জর্জিয়া মেলোনির কণ্ঠ সুরক্ষায় EUIPO-তে ট্রেডমার্ক আবেদন

ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি AI ডিপফেক ও কণ্ঠের অপব্যবহার থেকে সুরক্ষার জন্য EUIPO-তে ট্রেডমার্ক আবেদন করেছেন। আবেদনের সঙ্গে চার সেকেন্ডের অডিও স্যাম্পল রয়েছে।

ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি তাঁর কণ্ঠের সম্ভাব্য অপব্যবহার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) দিয়ে তৈরি ডিপফেক কনটেন্ট থেকে সুরক্ষা পেতে কণ্ঠকে ট্রেডমার্ক হিসেবে নথিভুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের বৌদ্ধিক সম্পদ দপ্তর (EUIPO)-এ তাঁর কণ্ঠ সম্পর্কিত ট্রেডমার্কের আবেদন করেছেন। আবেদনের সঙ্গে প্রায় চার সেকেন্ডের একটি অডিও রেকর্ডিংও জমা দেওয়া হয়েছে। ওই রেকর্ডিংয়ে তিনি ইতালীয় ভাষায় নিজের পরিচয় দেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেলোনির কণ্ঠ সম্পর্কিত এই আবেদনের উদ্দেশ্য AI প্রযুক্তির মাধ্যমে তাঁর কণ্ঠ নকল করে তৈরি করা ভুয়া কনটেন্টের বিরুদ্ধে আইনি সুরক্ষা পাওয়া। এমন সময়ে এই উদ্যোগ সামনে এসেছে, যখন AI প্রযুক্তির মাধ্যমে কোনও ব্যক্তির কণ্ঠ, মুখ এবং কথা বলার ধরন নকল করা আগের তুলনায় সহজ হয়েছে।

মেলোনির ট্রেডমার্ক আবেদনে প্রায় চার সেকেন্ডের একটি অডিও স্যাম্পল রয়েছে। এতে তিনি দুবার ইতালীয় ভাষায় নিজের পরিচয় দেন।

তাঁর পরিচয়ের বাক্য ‘Io sono Giorgia’, যার অর্থ ‘আমি জর্জিয়া’, তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গেও যুক্ত। একই নামে তাঁর ২০২১ সালে প্রকাশিত আত্মজীবনী রয়েছে এবং রাজনৈতিক প্রচারেও এই বাক্যটি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

কণ্ঠকে ট্রেডমার্ক হিসেবে সুরক্ষিত করার উদ্যোগ দেখাচ্ছে যে জনপরিচিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ডিজিটাল পরিচয় এখন শুধু নাম ও ছবির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

AI-ভিত্তিক ভয়েস ক্লোনিং প্রযুক্তি কোনও ব্যক্তির উপলব্ধ অডিও রেকর্ডিং বিশ্লেষণ করে তাঁর কণ্ঠের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করতে পারে। এর মধ্যে কথা বলার গতি, উচ্চারণ, কণ্ঠের ওঠানামা এবং শব্দের মধ্যবর্তী ব্যবধান থাকতে পারে।

এরপর AI মডেল একই ধরনের কণ্ঠে এমন কথাও তৈরি করতে পারে, যা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বাস্তবে কখনও বলেননি। এ কারণে নেতা, শিল্পী, ব্যবসায়ী এবং অন্যান্য জনপরিচিত ব্যক্তির কণ্ঠের অপব্যবহার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

অনেক ক্ষেত্রে কোনও ব্যক্তির কণ্ঠ নকল করতে খুব দীর্ঘ রেকর্ডিংয়ের প্রয়োজন হয় না। তবে আরও স্বাভাবিক ও বাস্তবসম্মত ফলাফল তৈরির জন্য সাধারণত উন্নত মানের এবং বেশি পরিমাণ অডিও উপকারী।

AI দিয়ে কণ্ঠ নকল করার প্রধান ঝুঁকিগুলোর মধ্যে ভুল তথ্য এবং প্রতারণা রয়েছে। কোনও নেতার কণ্ঠে এমন বক্তব্য তৈরি করা সম্ভব, যা তিনি কখনও দেননি। একইভাবে কোনও ব্যবসায়ী বা পরিবারের সদস্যের কণ্ঠ নকল করে অর্থ চাওয়া, নির্দেশ দেওয়া বা সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করা যেতে পারে।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নির্বাচন বা বড় রাজনৈতিক ঘটনার সময় কোনও নেতার নকল কণ্ঠে তৈরি অডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।

মেলোনির ট্রেডমার্ক আবেদন এই বৃহত্তর ডিজিটাল নিরাপত্তা বিতর্কের মধ্যেই সামনে এসেছে।

মেলোনির উদ্যোগ একক ঘটনা নয়। AI-এর ক্রমবর্ধমান ব্যবহারের মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন শিল্পী তাঁদের কণ্ঠ, ছবি এবং পরিচয়ের বাণিজ্যিক ব্যবহার নিয়ে আইনি সুরক্ষা খুঁজছেন।

মার্কিন অভিনেতা ম্যাথিউ ম্যাককনাহিও তাঁর ছবি ও কণ্ঠ সম্পর্কিত ট্রেডমার্ক সুরক্ষার জন্য আবেদন করেছেন। শিল্পীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ AI কোম্পানি এবং অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম কণ্ঠ নকল করে এমন কনটেন্ট তৈরি করতে পারে, যার জন্য মূল শিল্পীর অনুমতিকে প্রয়োজনীয় হিসেবে বিবেচনা করা নাও হতে পারে।

ব্রিটেনেও একাধিক শিল্পী তাঁদের কণ্ঠ ও পরিচয় ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্পষ্ট আইনি অধিকার দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। ৮০-এর বেশি শিল্পী ব্রিটেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামকে এই বিষয়ে আইন প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছিলেন।

মার্কিন পপ তারকা টেলর সুইফটও তাঁর পরিচয় ও কণ্ঠ সম্পর্কিত ট্রেডমার্ক সুরক্ষার উদ্যোগ নিয়েছেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি যুক্তরাষ্ট্রে তিনটি ট্রেডমার্ক আবেদন করেছিলেন। এর মধ্যে একটি আবেদন তাঁর ছবির সঙ্গে সম্পর্কিত এবং দুটি আবেদন তাঁর কণ্ঠের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।

কণ্ঠ সম্পর্কিত স্যাম্পলে সুইফটকে নিজের পরিচয় দিতে শোনা যায়। তাঁর পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত এমন অডিও স্যাম্পলের আইনি সুরক্ষা দেখায় যে বিনোদন শিল্পে শিল্পীরা AI-ভিত্তিক ভয়েস ক্লোনিংয়ের সম্ভাব্য অপব্যবহারকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন।

জর্জিয়া মেলোনির জন্য AI ডিপফেকের বিষয়টি নতুন নয়। এর আগে তাঁর ছবি ব্যবহার করে ভুয়া অশ্লীল কনটেন্ট তৈরির ঘটনা সামনে এসেছিল।

২০২৪ সালে মেলোনি ওই ধরনের কনটেন্ট নিয়ে আইনি পদক্ষেপ করেছিলেন এবং কথিতভাবে ১ লাখ ইউরো ক্ষতিপূরণ দাবি করেছিলেন। ঘটনাটি AI ও ডিজিটাল এডিটিং প্রযুক্তির মাধ্যমে জনপরিচিত ব্যক্তিদের ছবি কীভাবে অপব্যবহার করা যেতে পারে, তার একটি উদাহরণ হয়ে ওঠে।

মেলোনি বিষয়টিকে শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি হিসেবে দেখেননি। তিনি বলেছিলেন, ডিপফেক প্রযুক্তি কোনও ব্যক্তিকে প্রতারণা করা, তাঁর সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত করা বা তাঁকে নিশানা করার কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।

চলতি বছরের মে মাসেও মেলোনি ডিপফেক প্রযুক্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। সে সময় ইন্টারনেটে তাঁর মুখ ব্যবহার করে AI দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি ছড়িয়ে পড়ার খবর সামনে এসেছিল।

মেলোনি বলেছিলেন, তিনি নিজের স্তরে এ ধরনের ঘটনা মোকাবিলা করতে পারেন, কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে সবসময় আইনি বা প্রযুক্তিগত সম্পদ থাকে না।

তাঁর উদ্বেগের একটি বড় অংশ হলো, AI ডিপফেক প্রযুক্তি শুধু পরিচিত ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সাধারণ নাগরিকরাও এর মাধ্যমে ভুয়া ছবি, ভিডিও বা অডিওর শিকার হতে পারেন।

মেলোনির কণ্ঠকে ট্রেডমার্ক করানোর উদ্যোগ AI-এর যুগে বৌদ্ধিক সম্পদ অধিকারের পরিবর্তিত পরিস্থিতিকেও সামনে এনেছে। আগে কোনও ব্যক্তির পরিচয় সম্পর্কিত অধিকারের ক্ষেত্রে নাম, ছবি, লোগো বা শিল্পকর্ম প্রধান বিষয় ছিল। এখন কণ্ঠও ডিজিটাল পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।

আইনি বিশেষজ্ঞ ও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সামনে এখন প্রশ্ন হলো, কোনও ব্যক্তির কণ্ঠের নকল, AI প্রশিক্ষণ এবং সেই কণ্ঠ থেকে তৈরি কনটেন্টের বাণিজ্যিক ব্যবহার কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।

মেলোনির আবেদন এই পরিবর্তনশীল আইনি ও প্রযুক্তিগত পরিস্থিতির একটি উদাহরণ। কণ্ঠের মতো ব্যক্তিগত পরিচয়ের কোনও অংশ ট্রেডমার্ক সুরক্ষা পেলে ভবিষ্যতে অন্যান্য জনপরিচিত ব্যক্তিরাও একই ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারেন।

 

Leave a comment