টালির চালের ঘর থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তিতলি! বাবাকে হারিয়েও মায়ের স্বপ্ন পূরণ, ভারোত্তোলনে দেশকে এনে দিল রুপো

অভাবের সংসার ও পিতৃহারা পরিবার থেকে উঠে এসে উজবেকিস্তানে এশিয়ান ইউথ অ্যান্ড জুনিয়র ওয়েটলিফটিং চ্যাম্পিয়নশিপে ৪৫ কেজি বিভাগে রুপো জিতল হাওড়ার তিতলি মাঝি।

Howrah News: এক চিলতে টালির চালের ঘর। সংসারে অভাব নিত্যসঙ্গী। বাবাকে হারানোর পর দুই মেয়েকে নিয়ে লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন মা। সেই কঠিন পরিস্থিতি থেকেই উঠে এসে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের পতাকা উড়িয়ে দিল হাওড়ার তিতলি মাঝি। উজবেকিস্তানে অনুষ্ঠিত Asian Youth and Junior Weightlifting Championship-এ ৪৫ কেজি বিভাগে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে রুপোর পদক জিতেছে সে।

মায়ের স্বপ্নই ছিল তিতলির সবচেয়ে বড় শক্তি

তিতলি ও তাঁর বোন—দুই মেয়েকে নিয়ে মায়ের স্বপ্ন ছিল অনেক বড়। সংসারে বাবার ছায়া না থাকলেও মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে হাল ছাড়েননি তিনি। কয়েক বছর আগে দুই মেয়েকেই ভারোত্তোলনের প্রশিক্ষণে যুক্ত করেন।লক্ষ্য ছিল একটাই—একদিন মেয়েরাই দেশের হয়ে খেলবে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের জাতীয় পতাকা তুলে ধরবে। তিতলির রুপো জয় সেই স্বপ্নকেই যেন বাস্তব করে তুলল।

৪৫ কেজি বিভাগে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স

উজবেকিস্তানে আয়োজিত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ৪৫ কেজি বিভাগে অংশ নেয় তিতলি। স্ন্যাচে ৬৫ কেজি এবং জার্কে ৮০ কেজি ওজন তুলে নজর কাড়ে সে।প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে কঠিন লড়াইয়ের পর দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে রুপোর পদক নিশ্চিত করে হাওড়ার এই তরুণী। আন্তর্জাতিক মঞ্চে এই সাফল্য তাঁর ক্রীড়াজীবনের অন্যতম বড় অর্জন।

অভাবের সংসার, তবু থামেনি প্রশিক্ষণ

তিতলির পরিবারের আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত সচ্ছল নয়। সংসারের প্রয়োজন মেটাতে তাঁর মা জরির কাজ করেন। পাশাপাশি গ্রামের একটি প্রাথমিক স্কুলে মিড-ডে মিলের কাজ করেও সামান্য আয় করেন।অভাবের মধ্যেই দুই মেয়ের প্রশিক্ষণ চালিয়ে যাওয়া সহজ ছিল না। তার উপর গ্রামের পরিকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও ছিল। কিন্তু মায়ের জেদ এবং তিতলির পরিশ্রম শেষ পর্যন্ত সেই সমস্ত বাধাকে পিছনে ফেলে দিয়েছে।

গ্রামের প্রশিক্ষকের সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ

মায়ের হাত ধরে দুই বোন গ্রামের প্রশিক্ষণ শিবিরে ভারোত্তোলনের অনুশীলন শুরু করে। পরিবারের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কথা বুঝে স্থানীয় প্রশিক্ষকরাও বিভিন্নভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন।নিয়মিত অনুশীলন, কঠোর পরিশ্রম এবং নিজের লক্ষ্যে স্থির থাকার ফলেই ধীরে ধীরে জাতীয় স্তর পেরিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পৌঁছে যায় তিতলি।

তিতলির রুপোয় খুশির হাওয়া গোটা গ্রামে

আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় দেশের হয়ে পদক জেতার খবর পৌঁছতেই তিতলির পরিবার ও দেউলপুর গ্রামে খুশির আবহ তৈরি হয়েছে। কোচ থেকে শুরু করে স্থানীয় বাসিন্দা—সকলেই তাঁর এই সাফল্যে গর্বিত।সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও তিতলির এই অর্জন প্রমাণ করেছে, প্রতিভার সঙ্গে অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও পরিশ্রম থাকলে বড় মঞ্চেও সাফল্য পাওয়া সম্ভব।

অভাব-অনটন, পিতৃহারা পরিবার এবং গ্রামের সীমিত পরিকাঠামো—কোনও বাধাই থামাতে পারেনি হাওড়ার দেউলপুরের তিতলি মাঝিকে। উজবেকিস্তানে আয়োজিত এশিয়ান ইউথ অ্যান্ড জুনিয়র ওয়েটলিফটিং চ্যাম্পিয়নশিপে ৪৫ কেজি বিভাগে রুপোর পদক জিতে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে এই তরুণ ভারোত্তোলক। তিতলির এই সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে তাঁর মায়ের দীর্ঘ লড়াই এবং কোচের সহযোগিতা।

Leave a comment