নয়াদিল্লি: ভবিষ্যতের যুদ্ধ শুধু যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা ড্রোনের উপর নির্ভর করবে না। মহাকাশ ও স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের প্রযুক্তিও হয়ে উঠছে সামরিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই পরিস্থিতিতে ভারতের নিজস্ব High Altitude Pseudo Satellite বা HAPS প্রযুক্তি নজরদারি ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে। উচ্চ আকাশে দীর্ঘসময় অবস্থান করে এই প্ল্যাটফর্ম থেকে সীমান্তের ওপারের গুরুত্বপূর্ণ গতিবিধির উপর নজর রাখা সম্ভব হতে পারে।
HAPS আসলে কী?
HAPS হল এমন এক ধরনের উচ্চ-উচ্চতার প্ল্যাটফর্ম, যা সাধারণ ড্রোনের তুলনায় অনেক বেশি উচ্চতায় এবং প্রচলিত স্যাটেলাইটের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কাছাকাছি অবস্থানে কাজ করতে পারে। সাধারণত স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের কাছাকাছি উচ্চতায় সৌরশক্তিচালিত এই ধরনের উড়ন্ত প্ল্যাটফর্ম দীর্ঘসময় আকাশে অবস্থান করতে পারে।এর ফলে নজরদারি, যোগাযোগ এবং গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
পাকিস্তানের উপর নজরদারিতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
ভারতের জন্য HAPS-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার হতে পারে দীর্ঘসময় ধরে সীমান্তবর্তী অঞ্চলের উপর নজর রাখা। এই প্রযুক্তির সাহায্যে অন্য দেশের আকাশসীমায় প্রবেশ না করেও দূর থেকে সামরিক ঘাঁটি, বিমানঘাঁটি, সেনা চলাচল কিংবা গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোর উপর নজরদারি চালানো সম্ভব হতে পারে।অর্থাৎ, প্রচলিত যুদ্ধবিমান পাঠানোর প্রয়োজন ছাড়াই নির্দিষ্ট এলাকায় ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ চালানো যেতে পারে। তবে নির্দিষ্ট কোনও ব্যক্তির ব্যক্তিগত জায়গা বা ‘বেডরুম’ পর্যন্ত নজরদারির দাবিকে প্রযুক্তিগত সম্ভাবনার সঙ্গে গুলিয়ে দেখা ঠিক হবে না।
ভারতের HAPS প্রকল্পে বড় অগ্রগতি
ভারতের দেশীয় HAPS কর্মসূচিতে ইতিমধ্যেই পরীক্ষামূলক সাফল্যের খবর সামনে এসেছে। CSIR-এর National Aerospace Laboratories বা NAL ছোট আকারের একটি প্রোটোটাইপ দীর্ঘসময় আকাশে ওড়ানোর পরীক্ষা করেছে।পরবর্তী পর্যায়ে আরও বড় ডানার HAPS তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। দীর্ঘ সময় আকাশে অবস্থান করার সক্ষমতা তৈরি হলে সীমান্ত নজরদারি এবং সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় এর ব্যবহার আরও বাড়তে পারে।
কেন এই প্রযুক্তি এত গুরুত্বপূর্ণ?
HAPS-এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হল দীর্ঘসময় একই এলাকায় অবস্থান করে নজরদারি চালানোর ক্ষমতা। সাধারণ ড্রোনকে নিয়মিত ফিরে এসে জ্বালানি বা ব্যাটারি সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান করতে হয়। অন্যদিকে স্যাটেলাইট অত্যন্ত কার্যকর হলেও তার কক্ষপথ, খরচ এবং নির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার নিজস্ব সীমাবদ্ধতা রয়েছে।HAPS এই দুই ব্যবস্থার মাঝামাঝি একটি প্রযুক্তিগত সমাধান দিতে পারে। উন্নত ক্যামেরা, থার্মাল সেন্সর এবং অন্যান্য নজরদারি সরঞ্জাম যুক্ত করা গেলে এটি সীমান্ত পর্যবেক্ষণে কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে।
শুধু যুদ্ধ নয়, আরও বহু কাজে ব্যবহার
HAPS-এর ব্যবহার শুধুমাত্র সামরিক নজরদারিতেই সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়। দুর্গম এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, দুর্যোগের সময় যোগাযোগ পরিষেবা সচল রাখা এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অস্থায়ী যোগাযোগ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে।বিশেষ করে প্রাকৃতিক দুর্যোগে যখন মাটির কাছাকাছি টেলিকম পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন উচ্চ আকাশে থাকা কোনও প্ল্যাটফর্ম বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থার ভূমিকা পালন করতে পারে।
ভবিষ্যতের সীমান্ত নিরাপত্তায় নতুন অধ্যায়
ভারতের দীর্ঘ স্থল ও সামুদ্রিক সীমান্তের কথা মাথায় রাখলে দীর্ঘসময় ধরে নজরদারি চালাতে পারে এমন প্রযুক্তির গুরুত্ব যথেষ্ট। HAPS সফলভাবে পূর্ণাঙ্গ ব্যবহারের পর্যায়ে পৌঁছলে স্যাটেলাইট, ড্রোন এবং প্রচলিত নজরদারি ব্যবস্থার পাশাপাশি এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হয়ে উঠতে পারে।
যুদ্ধের ধরন দ্রুত বদলাচ্ছে। ড্রোন ও স্যাটেলাইটের পাশাপাশি এবার উচ্চ-উচ্চতায় দীর্ঘসময় উড়তে সক্ষম HAPS প্রযুক্তিকে সামরিক নজরদারির কাজে ব্যবহার করার দিকে এগোচ্ছে ভারত। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে সীমান্তে সরাসরি প্রবেশ না করেও বহু দূরের এলাকায় দীর্ঘক্ষণ নজর রাখা সম্ভব হতে পারে।










