কর্ণাটকের সরকারি অনুষ্ঠানে বন্দে মাতরমের প্রথম দুই অন্তরা গাওয়া হবে

কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী ডি কে শিবকুমার জানিয়েছেন, সরকারি ও জনসাধারণের অনুষ্ঠানে বন্দে মাতরমের প্রথম দুই অন্তরা গাওয়া হবে। ২৬ আগস্ট ২০২৬-এ তিনি কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত ও দলের আদর্শের সঙ্গে সরকারের অবস্থানের কথা জানান।

কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী ডি কে শিবকুমার বলেছেন, রাজ্যের সরকারি ও জনসাধারণের অনুষ্ঠানে জাতীয় গান ‘বন্দে মাতরম’-এর শুধুমাত্র প্রথম দুই অন্তরা গাওয়া হবে। ২৬ আগস্ট ২০২৬-এ ইন্ডিয়া টুডের একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি বলেন, তাঁর সরকার কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত ও দলের আদর্শের সঙ্গে রয়েছে।

শিবকুমার বলেন, তিনি তাঁর দলের আদর্শে বিশ্বাস করেন এবং দল যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার সঙ্গে রয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, স্বাধীনতা দিবসের একটি অনুষ্ঠানে তাঁর অজ্ঞাতে ‘বন্দে মাতরম’-এর পূর্ণ সংস্করণ গাওয়া হয়েছিল। ভবিষ্যতে কর্ণাটকের সরকারি অনুষ্ঠানে কংগ্রেসের নির্ধারিত অবস্থান অনুযায়ী শুধুমাত্র প্রথম দুই অন্তরা গাওয়া হবে।

মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, কর্ণাটক বৈচিত্র্যে ভরা একটি রাজ্য এবং ভারতও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের দেশ। তিনি বিজেপির বিরুদ্ধে তুষ্টিকরণের রাজনীতি করার অভিযোগ তুলে বলেন, কংগ্রেস সব শ্রেণিকে সঙ্গে নিয়ে চলায় বিশ্বাস করে। ‘বন্দে মাতরম’ গান নিয়ে কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে রাজনৈতিক সংঘাতের মধ্যেই তাঁর এই মন্তব্য এসেছে।

এই বিতর্কের প্রেক্ষাপটে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি (CWC)-র ১৯ আগস্টের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ। কংগ্রেসের সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থা জানিয়েছিল, দলের কর্মসূচিতে ‘বন্দে মাতরম’-এর শুধুমাত্র প্রথম দুই অন্তরা গাওয়া হবে। দলটি এই সিদ্ধান্তকে ১৯৩৭ সালে নেওয়া কংগ্রেসের সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত করে বলেছিল, তারা ঐতিহাসিক ঐতিহ্য অনুসরণ করছে।

কংগ্রেস নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুভাষচন্দ্র বসু এবং সরদার বল্লভভাই প্যাটেল-সহ তৎকালীন শীর্ষ নেতাদের মধ্যে ‘বন্দে মাতরম’-এর প্রকাশ্য পরিবেশনের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। কংগ্রেসের দাবি, দলীয় কর্মসূচিতে প্রথম দুই অন্তরা গাওয়ার রীতি সেই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত।

১৫ আগস্টের স্বাধীনতা দিবসের কর্মসূচির পর ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে বর্তমান রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়। বিজেপি কংগ্রেসের বিরুদ্ধে জাতীয় গানের অবমাননার অভিযোগ তোলে। বিজেপি নেতারা কংগ্রেস সদর দফতরের একটি অনুষ্ঠানের ভিডিও নিয়ে প্রশ্ন তুলে অভিযোগ করেন, দলের নেতৃত্ব পুরো গান গাওয়ার বিষয়ে অস্বস্তিতে ছিল।

কংগ্রেস এই অভিযোগ খারিজ করে জানায়, কংগ্রেস সদর দফতরে ‘বন্দে মাতরম’-এর পূর্ণ সংস্করণ গাওয়া হয়েছিল এবং তা বন্ধ করার কোনো চেষ্টা করা হয়নি। কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশ বিজেপির অভিযোগকে ভুল বলে উল্লেখ করে জানান, সোনিয়া গান্ধীর ইঙ্গিত গান বন্ধ করার জন্য ছিল না; দীর্ঘ সময় ধরে দাঁড়িয়ে থাকা কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের জন্য চেয়ারের ব্যবস্থা করার সঙ্গে সেটি সম্পর্কিত ছিল।

এরপর বিতর্ক দলীয় কর্মসূচির গণ্ডি ছাড়িয়ে সরকারি অনুষ্ঠানে জাতীয় গানটির কোন সংস্করণ গাওয়া হবে এবং কেন্দ্র সরকারের নতুন নির্দেশিকা পর্যন্ত পৌঁছায়।

২০২৬ সালে কেন্দ্র সরকার ‘বন্দে মাতরম’-এর সরকারি পরিবেশনের বিষয়ে নতুন নির্দেশিকা জারি করে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের ২৮ জানুয়ারি ২০২৬-এর নির্দেশিকায় ছয় অন্তরার সরকারি পূর্ণ সংস্করণ নিয়ে প্রোটোকল নির্ধারণ করা হয়। সরকারি পূর্ণ সংস্করণটির সময়কাল প্রায় ৩ মিনিট ১০ সেকেন্ড বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এরপর আকাশবাণীও ২৬ মার্চ ২০২৬ থেকে ‘বন্দে মাতরম’-এর ছয় অন্তরার পূর্ণ সংস্করণ সম্প্রচার শুরু করে। এর আগে আকাশবাণীর সকালের সম্প্রচারে সাধারণত প্রথম দুই অন্তরার প্রায় ৬৫ সেকেন্ডের সংস্করণ ব্যবহার করা হতো। সরকারের নতুন নির্দেশের পর সরকারি সম্প্রচারে পূর্ণ সংস্করণ অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

কর্ণাটকের সরকারি অনুষ্ঠানে বন্দে মাতরমের প্রথম দুই অন্তরা গাওয়া হবে

সরকারি প্রোটোকল অনুযায়ী, কোনো সরকারি অনুষ্ঠানে ‘বন্দে মাতরম’ এবং জাতীয় সঙ্গীত দুটিই পরিবেশন করা হলে প্রথমে জাতীয় গান এবং তার পরে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করা হবে। সরকারি অনুষ্ঠানে নির্ধারিত প্রোটোকল এবং সরকারি সংস্করণ অনুসরণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই সংসদ Prevention of Insults to National Honour (Amendment) Bill, 2026 পাস করে। বিলটি রাজ্যসভায় ২৯ জুলাই এবং লোকসভায় ৩০ জুলাই পাস হয়। পরে এটি সংশোধিত আইনে পরিণত হয় এবং জাতীয় গানকেও জাতীয় সঙ্গীতের মতো আইনি সুরক্ষার আওতায় আনা হয়।

আইনে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে জাতীয় গান পরিবেশন বন্ধ করলে বা এমন পরিবেশনে অংশ নেওয়া কোনো সমাবেশে বাধা সৃষ্টি করলে তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। আইনের মূল বিষয় হলো ইচ্ছাকৃতভাবে গান বন্ধ করা বা সমাবেশে বাধা সৃষ্টি করা।

আইনে ‘বন্দে মাতরম’-এর ছয়টি অন্তরাই গাইতে হবে এবং এর কম অন্তরা গাইলেই কেউ অপরাধী হবেন—এমন কোনো স্পষ্ট বিধান নেই। আইনি বিধান মূলত গান বন্ধ করা বা গানে বাধা দেওয়ার কাজকে শাস্তিযোগ্য করে। ফলে দুই অন্তরা গাওয়া এবং ইচ্ছাকৃতভাবে গান বন্ধ করার মধ্যে আইনি পার্থক্য রয়েছে।

কংগ্রেসের প্রথম দুই অন্তরা গাওয়ার সিদ্ধান্তের পর বিজেপি দলটির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক তুষ্টিকরণ এবং জাতীয় অনুভূতির সঙ্গে আপস করার অভিযোগ তুলেছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও কংগ্রেসের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে সেটিকে তুষ্টিকরণের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করেছেন।

অন্যদিকে কংগ্রেস বিষয়টিকে তাদের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত এবং দলের আদর্শের সঙ্গে যুক্ত করছে। দলের বক্তব্য, প্রথম দুই অন্তরা গাওয়া কোনো নতুন সিদ্ধান্তের ফল নয়; বরং ১৯৩৭ সালে নির্ধারিত ঐতিহ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ডি কে শিবকুমারের বক্তব্যের পর এই বিতর্কে কর্ণাটক একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য হয়ে উঠেছে। কেন্দ্র সরকারের সরকারি প্রোটোকল এবং কংগ্রেসের রাজনৈতিক কর্মসূচির জন্য নির্ধারিত দুই অন্তরার অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য এখন প্রকাশ্য বিতর্কের বিষয়।

শিবকুমার স্পষ্ট করেছেন, কর্ণাটক সরকার কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সরকারি ও জনসাধারণের অনুষ্ঠানে ‘বন্দে মাতরম’-এর শুধুমাত্র প্রথম দুই অন্তরা গাওয়ার পক্ষে।

 

Leave a comment