ভোর ৪টে ২০ মিনিটে গান স্যালুট! মুজফফরপুরের সেই সেল ও ফাঁসির মঞ্চে আজও জীবন্ত ক্ষুদিরামের স্মৃতি

১১ অগস্ট ক্ষুদিরাম বসুর আত্মবলিদান দিবস। মুজফফরপুরের সেই জেল, ঐতিহাসিক সেল ও ফাঁসির মঞ্চে আজও সংরক্ষিত তাঁর স্মৃতি। জানুন অজানা ইতিহাস।

বয়স মাত্র ১৮। অথচ দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রাণ বিসর্জন দিতে এক মুহূর্তও পিছপা হননি ক্ষুদিরাম বসু। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে বাংলার মেদিনীপুর থেকে সুদূর মুজফফরপুরে পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ পুলিশের হাতে ধরা পড়ে ফাঁসির সাজা হয়। ১৯০৮ সালের ১১ অগস্ট ভোর ৪টে ২০ মিনিটে মুজফফরপুর জেলেই তাঁর জীবনাবসান। ১১৮ বছর পরও সেই জেলের সেল, ফাঁসির মঞ্চ এবং তাঁর স্মৃতি যেন আজও ইতিহাসকে চোখের সামনে এনে দেয়।

যে জেলে শেষ নিঃশ্বাস ক্ষুদিরামের

মুজফফরপুরের যে জেলে ক্ষুদিরাম বসুকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল, বর্তমানে সেই কারাগারের নাম ‘শহীদ ক্ষুদিরাম বোস সেন্ট্রাল জেল’।কারাগারের ভিতরে তাঁর স্মৃতিকে বিশেষভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। রয়েছে বিপ্লবীর মূর্তি, যে সেলে তাঁকে বন্দি রাখা হয়েছিল সেই ঐতিহাসিক কক্ষ এবং ফাঁসির মঞ্চ।প্রতিবছর ১১ অগস্ট এই জায়গাতেই বিশেষ মর্যাদায় পালিত হয় তাঁর আত্মবলিদান দিবস।

ভোর ৪টে ২০ মিনিটে বিশেষ শ্রদ্ধার্ঘ্য

ক্ষুদিরামের ফাঁসির সময়কে স্মরণ করেই এদিন ভোর ৪টে ২০ মিনিটে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। জেল কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ প্রশাসনের আধিকারিকরা উপস্থিত থেকে বীর বিপ্লবীকে শ্রদ্ধা জানান।রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গান স্যালুট দেওয়া হয়। পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের পাশাপাশি তাঁর স্মৃতিবিজড়িত সেল ও ফাঁসির মঞ্চেও শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।ফাঁসির সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে স্মরণ করে জেল চত্বরে বাজানো হয় বাঙালির আবেগের গান—‘একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি’।

বন্দিদেরও শোনানো হল ক্ষুদিরামের কাহিনি

এবারের স্মরণ অনুষ্ঠানের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ দিক ছিল জেলের আবাসিক বন্দিদের অংশগ্রহণ।জেল কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে বন্দিদের সামনে তুলে ধরা হয় ক্ষুদিরাম বসুর জীবন, স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর ভূমিকা এবং আত্মত্যাগের কাহিনি।প্রফুল্ল চাকীর সঙ্গে দেশের স্বাধীনতার জন্য মুজফফরপুরে তাঁর অভিযানের কথা এবং শেষ পর্যন্ত নিজের প্রাণ বিসর্জনের ইতিহাস বন্দিদের সামনে তুলে ধরা হয়।

বাংলাতেও আবেগঘন স্মরণ

শুধু বিহার নয়, ক্ষুদিরামের নিজের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গেও দিনটি পালিত হয় গভীর শ্রদ্ধায়।পশ্চিম মেদিনীপুরের বেলদা স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় ভোর ৪টে ২০ মিনিট নাগাদ ক্ষুদিরামের প্রতিকৃতিতে মাল্যদান করা হয়। শিক্ষক, অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মী এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ সেখানে উপস্থিত ছিলেন।আলোচনা ও শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে স্মরণ করা হয় বাংলার এই তরুণ বিপ্লবীকে।

মেদিনীপুরের হবিবপুরেও বিশেষ অনুষ্ঠান

মেদিনীপুর শহরের হবিবপুরেও আয়োজিত হয় বিশেষ স্মরণ অনুষ্ঠান। ক্ষুদিরাম বসুর মূর্তিতে মাল্যদান করে শ্রদ্ধা জানান মেদিনীপুরের বিধায়ক শংকর গুচ্ছাইত।এছাড়াও জেলার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে শহিদের আত্মবলিদান দিবস উপলক্ষে নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়।

কেন আজও ক্ষুদিরাম এতটা প্রাসঙ্গিক?

ক্ষুদিরামের আত্মত্যাগের সবচেয়ে বড় দিক হল তাঁর বয়স। মাত্র ১৮ বছর বয়সেই দেশের স্বাধীনতার জন্য মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছিলেন তিনি।তাঁর সাহস, আত্মত্যাগ এবং দেশপ্রেম পরবর্তী প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতা সংগ্রামের এক শক্তিশালী প্রতীক হয়ে রয়েছে। তাই মুজফফরপুরের সেই সেল কিংবা ফাঁসির মঞ্চ শুধু পুরনো স্থাপনা নয়—এগুলি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক রক্তাক্ত অধ্যায়ের জীবন্ত স্মারক।

১১ অগস্ট শহিদ ক্ষুদিরাম বসুর আত্মবলিদান দিবস। ১৯০৮ সালের এই দিনেই মাত্র ১৮ বছর বয়সে মুজফফরপুর জেলে ফাঁসিতে প্রাণ দেন বাংলার তরুণ বিপ্লবী। সেই ঐতিহাসিক জেলের বর্তমান নাম ‘শহীদ ক্ষুদিরাম বোস সেন্ট্রাল জেল’। তাঁর স্মৃতিবিজড়িত সেল ও ফাঁসির মঞ্চ আজও সংরক্ষিত। আত্মবলিদান দিবসে ভোর ৪টে ২০ মিনিটে গান স্যালুট, পুষ্পার্ঘ্য ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে শ্রদ্ধা জানানো হয়। একইসঙ্গে বাংলা ও বিহারের বিভিন্ন জায়গাতেও পালিত হয় শহিদ স্মরণ অনুষ্ঠান।

Leave a comment