পকর্মে জায়গা করে নিয়েছে মরচে ধরা লোহা, পুরনো পেরেক, নাট-বল্টু, জিআই তার, কাঠের টুকরো, লোহার জালি এবং বাতিল ব্লেডের মতো নানা পরিত্যক্ত জিনিস।
শিল্পীর দক্ষ হাতে এই উপকরণগুলিই পেয়েছে দেবী দুর্গার রূপ। প্রতিমার কাঠামো থেকে শুরু করে বিভিন্ন অলঙ্করণ তৈরিতেও ব্যবহার করা হচ্ছে বাতিল সামগ্রী। ফলে সাধারণভাবে মূল্যহীন বলে বিবেচিত জিনিসপত্রও হয়ে উঠছে আকর্ষণীয় শিল্পকর্ম।
ছোট আকারের প্রতিমায় অভিনব শিল্পভাবনা
রাজু বাগের তৈরি প্রতিমাগুলি আকারে ছোট হলেও তার নির্মাণশৈলী যথেষ্ট ব্যতিক্রমী। প্রতিটি উপকরণকে কীভাবে ব্যবহার করলে প্রতিমার কাঠামো ও সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলা যায়, সেই ভাবনাই তাঁর শিল্পের বিশেষত্ব।
শুধু দুর্গাপ্রতিমা তৈরিতেই থেমে নেই তাঁর সৃজনশীলতা। বাতিল জিনিসপত্র কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন থিমভিত্তিক শিল্পকর্মও তৈরি করছেন তিনি। তাঁর কাজ দেখিয়ে দিচ্ছে, নতুন কিছু তৈরি করতে সব সময় দামি উপকরণের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষতা এবং কল্পনাশক্তি।
রাজুর তৈরি প্রায় ১০০টি প্রতিমা যাচ্ছে ভিনরাজ্যে
পূর্বস্থলীর এই শিল্পীর উদ্যোগ ইতিমধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন জায়গায়। এবারের দুর্গাপুজো উপলক্ষে তাঁর তৈরি প্রায় ১০০টি ক্ষুদ্র দুর্গাপ্রতিমা যাচ্ছে কলকাতা, হায়দরাবাদ ও ঝাড়খণ্ডে।
এই চাহিদা রাজুর শিল্পকর্মকে আরও বৃহত্তর পরিসরে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। স্থানীয়ভাবে তৈরি এমন অভিনব প্রতিমা যে অন্য শহর ও রাজ্যের মানুষের কাছেও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে, এই উদ্যোগ তারই উদাহরণ।
শিল্পের সঙ্গে যুক্ত এলাকার তরুণরাও
রাজু বাগের এই কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন এলাকার একদল তরুণ। পড়াশোনার পাশাপাশি তাঁরা শিখছেন কীভাবে পরিত্যক্ত উপকরণ দিয়ে বিভিন্ন শিল্পকর্ম তৈরি করা যায়।
এই কাজের মাধ্যমে তাঁরা নিজেদের হাতখরচের কিছুটা জোগাড় করতে পারছেন। একই সঙ্গে নতুন দক্ষতা অর্জনের সুযোগও পাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে তাঁদের স্বনির্ভর হওয়ার পথে সাহায্য করতে পারে।
অর্থাৎ, রাজুর উদ্যোগ শুধু একটি অভিনব শিল্পচর্চা নয়, স্থানীয় তরুণদের জন্য নতুন কিছু শেখা ও কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগও তৈরি করছে।
পরিবেশ সচেতনতার বার্তা দিচ্ছে এই স্ক্র্যাপ আর্ট
বর্তমানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশদূষণ বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিদিনের ব্যবহারের পর বহু সামগ্রী ফেলে দেওয়া হয়, যেগুলির কিছু পুনর্ব্যবহার করা সম্ভব। রাজু বাগের শিল্প সেই পুনর্ব্যবহারের ধারণাকেই সৃজনশীলভাবে তুলে ধরছে।তাঁর উদ্যোগের মূল বার্তা, যে জিনিসকে আমরা অপ্রয়োজনীয় ভেবে ফেলে দিই, সঠিক ভাবনা ও দক্ষতা থাকলে সেটিকেও নতুন কাজে লাগানো যায়। এভাবেই বাতিল সামগ্রীকে শিল্পে রূপান্তরিত করে পরিবেশ সচেতনতার পাশাপাশি সৃজনশীল কাজের গুরুত্বও তুলে ধরছেন তিনি।
ফেলে দেওয়া জিনিসও যে অসাধারণ শিল্পকর্মে পরিণত হতে পারে, তা হাতে-কলমে দেখাচ্ছেন পূর্ব বর্ধমানের পূর্বস্থলীর শিল্পী রাজু বাগ। মরচে ধরা পেরেক, নাট-বল্টু, জিআই তার, লোহার জালি, কাঠের টুকরো ও বাতিল ব্লেড ব্যবহার করে তৈরি করছেন ছোট ছোট দুর্গাপ্রতিমা। তাঁর তৈরি প্রায় ১০০টি প্রতিমা এবারের দুর্গাপুজোয় যাচ্ছে কলকাতা, হায়দরাবাদ ও ঝাড়খণ্ডে। শুধু শিল্পসৃষ্টি নয়, এলাকার তরুণদেরও এই কাজে যুক্ত করে নতুন দক্ষতা শেখার এবং উপার্জনের সুযোগ তৈরি করছেন তিনি।











