নেপাল তিব্বত সীমান্তে বন্যায় ১৬৫ জনের মৃত্যু ১০০০ এর বেশি নিখোঁজ

নেপাল তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যায় নেপালে ১৬২ ও তিব্বতে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। ১০০০-এর বেশি মানুষ নিখোঁজ এবং বন্যা ও ভূমিধসে সড়ক সেতু ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বুধবার সকালে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে। নেপালে ১৬২ জন এবং তিব্বতে ৩ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। ১,০০০-এর বেশি মানুষ এখনও নিখোঁজ বলে জানা যাচ্ছে। বন্যা ও ভূমিধসের কারণে সড়ক, সেতু এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযান চলছে।

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে বুধবার সকালে আকস্মিক বন্যার স্রোত এতটাই তীব্র ছিল যে বহু এলাকার মানুষ নিরাপদ স্থানে যাওয়ার সুযোগ পাননি। বন্যার জল প্রায় ৩০ ফুট পর্যন্ত উঠে বাড়িঘর, যানবাহন এবং সরকারি স্থাপনা ভাসিয়ে নিয়ে যায়। নেপালে ১৬২ জন এবং তিব্বতে ৩ জনের মৃত্যুর তথ্য দেওয়া হয়েছে। ১,০০০-এর বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।

বন্যায় অবকাঠামোরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ১৯টি সেতু, প্রায় ৪০ কিলোমিটার সড়ক এবং ১৩টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ধ্বংস বা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে এবং উদ্ধারকারী দলগুলির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

প্রাথমিকভাবে আশঙ্কা করা হয়েছিল যে বন্যার আগে এলাকায় ভূমিকম্প হয়েছিল। বুধবার সকাল প্রায় ৮টা ৩৭ মিনিটে নেপাল-চীন সীমান্ত এবং কাঠমান্ডুর উত্তরে তীব্র কম্পন অনুভূত হয়। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা USGS প্রাথমিকভাবে এটিকে ৪.৪ মাত্রার ভূমিকম্প বলে জানিয়েছিল।

পরবর্তী তথ্য অনুযায়ী, এটি প্রচলিত অর্থে ভূমিকম্প ছিল না। চীনের দিকে ল্হেন্দে নদী এলাকায় পাহাড়ের একটি বড় অংশ বরফ ও পাথরসহ নদীতে ধসে পড়ে। এর ফলে এত শক্তিশালী কম্পন তৈরি হয় যে মানুষ প্রায় ৫.২ মাত্রার ভূমিকম্পের মতো ঝাঁকুনি অনুভব করেন।

বিজ্ঞানীদের ধারণা, পাহাড় থেকে হিমবাহের একটি বড় অংশও ভেঙে নিচে পড়ে থাকতে পারে। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া বুঝতে বিশেষজ্ঞদের আরও সময় লাগতে পারে।

পাহাড়ের অংশ ধসে পড়ার পর জল ও বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ ল্হেন্দে খোলা নদীতে প্রবেশ করে। এটি ভোতেকোশি নদীর একটি উপনদী এবং চীন থেকে প্রবাহিত হয়ে নেপালের গভীর উপত্যকার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়। পরে জল ও ধ্বংসাবশেষের তীব্র স্রোত ভোতেকোশি এবং ত্রিশূলী নদীতে পৌঁছায়।

স্রোতের তীব্রতার প্রমাণ পাওয়া যায় প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরের চিতওয়ানেও এর প্রভাব পৌঁছানোয়। সেখানে ত্রিশূলী ও নারায়ণী নদী থেকে এখনও পর্যন্ত ৬৪টি মৃতদেহ উদ্ধারের তথ্য দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সম্পূর্ণ মৃতদেহের পাশাপাশি দেহের কিছু অংশও রয়েছে। উদ্ধার করা সব মৃতদেহ ভরতপুর হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।

দুর্যোগে ভারতীয় নাগরিকদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর সামনে এসেছে। নেপালে নিখোঁজদের মধ্যে ১৩৩-এর বেশি ভারতীয় রয়েছেন বলে জানা গেছে। তাঁদের মধ্যে কৈলাস মানস সরোবর যাত্রায় যাওয়া তীর্থযাত্রীরাও রয়েছেন।

তামিলনাড়ুর ৩৭ জন পর্যটক নিখোঁজ হওয়ার তথ্য দেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, তাঁরা একটি মন্দিরের দিকে যাওয়ার সময় আকস্মিক বন্যার কবলে পড়েন। এছাড়া কলকাতা থেকে কৈলাস মানস সরোবর যাত্রায় যাওয়া ৩২ জনের একটি দলও নিখোঁজ বলে জানানো হয়েছে। ওই দলে ৩০ জন পর্যটক এবং ২ জন ট্যুর ম্যানেজার ছিলেন।

দলটি ২১ আগস্ট কলকাতা থেকে রওনা হয় এবং পরের দিন নেপালে পৌঁছায়। বুধবার সকালে তিব্বতের দিকে যাওয়ার জন্য দলটি রসুওয়াগঢ়ীতে পৌঁছেছিল। প্রায় সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে সদস্যরা ইমিগ্রেশন অফিসে ছিলেন। সেই সময় সীমান্ত এলাকায় আকস্মিক বন্যা আসে। এরপর দলের কোনও সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

রসুওয়ায় বন্যায় একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত ১৩৩-এর বেশি কর্মী ও শ্রমিকও নিখোঁজ বলে জানা গেছে। তাঁদের মধ্যে বিদেশি কর্মীরাও রয়েছেন।

নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের দল ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পৌঁছে তল্লাশি অভিযান চালাচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন, নিরাপত্তা সংস্থা এবং স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলির সহায়তায় সার্চ ও রেসকিউ অপারেশন চলছে। রসুওয়ায় ২০ মেগাওয়াটের লাংটাং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।

বন্যা ও ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার এবং ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দিতে নেপাল সরকার ৩০টি হেলিকপ্টার মোতায়েন করেছে। ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রেসকিউ কোঅর্ডিনেশন সেন্টার সকাল থেকেই উদ্ধার অভিযানের প্রস্তুতি শুরু করেছিল।

এর মধ্যে ১০টি হেলিকপ্টার ক্ষতিগ্রস্ত ও আশপাশের এলাকায় পাঠানো হয়েছে। আরও ২০টি হেলিকপ্টার অতিরিক্ত উদ্ধার অভিযানের জন্য স্ট্যান্ডবাই রাখা হয়েছে। খারাপ আবহাওয়া, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক এবং ধ্বংসাবশেষের কারণে বহু এলাকায় সড়কপথে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এসব এলাকায় আকাশপথে উদ্ধার অভিযান চালানো হচ্ছে।

নেপাল তিব্বত সীমান্তে বন্যায় ১৬৫ জনের মৃত্যু ১০০০ এর বেশি নিখোঁজ

বন্যার পর বহু এলাকায় বিপুল পরিমাণ কাদা ও ধ্বংসাবশেষ জমে রয়েছে। চীনের গ্যিরং বন্দরে যাওয়ার সড়কগুলিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই এলাকা চীনের তিব্বত ও নেপালকে সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তপথগুলির মধ্যে রয়েছে।

কিছু এলাকায় কাদার স্তর প্রায় ১.৫ মিটার পর্যন্ত রয়েছে বলে জানা গেছে। ভূমিধসের প্রান্ত গ্যিরং বন্দর থেকে প্রায় ২.৫ কিলোমিটার দূরে বলে জানানো হয়েছে। রাতে বৃষ্টির কারণে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। উদ্ধারকারীদের সামনে নতুন ভূমিধস এবং রাস্তা ধসে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

নেপালের বন্যার প্রভাব ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকায় পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে বিহারের গণ্ডক নদী এবং এর সঙ্গে যুক্ত নদীগুলির জলস্তরের ওপর নজর রাখা হচ্ছে। নেপাল থেকে প্রায় ৩ মিটার উচ্চতার বন্যার ঢেউ আসার সতর্কতা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

পশ্চিম চম্পারণ, পূর্ব চম্পারণ, গোপালগঞ্জ, সারণ, মুজফ্ফরপুর এবং বৈশালীতে বিশেষ সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। সীতামঢ়ী ও শিবহরেও নজর রাখা হচ্ছে। নেপাল থেকে ত্রিশূলী নদীর মাধ্যমে জল গণ্ডক নদীতে পৌঁছাতে পারে। এর ফলে বিহারের নিচু এলাকায় জলস্তর বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

উত্তরপ্রদেশের মহারাজগঞ্জ ও কুশীনগরেও সতর্কতা জারি করা হয়েছে বলে জানা গেছে। বিহারের বগহা এলাকায় গণ্ডক নদীর জল বাড়ার সঙ্গে নেপাল থেকে আসা ধ্বংসাবশেষও দেখা গেছে।

দুর্যোগের পর আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সহায়তা পৌঁছাচ্ছে। রসুওয়ায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ ও সম্প্রদায়গুলির সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ৫ লাখ ডলার দেওয়ার ঘোষণা করেছে।

এই সহায়তা অস্থায়ী আশ্রয়, প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মতো জরুরি প্রয়োজন মেটাতে ব্যবহার করা হবে। মার্কিন প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় একজন দুর্যোগ পরামর্শক পাঠানোর কথাও জানিয়েছে। কাঠমান্ডুতে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন নাগরিকদের পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছে।

বন্যায় নেপালের পরিবহন ও জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রসুওয়া এবং আশপাশের এলাকায় ১৩টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প প্রভাবিত হয়েছে। এর মধ্যে ৮টি চালু এবং ৫টি নির্মাণাধীন প্রকল্প রয়েছে। এগুলির মোট ক্ষমতা প্রায় ৭৪৮ মেগাওয়াট বলে জানানো হয়েছে।

বেত্রাবতী থেকে রসুওয়াগঢ়ী সীমান্ত চৌকি পর্যন্ত সড়কের প্রায় ৪২ কিলোমিটার অংশ ক্ষতিগ্রস্ত বা ভেসে গেছে। এছাড়া অন্তত ৩২টি বড় সেতু ধসে পড়েছে বলে জানা গেছে। একাধিক স্থানীয় ঝুলন্ত সেতুও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে গ্রাম ও বসতিগুলির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে।

বন্যার পর পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জপূর্ণ রয়েছে। একদিকে নিখোঁজদের সন্ধান চলছে, অন্যদিকে খারাপ আবহাওয়া, ধ্বংসাবশেষ, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক এবং সম্ভাব্য নতুন ভূমিধসের আশঙ্কা উদ্ধার অভিযানকে প্রভাবিত করছে।

নিখোঁজদের সন্ধানের পাশাপাশি সীমান্তবর্তী এলাকায় আটকে পড়া বিদেশি নাগরিকদের তথ্য সংগ্রহও অগ্রাধিকার পেয়েছে। নেপাল ও চীনের কর্মকর্তারা ত্রাণ ও উদ্ধার অভিযানে যুক্ত রয়েছেন। ভারতও তার নাগরিকদের পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছে।

 

Leave a comment