গুরু গোবিন্দ সিংয়ের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে তাঁর জীবন ও অবদানকে স্মরণ করা হয়। পটনায় জন্ম নেওয়া গোবিন্দ রায় শিখদের দশম গুরু হিসেবে খালসা পন্থের প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি সাহস, সমতা এবং ধর্ম রক্ষার বার্তা দিয়ে শিখ ইতিহাসে নতুন দিশা দেন।
Guru Gobind Singh Jayanti 2025: শিখদের দশম গুরু গুরু গোবিন্দ সিংয়ের জন্মজয়ন্তী পৌষ মাসের সপ্তমী তিথিতে শ্রদ্ধার সাথে পালিত হচ্ছে। ১৬৬৬ সালে বিহারের রাজধানী পটনায় জন্ম নেওয়া গোবিন্দ রায় ১৬৯৯ সালের বৈশাখীতে আনন্দপুর সাহিবে খালসা পন্থের প্রতিষ্ঠা করেন। ধর্মীয় অত্যাচার ও অসহিষ্ণুতার সময়ে তিনি শিখ সম্প্রদায়কে সংগঠিত করেন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস দেন। খালসার পাঁচটি কাকা (Kakaar) এবং "ওয়াহে গুরু জি কা খালসা" - এই বার্তা আজও তাঁর চিন্তাধারার পরিচয় বহন করে।
পটনায় জন্ম, গোবিন্দ রায় থেকে গুরু গোবিন্দ সিং পর্যন্ত
গুরু গোবিন্দ সিংয়ের জন্ম ১৬৬৬ সালে বিহারের রাজধানী পটনায় হয়েছিল। সেই সময় তাঁর নাম গোবিন্দ রায় রাখা হয়। তিনি নবম শিখ গুরু, গুরু তেগ বাহাদুর জি এবং মাতা গুজীর একমাত্র পুত্র ছিলেন। মনে করা হয় যে তাঁর শৈশবের কিছু সময় পটনায় কেটেছে, যেখানে আজ তখত শ্রী হরিমন্দির সাহিব তাঁর জন্মস্থান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
গোবিন্দ রায় শৈশব থেকেই অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। তিনি শাস্ত্রের পাশাপাশি অস্ত্রের জ্ঞানও অর্জন করেছিলেন। তিনি সংস্কৃত, ফারসি এবং ব্রজ ভাষার পন্ডিত ছিলেন এবং কবিতা ও সঙ্গীতেও তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। পরবর্তীতে তিনি অনেক ধর্মীয় ও বীরত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেন, যা আজও শিখ সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়।
গুরু তেগ বাহাদুর জির আত্মত্যাগের পর অল্প বয়সেই গোবিন্দ রায় গুরু গদ্দি গ্রহণ করেন এবং শিখদের দশম গুরু হন। সেই সময় দেশে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও অত্যাচারের পরিবেশ ছিল। এমন পরিস্থিতিতে গুরু গোবিন্দ সিং কেবল শিখ সম্প্রদায়কে সংগঠিত করেননি, বরং তাঁদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহসও জুগিয়েছিলেন।

বৈশাখী ১৬৯৯ এবং খালসা পন্থের প্রতিষ্ঠা
গুরু গোবিন্দ সিংয়ের জীবনের সবচেয়ে ঐতিহাসিক ঘটনাগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল ১৬৯৯ সালের বৈশাখী। এই দিনেই তিনি খালসা পন্থের প্রতিষ্ঠা করেন, যা শিখ ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করে দেয়। আনন্দপুর সাহিবে আয়োজিত এক বিশাল সভায় গুরু গোবিন্দ সিং হঠাৎ তাঁর তলোয়ার বের করে জনসমক্ষে জানতে চান যে, কে ধর্মের रक्षায় নিজের জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত।
এই ঘোষণায় সভায় পিনপতন নীরবতা নেমে আসে। কিছুক্ষণের পর লাহোরের দায়ারাম এগিয়ে আসেন। এরপর হस्तिनाপুরের ধরম রায়, ওড়িশার জগন্নাথ থেকে ভাই হিম্মত রায়, গুজরাটের দ্বারকা থেকে ভাই মোহকম রায় এবং কর্ণাটকের বিদার থেকে ভাই সাহিব চাঁদ এগিয়ে আসেন। গুরু গোবিন্দ সিং তাঁদের পাঁচজনকে একটি তাঁবুতে নিয়ে যান।
কিছুক্ষণ পর যখন গুরু গোবিন্দ সিং পাঁচজনের সাথে বাইরে আসেন, তখন সকলের পরনে কেশর রঙের পোশাক এবং মাথায় পাগড়ি দেখা যায়। তখন মানুষ বুঝতে পারে যে এটি আত্মত্যাগের পরীক্ষা নয়, বরং সাহস ও বিশ্বাসের পরীক্ষা ছিল। গুরু তাঁদের পাঁচজনকে পঞ্জ प्यारे (Panj Piare) উপাধি দিয়ে সম্মানিত করেন।
অমরিত সংস্কার ও ‘সিংহের’ উপাধি
এরপর গুরু গোবিন্দ সিং অমৃত সংস্কারের সূচনা করেন। তিনি একটি লোহার পাত্রে জল ভরে তাতে চিনি মিশিয়ে কৃপাণ দিয়ে মন্ত্র উচ্চারণ করে ঘোলাতে থাকেন। এই অমৃত পাঁচজন পঞ্জ प्यारेকে পান করানো হয়। একই সাথে তাঁদের পুরনো নাম পরিবর্তন করে সকলকে ‘সিংহের’ উপাধি দেওয়া হয়, যা সাহস ও সমতার প্রতীক হয়ে ওঠে।
এই বার্তা স্পষ্ট ছিল যে খালসা পন্থের কাছে জন্ম, জাতি বা অঞ্চলের চেয়ে মানবতা ও চরিত্রের মূল্য বেশি। পরবর্তীতে গুরু গোবিন্দ সিং নিজেও অমৃতপান করেন এবং ‘সিংহের’ উপাধি গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমেই গোবিন্দ রায়, গুরু গোবিন্দ সিং হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।
আজও নগর কীর্তনে গুরু গ্রন্থ সাহিবের পালকির সামনে পঞ্জ प्यारेদের বিশেষ স্থান দেওয়া হয়, যা খালসা ঐতিহ্যের জীবন্ত পরিচয়।
খালসার পাঁচটি কাকা ও জীবনের বার্তা
গুরু গোবিন্দ সিং খালসা পন্থকে শৃঙ্খলা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের সাথে যুক্ত করার জন্য পাঁচটি মৌলিক নীতি দেন, যা পাঁচটি কাকা নামে পরিচিত। এগুলি হল কেশ, कंघा, কড়া, কছ এবং কৃপাণ। এগুলি কেবল বাহ্যিক প্রতীক নয়, বরং চরিত্র গঠন ও দায়িত্বের বার্তা দেয়।
গুরু গোবিন্দ সিংয়ের বিখ্যাত नारा “ওয়াহে গুরু জি কা খালসা, ওয়াহে গুরু জি কি ফতেহ” আজও শিখদের আত্মবিশ্বাস ও ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাসকে প্রতিফলিত করে। তিনি বিশ্বাস করতেন যে একজন চরিত্রবান ব্যক্তিই অত্যাচার ও প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে পারে।
গুরু গোবিন্দ সিংয়ের জীবন আমাদের শেখায় যে ধর্ম কেবল পূজার বিষয় নয়, বরং ন্যায়, সমতা ও মানবতার জন্য দাঁড়ানোর সাহসও বটে। তাঁর জন্মজয়ন্তীতে তাঁর আদর্শকে গ্রহণ করাই তাঁকে প্রকৃত শ্রদ্ধা নিবেদন।













