আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি ফুটবলার লিওনেল মেসি জাতীয় দলের হয়ে তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচে বেনিনের বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে গোল করেছেন। বুয়েনস আইরেসের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত প্রীতি ম্যাচে আর্জেন্টিনা ৩-০ গোলে জয় পেয়েছে। ৩৯ বছর বয়সী মেসির এটি আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৮তম এবং শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। দ্বিতীয়ার্ধে পেনাল্টি থেকে গোল করে তিনি জাতীয় দলের হয়ে নিজের ১২৬তম গোল পূর্ণ করেন। ম্যাচে নিকোলাস ওতামেন্দি ও নিকো পাজের গোলেও তিনি সহায়তা করেন।
প্রায় ৮৫ হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষবার মাঠে নামেন মেসি। ম্যাচ শেষে লেজার লাইট শো, লাইভ মিউজিক ও বিশেষ পরিবেশনার মাধ্যমে তাঁকে সম্মান জানানো হয়। মেসি প্রায় ১০ মিনিট দর্শকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন। বক্তব্যের সময় তিনি একাধিকবার আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। আর্জেন্টিনার কয়েকজন খেলোয়াড়ও আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। ম্যানচেস্টার সিটির এঞ্জো ফার্নান্দেজসহ কয়েকজন খেলোয়াড়কে কাঁদতে দেখা যায়।
মেসি স্বীকার করেন, তিনি মাঠ ছাড়তে চাননি। তাঁর বক্তব্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তিকে আরও আবেগঘন করে তোলে।
ম্যাচ শুরুর আগেই মেসির আবেগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। স্টেডিয়ামে যাওয়ার পথে দলের বাসে তাঁকে চোখের পানি মুছতে দেখা যায়। মাঠে আর্জেন্টিনার জাতীয় সংগীত বাজানোর সময়ও তিনি আবেগপ্রবণ ছিলেন। হাজারো সমর্থক তাঁর সম্মানে উচ্চস্বরে জাতীয় সংগীত গেয়ে ওঠেন। কিক-অফের আগে স্টেডিয়ামে আতশবাজি পোড়ানো হয়। মাঠে আর্জেন্টিনার একটি বিশাল জার্সি রাখা হয়েছিল, যেখানে মেসির বিখ্যাত ১০ নম্বর এবং স্প্যানিশ শব্দ ‘Gracias’ অর্থাৎ ‘ধন্যবাদ’ লেখা ছিল।
ম্যাচের ১০ মিনিটের মাথায় খেলা কিছু সময়ের জন্য থামানো হয়। স্টেডিয়ামে ফের আতশবাজি পোড়ানো হয় এবং দর্শকেরা দাঁড়িয়ে মেসির সম্মানে করতালি দেন। বেনিনের খেলোয়াড়েরাও মেসির প্রতি সম্মান জানান এবং তাঁর সঙ্গে হাত মিলিয়ে আর্জেন্টিনার এই তারকাকে বিদায় দেন। এরপর খেলা আবার শুরু হলে মেসিকে আর্জেন্টিনার আক্রমণের কেন্দ্রে দেখা যায়।

ম্যাচে মেসি একাধিক সুযোগ তৈরি করেন। তাঁর দুটি ফ্রি-কিক বেনিনের গোলরক্ষক আটকে দেন। ছয় গজের বক্সের ভেতর থেকেও তিনি গোল করার দুটি সুযোগ পেয়েছিলেন, তবে সেগুলো কাজে লাগাতে পারেননি। ম্যাচের শেষ দিকে তাঁর একটি শট পোস্টে লাগে। দ্বিতীয়ার্ধে পেনাল্টি পেয়ে সেটি গোলে পরিণত করেন মেসি এবং আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ১২৬তম গোল পূর্ণ করেন।
আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার প্রায় দুই দশক ধরে চলেছে। ২০০৫ সালে তিনি জাতীয় দলের হয়ে অভিষেক করেন। হাঙ্গেরির বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে ৬৩তম মিনিটে তাঁকে মাঠে নামানো হয়েছিল। তবে অভিষেক স্মরণীয় হওয়ার বদলে বিতর্কিত হয়ে ওঠে, কারণ মাঠে নামার এক মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে তাঁকে লাল কার্ড দেখানো হয়।
এরপর মেসি আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সবচেয়ে সফল খেলোয়াড়দের একজন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। জাতীয় দলের হয়ে তিনি বিশ্বকাপ ও দুটি কোপা আমেরিকা শিরোপা জিতেছেন। দীর্ঘ সময় জাতীয় দলের সঙ্গে কোনো ট্রফি না পাওয়ার পর তাঁর নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা বড় শিরোপা অর্জন করে। বিশ্বকাপেও মেসি একাধিক রেকর্ড গড়েছেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় তিনি শীর্ষ খেলোয়াড়দের মধ্যে রয়েছেন। আন্তর্জাতিক ফুটবলেও সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় তাঁর নাম রয়েছে। তাঁর দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী ও পর্তুগালের তারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো তাঁর চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন।
মেসি আগস্টে আর্জেন্টিনার হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, এই সিদ্ধান্ত তাঁর জন্য সহজ ছিল না এবং এতে তিনি কষ্ট পেয়েছিলেন, তবে তাঁর মনে হয়েছিল সময় এসে গেছে। মেসির মতে, তিনি ২১ জুলাই তাঁর অবসরের বার্তা লিখে ফেলেছিলেন। তখন আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে হেরেছিল। তবে ক্লাব পর্যায়ে তাঁর ফুটবল ক্যারিয়ার অব্যাহত থাকবে।
জাতীয় দল থেকে বিদায়ের পর মেসি ক্লাব ফুটবলে মনোযোগ দেবেন। তিনি মেজর লিগ সকারের দল ইন্টার মিয়ামির হয়ে খেলছেন। ক্লাবটির সঙ্গে তাঁর চুক্তি ২০২৮ মৌসুমের শেষ পর্যন্ত। ফলে ক্লাব পর্যায়ে তাঁকে মাঠে দেখার সুযোগ এখনও থাকবে।
মেসির বিদায়ের আগে তাঁর একাধিক বর্তমান ও সাবেক সতীর্থ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে শ্রদ্ধা জানান। বার্সেলোনা ও প্যারিস সেন্ট-জার্মেইন উভয় ক্লাবে মেসির সঙ্গে খেলা ব্রাজিলের তারকা নেইমার বলেন, শুধু আর্জেন্টিনা নয়, পুরো বিশ্ব ফুটবলে মেসির অবদানের জন্য তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ। নেইমার মেসির সঙ্গে খেলার সুযোগকে নিজের জন্য সম্মানের বলে উল্লেখ করেন এবং জানান, তাঁর সঙ্গে খেলতে গিয়ে তিনি ফুটবলকে আরও বেশি ভালোবাসতে শিখেছেন।
মেসির ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও আর্জেন্টিনার সতীর্থ রদ্রিগো ডি পলও তাঁর প্রশংসা করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মেসি তাঁকে শুধু ভালো ফুটবলারই নয়, আরও ভালো মানুষ, বাবা ও বন্ধু হতে সাহায্য করেছেন। সাবেক আর্জেন্টিনা খেলোয়াড় অ্যাঞ্জেল দি মারিয়াও মেসির অবদানের কথা স্মরণ করে বলেন, মেসি তাঁর পুরো সামর্থ্য দিয়ে সবকিছু দিয়েছেন দেখে তিনি আনন্দিত।
বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচের মাধ্যমে আর্জেন্টিনার জাতীয় দলে মেসির দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি হলো। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরুতে লাল কার্ড পাওয়া সেই খেলোয়াড় প্রায় দুই দশক পর বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা ও ব্যক্তিগত রেকর্ডের দীর্ঘ তালিকা নিয়ে জাতীয় দলকে বিদায় জানালেন।
মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে হাজারো দর্শকের উপস্থিতি, সতীর্থদের চোখের পানি, আতশবাজি এবং মেসির আবেগঘন বক্তব্য এই রাতকে আর্জেন্টিনা ফুটবলের স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর একটি করে তুলেছে। জাতীয় দলের হয়ে মেসির বিদায় হলেও ক্লাব ফুটবলে তাঁর যাত্রা এখনও অব্যাহত রয়েছে। ইন্টার মিয়ামির সঙ্গে তাঁর চুক্তির কারণে আগামী বছরগুলোতেও তাঁকে মাঠে দেখা যাবে।









