শাহবাজ শরিফের হুঁশিয়ারি পাকিস্তানের পানি বন্ধ বা কমানোর চেষ্টা হলে জবাব দেওয়া হবে

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সিন্ধু জল চুক্তি নিয়ে ভারতকে সতর্ক করে বলেছেন, পাকিস্তানের অংশের পানি বন্ধ বা প্রবাহ কমানোর চেষ্টা হলে জবাব দেওয়া হবে। কাশ্মীর, মে ২০২৫-এর ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষ, চীন, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের পানি সংকট নিয়েও বক্তব্য দেন তিনি।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ভারতকে সতর্ক করে বলেছেন, পাকিস্তানের অংশের পানি বন্ধ বা প্রবাহ কমানোর কোনো চেষ্টা হলে তার জবাব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তানের নীতিতে কোনো পরিবর্তন হবে না বলেও জানিয়েছেন।

ইসলামাবাদে একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় শাহবাজ শরিফ বলেন, পাকিস্তানের অংশের পানির বিষয়ে কোনো ধরনের সমঝোতা গ্রহণ করা হবে না। পাকিস্তানের পানি বন্ধ বা তার প্রবাহ কমানোর চেষ্টা করা হলে দেশ এর জবাব দেবে বলে তিনি সতর্ক করেন। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সিন্ধু জল চুক্তি নিয়ে উত্তেজনা অব্যাহত থাকার সময় তার এই বক্তব্য এসেছে।

শাহবাজ শরিফ বলেন, কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তানের নীতিতে কোনো পরিবর্তন হবে না। তিনি দাবি করেন, কাশ্মীরিদের আত্মত্যাগ ব্যর্থ হবে না এবং পাকিস্তান তাদের অধিকারের পক্ষে সমর্থন অব্যাহত রাখবে।

শাহবাজ তাঁর বক্তব্যে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরেরও প্রশংসা করেন। তিনি দাবি করেন, মুনিরের নেতৃত্বে পাকিস্তান ভারতের মোকাবিলা করেছে এবং ভারতকে পরাজিত করেছে। তবে মে ২০২৫ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে হওয়া সামরিক সংঘর্ষ নিয়ে দুই দেশের দাবি আলাদা।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী আবারও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, মে ২০২৫ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক সংঘর্ষ বন্ধে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। শাহবাজের দাবি অনুযায়ী, ট্রাম্পের উদ্যোগে দুই দেশের মধ্যে সময়মতো যুদ্ধবিরতি সম্ভব হয়েছিল।

ভারত এই দাবির সঙ্গে একমত নয়। ভারতীয় পক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, সামরিক অভিযান বন্ধের বিষয়ে দুই দেশের সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ হয়েছিল এবং যুদ্ধবিরতির ক্ষেত্রে কোনো তৃতীয় দেশের মধ্যস্থতা গ্রহণ করা হয়নি। এই বিষয়ে ভারত ও পাকিস্তানের প্রকাশ্য ব্যাখ্যা আলাদা রয়েছে।

শাহবাজ শরিফ তাঁর বক্তব্যে চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কের বিষয়টিও তুলে ধরেন। তিনি চীনকে পাকিস্তানের অজিম ও নির্ভরযোগ্য বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বলেন, কঠিন পরিস্থিতিতে বেইজিং পাকিস্তানের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছে। তিনি দুই দেশের সম্পর্ককে হিমালয়ের চেয়েও উঁচু বলে উল্লেখ করে কৌশলগত অংশীদারিত্বকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরেন।

চীন ও পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক, প্রতিরক্ষা ও অবকাঠামো প্রকল্পকেন্দ্রিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরও দুই দেশের বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদারিত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

শাহবাজ শরিফ তাঁর বক্তব্যে ফিলিস্তিন ও আফগানিস্তানের প্রসঙ্গও তোলেন। তিনি বলেন, পাকিস্তান ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকারের পক্ষে সমর্থন অব্যাহত রাখবে।

একই সঙ্গে তিনি আফগানিস্তানের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানান, যাতে তাদের ভূখণ্ড পাকিস্তান বা অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যবহার করা না হয়।

নিরাপত্তা ও সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সম্পর্কের মধ্যে উত্তেজনা রয়েছে। ইসলামাবাদ দীর্ঘদিন ধরে কাবুলের কাছে তাদের ভূখণ্ডে সক্রিয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে।

এপ্রিল ২০২৫ সালে পহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সিন্ধু জল চুক্তি নিয়ে বিরোধ আরও গভীর হয়। হামলার পর ভারত সিন্ধু জল চুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। ভারত এই সিদ্ধান্তকে পাকিস্তানের সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদে সমর্থনের নীতির প্রেক্ষাপটে দেখেছে।

ভারতের বক্তব্য, পাকিস্তান সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ না নেওয়া পর্যন্ত চুক্তি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার প্রশ্ন নেই। অন্যদিকে, পাকিস্তান ধারাবাহিকভাবে বলে আসছে, সিন্ধু জল চুক্তি একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং ভারত একতরফাভাবে এটি স্থগিত করতে পারে না।

সিন্ধু জল চুক্তি ১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পাদিত হয়। এই চুক্তিতে সিন্ধু নদী ব্যবস্থার ছয়টি প্রধান নদীর পানি ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত বিধান নির্ধারণ করা হয়েছিল।

চুক্তি অনুযায়ী, পূর্বাঞ্চলীয় নদী রাভি, বিয়াস ও শতদ্রুর পানির ওপর ভারতের প্রধান ব্যবহারের অধিকার রয়েছে। পশ্চিমাঞ্চলীয় নদী সিন্ধু, ঝিলম ও চেনাবের পানির ব্যবহারে পাকিস্তান বড় অংশ পেয়েছে। তবে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে উভয় দেশকে নির্ধারিত ব্যবহারের অনুমতিও দেওয়া হয়েছে।

এই ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে গত কয়েক দশকে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একাধিক বিরোধ দেখা দিয়েছে। ভারতের বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে পাকিস্তান একাধিকবার আপত্তি জানিয়েছে। অন্যদিকে, ভারত চুক্তির বিধান অনুযায়ী নিজেদের অধিকারের কথা বলে আসছে।

সিন্ধু জল নিয়ে বিরোধ এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন পাকিস্তানের বিভিন্ন অংশ পানি সংকট ও পানির প্রাপ্যতা সংক্রান্ত সমস্যার মুখোমুখি। সিন্ধ ও বেলুচিস্তানের মতো অঞ্চলে কৃষি, পানীয় জল ও সেচ ব্যবস্থায় পানির ঘাটতির চাপ উদ্বেগের বিষয় হয়ে রয়েছে।

উপলব্ধ প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিন্ধের কয়েকটি প্রধান খাল ব্যবস্থায় পানির ঘাটতি নথিভুক্ত হয়েছে। নর্থ ওয়েস্ট ক্যানালে প্রায় 64.1 শতাংশ, রাইস ক্যানালে প্রায় 38 শতাংশ এবং দাদু ক্যানালে প্রায় 82 শতাংশ ঘাটতির উল্লেখ রয়েছে। তবে সময় ও স্থানীয় পানির প্রাপ্যতার ওপর ভিত্তি করে এই পরিসংখ্যানের মূল্যায়ন পরিবর্তিত হতে পারে।

সিন্ধের সেচ ব্যবস্থায় সুক্কুর ব্যারাজের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এটি ওই অঞ্চলের কৃষি ও খাল ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান পানির উৎস। পানির স্তর কমে গেলে কৃষক, ফসল ও আঞ্চলিক অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সিন্ধু জল চুক্তি দীর্ঘদিন ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সহযোগিতার একটি উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হলেও সন্ত্রাসবাদ, কাশ্মীর ও জল প্রকল্পসংক্রান্ত বিরোধ চুক্তিকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়েছে।

পাকিস্তানের পক্ষ থেকে পানি বন্ধের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা এবং ভারতের পক্ষ থেকে সন্ত্রাসবাদ নিয়ে কঠোর অবস্থান দুই দেশের সম্পর্কের জটিলতা তুলে ধরেছে। শাহবাজ শরিফের সর্বশেষ বক্তব্যও এই বিস্তৃত উত্তেজনার মধ্যেই এসেছে।

পাকিস্তান তাদের অংশের পানিতে সম্ভাব্য যেকোনো পরিবর্তনের বিরোধিতা করছে। অন্যদিকে, ভারত সন্ত্রাসবাদ ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে জল চুক্তির বিষয়টিকে যুক্ত করে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছে।

আগামী সময়ে সিন্ধু নদী ব্যবস্থার জলসম্পদ, সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ এবং কাশ্মীরের বিষয় ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে রাজনৈতিক ও সামরিক সংলাপের পাশাপাশি জলসম্পদ সংক্রান্ত বিষয়েও স্পষ্টতা ও স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

 

Leave a comment