Ramendra Sundar Trivedi: ইতিহাসের পাতায় আজ অনেকটাই আড়ালে চলে গেলেও একসময় মুর্শিদাবাদের জেমোর এই কৃতী সন্তান ছিলেন বাংলার জ্ঞানচর্চার অন্যতম উজ্জ্বল মুখ। বিজ্ঞানের কঠিন বিষয় সাধারণ মানুষের কাছে সহজ বাংলায় পৌঁছে দেওয়া থেকে শুরু করে দর্শন ও সংস্কৃত শাস্ত্র নিয়ে লেখালেখি—বহুমুখী প্রতিভায় নিজেকে আলাদা করে চিনিয়েছিলেন আচার্য রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী। তাঁর ১৬২তম জন্মজয়ন্তীতে কান্দি শহরে বিশেষ কর্মসূচির মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানানো হল তাঁকে।

জেমোর মাটিতে জন্ম এক মেধাবী প্রতিভার
১৮৬৪ সালের ২২ অগাস্ট, বাংলা ১২৭১ সালের ৫ ভাদ্র, মুর্শিদাবাদের জেমোর ত্রিবেদী পরিবারে গোবিন্দ সুন্দর ও চন্দ্র কামিনীর ঘরে জন্মগ্রহণ করেন রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী। শৈশব থেকেই পড়াশোনায় তাঁর অসাধারণ মেধার পরিচয় পাওয়া যায়।মাত্র ১৪ বছর বয়সেই, ১৮৭৮ সালে, জেমো রাজপরিবারের নরেন্দ্র নারায়ণের কনিষ্ঠ কন্যা ইন্দুপ্রভা দেবীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তবে পারিবারিক জীবনের পাশাপাশি তাঁর পড়াশোনার পথও এগিয়ে চলে সমান তালে।
একের পর এক পরীক্ষায় সাফল্য
শিক্ষাজীবনে রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদীর সাফল্যের তালিকা ছিল দীর্ঘ। ১৮৮১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এনট্রান্স পরীক্ষায় প্রথম হয়ে তিনি ২৫ টাকা বৃত্তি পান।এরপর ১৮৮৩ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফএ পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। সেই সাফল্যের জন্য পান স্বর্ণপদক ও বৃত্তি। ১৮৮৬ সালে একই কলেজ থেকে বিজ্ঞানে অনার্স-সহ বি.এ পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন।এরপরও থামেননি তিনি। ১৮৮৭ সালে বিজ্ঞান বিষয়ে এমএ পরীক্ষায় প্রথম হয়ে স্বর্ণপদক ও পুরস্কার লাভ করেন। পরের বছর, ১৮৮৮ সালে পদার্থবিদ্যা ও রসায়নে প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তিও পান।

বিজ্ঞানের অধ্যাপক থেকে কলেজের অধ্যক্ষ
শিক্ষাজীবনের সাফল্যের পর শিক্ষকতা ও জ্ঞানচর্চার জগতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন রামেন্দ্র সুন্দর। ১৮৯২ সালে রিপন কলেজে পদার্থবিদ্যা ও রসায়নের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন তিনি।পরবর্তীতে কলেজের অস্থায়ী অধ্যক্ষ এবং পরে স্থায়ী অধ্যক্ষের দায়িত্বও সামলান। অর্থাৎ গবেষণা ও বিজ্ঞানচর্চার পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনাতেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল।
বিজ্ঞানকে সহজ বাংলায় পৌঁছে দিয়েছিলেন
রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদীর বিশেষ কৃতিত্ব ছিল বিজ্ঞানের জটিল বিষয়কে সাধারণ পাঠকের উপযোগী করে উপস্থাপন করা। শুধু বিশুদ্ধ বিজ্ঞান নয়, দর্শন ও সংস্কৃত শাস্ত্রের কঠিন বিষয়ও সহজ বাংলায় ব্যাখ্যা করতেন তিনি।জন্মসূত্রে বাঙালি না হয়েও বাংলা ভাষার প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল। আজীবন বাংলা ভাষায় লেখালেখি ও জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে তিনি বাংলা গদ্য এবং বিজ্ঞানভিত্তিক সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেন।
১৬২তম জন্মজয়ন্তীতে কান্দিতে স্মরণ
রবিবার কান্দি শহরে পালিত হয় রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদীর ১৬২তম জন্মজয়ন্তী। জেমো নতুনবাড়ি থেকে শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। রণপা ও ব্যান্ডের সঙ্গে কয়েকশো পড়ুয়া তাতে অংশ নেয়।পরে কান্দি মহকুমা শাসকের দফতরের পাশে থাকা রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদীর মূর্তিতে এবং কান্দি রাজ উচ্চ বিদ্যালয়ে মাল্যদান করে শ্রদ্ধা জানানো হয়। অনুষ্ঠানে রাজ্যের বিদ্যুৎ দফতরের প্রতিমন্ত্রী গার্গী দাস ঘোষ এবং কান্দির মহকুমা শাসক মধুশ্রীও উপস্থিত ছিলেন।

ভুলতে বসেছে নিজের মাটিই?
স্থানীয়দের একাংশের আক্ষেপ, এমন একজন কৃতী মনীষীর স্মৃতি ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যাচ্ছে। তাঁর পরিবারের স্মৃতি ও পুরনো স্থাপত্যের কিছু নিদর্শন এখনও রয়েছে। কিন্তু সরকারি উদ্যোগে নিয়মিতভাবে তাঁর জন্মদিন পালনের ব্যবস্থা নেই বলেই অভিযোগ।এবার রামেন্দ্র অনুরাগী এবং কান্দি প্রেসক্লাবের উদ্যোগে জন্মজয়ন্তী ঘিরে বিশেষ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। পড়ুয়াদের অংশগ্রহণও অনুষ্ঠানে আলাদা মাত্রা যোগ করে।

মুর্শিদাবাদের কান্দির জেমোতে জন্ম নেওয়া আচার্য রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী ছিলেন একাধারে বিজ্ঞানী, অধ্যাপক, লেখক ও জ্ঞানচর্চার অনন্য সাধক। বিজ্ঞান, দর্শন ও সংস্কৃত শাস্ত্রের জটিল বিষয় সহজ বাংলায় তুলে ধরে তিনি বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চাকে সমৃদ্ধ করেছিলেন। তাঁর ১৬২তম জন্মজয়ন্তীতে কান্দিতে শোভাযাত্রা ও শ্রদ্ধানুষ্ঠানের মাধ্যমে স্মরণ করা হল এই কৃতী মনীষীকে।








