लाल সাগরে একটি কার্গো জাহাজে হুতিদের কথিত ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আবারও বেড়েছে। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের মতে, হামলায় ছয়জন নিহত এবং আরও ১০ জন আহত হয়েছেন। হামলার পর জাহাজটিতে আগুন ধরে যায় এবং ক্রুদের কয়েকজনকে প্রাণ বাঁচাতে লড়াই করতে হয়।
ইয়েমেনের পরিবহন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটিকে তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে লক্ষ্য করা হয়। হামলাটি ইয়েমেনের মোখা বন্দরের দক্ষিণে ঘটে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, হামলায় জাহাজের চার ক্রু সদস্য নিহত হন। তাঁদের মধ্যে তিনজন পাকিস্তানি এবং একজন ইন্দোনেশীয় নাগরিক ছিলেন। ঘটনার পর ওই সামুদ্রিক এলাকায় উদ্ধার অভিযান শুরু হয়।
ইয়েমেনের কোস্ট গার্ড দাবি করেছে, জাহাজ থেকে লোকজনকে সরিয়ে নিতে সেখানে পৌঁছানো উদ্ধারকর্মীদেরও দ্বিতীয় একটি ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে লক্ষ্য করা হয়। এই হামলায় ত্রাণ ও উদ্ধার অভিযানে যুক্ত ব্যক্তিরাও ক্ষতিগ্রস্ত হন। এর আগে সামুদ্রিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সংস্থা ভ্যানগার্ড জানিয়েছিল, ইয়েমেনি নৌবাহিনী জাহাজটিকে সহায়তা করতে একটি দল পাঠিয়েছিল, কিন্তু সেই দলের ওপরও গুলি চালানো হয়। ওই ঘটনায় আরও তিনজন আহত হওয়ার তথ্য সামনে আসে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে জাহাজটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি দেখা যায়। বিবিসি ভেরিফাইয়ের তদন্ত অনুযায়ী, ছবিতে দেখা জাহাজটি বাব আল-মন্দব প্রণালির আশপাশের বলে মনে হচ্ছে। এই প্রণালি লাল সাগর ও এডেন উপসাগরের মধ্যে অবস্থিত এবং বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ।
উপলব্ধ ছবি এবং জাহাজ ট্র্যাকিংয়ের তথ্যের ভিত্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজটির পরিচয় তিহামা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। মেরিনট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটি লাল সাগরে ওয়ার্নার পয়েন্টের কাছে ছিল। সামুদ্রিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সংস্থা ভ্যানগার্ড জানিয়েছে, জাহাজটি তানজানিয়ার পতাকার অধীনে চলছিল। অন্যদিকে, মেরিনট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, এর মালিকানা বা পরিচালনা মিশরের সঙ্গে যুক্ত একটি অপারেটরের সঙ্গে সম্পর্কিত।
তবে জাহাজটির পরিচয় ও সংশ্লিষ্টতা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন দাবি সামনে এসেছে। ইয়েমেনের পরিবহন মন্ত্রণালয় এটিকে ইয়েমেনি বাণিজ্যিক জাহাজ বলে উল্লেখ করেছে। অন্যদিকে, ইরানি সংবাদমাধ্যমের প্রাথমিক প্রতিবেদনে এটিকে সৌদি আরবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে জানানো হয়। হুতিরা দাবি করেছে, তারা যে জাহাজটিকে লক্ষ্য করেছিল, সেটি সৌদি সামরিক সরঞ্জাম বহন করছিল।
এর বিপরীতে, ইয়েমেনের সরকার বলেছে, জাহাজটিতে খাদ্যসামগ্রী ছিল এবং এটি একটি বাণিজ্যিক জাহাজ। দুই পক্ষের দাবির মধ্যে পার্থক্যের কারণে জাহাজটির পণ্য এবং প্রকৃত পরিচালনা নিয়ে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরু করার পর এটিকে হুতিদের কোনো জাহাজে প্রথম প্রাণঘাতী হামলা হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। ইরান-সমর্থিত হুতিরা এর আগেও লাল সাগরে জাহাজকে লক্ষ্য করেছে এবং আঞ্চলিক সংঘাতের সময় সামুদ্রিক পথ প্রভাবিত করার হুমকি দিয়েছে।

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে হুতিরা সৌদি বন্দরগুলোর বিরুদ্ধে কথিত নৌ অবরোধ ঘোষণা করেছিল। এর পর লাল সাগরে তেলবাহী ট্যাঙ্কার এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছিল। সর্বশেষ ঘটনাটি আন্তর্জাতিক শিপিং সংস্থাগুলোর সামনে আবারও নিরাপত্তার প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ইয়েমেনে হুতি এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের মধ্যে বহু বছর ধরে সংঘাত চলছে। হুতিরা দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে এবং রাজধানী সানাও তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার দক্ষিণের শহর এডেন থেকে প্রশাসন পরিচালনা করে।
দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিনের যুদ্ধবিরতি সংঘাতকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের পর পরিস্থিতি আবার অবনতির দিকে যাচ্ছে বলে দেখা যাচ্ছে। ইয়েমেনের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা বাড়ার পাশাপাশি লাল সাগরে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তার ওপরও এর প্রভাব পড়ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তেজনা শুধু লাল সাগরে সীমাবদ্ধ নয়। ইরান-সম্পর্কিত সংঘাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালি নিয়েও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ রয়েছে। এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি বাণিজ্যপথ, যার মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের একটি বড় অংশ পরিবাহিত হয়।
লাল সাগর ও হরমুজের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথে দীর্ঘ সময় অস্থিতিশীলতা বজায় থাকলে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব পড়তে পারে। জাহাজের বিমা খরচ, পণ্য পরিবহন ব্যয় এবং দীর্ঘ সামুদ্রিক যাত্রার চাপ বাড়তে পারে। এর সরাসরি প্রভাব এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে বাণিজ্যের ওপর পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সর্বশেষ হামলায় পাকিস্তানি ও ইন্দোনেশীয় নাগরিকদের মৃত্যুর তথ্য সামনে আসার পর ঘটনাটির আন্তর্জাতিক প্রভাবও বেড়েছে। একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা এবং উদ্ধারকর্মীদের কথিতভাবে লক্ষ্যবস্তু করার ঘটনায় সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
হুতিদের পক্ষ থেকে জাহাজটিকে সৌদি সামরিক সরঞ্জাম বহনকারী হিসেবে উল্লেখ করা হলেও ইয়েমেনের সরকার বলেছে, এটি একটি বাণিজ্যিক জাহাজ এবং এতে খাদ্যসামগ্রী ছিল। ফলে হামলার প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং জাহাজটির পণ্য নিয়ে তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।
বর্তমানে তিহামা জাহাজে হামলা-সংক্রান্ত বিভিন্ন দাবির তদন্ত চলছে। জাহাজটির জাতীয়তা, মালিকানা এবং এতে থাকা পণ্য নিয়েও ভিন্ন ভিন্ন তথ্য সামনে এসেছে। ছয়জনের মৃত্যু এবং বহু মানুষের আহত হওয়ার ঘটনায় ইয়েমেন ও লাল সাগর অঞ্চলের সামুদ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।











