SIR বিতর্কে কংগ্রেসকে নিশানা সম্বিত পাত্রার, নবীন চাওলার প্রসঙ্গ তুলে নির্বাচন কমিশনের নিয়োগব্যবস্থার পক্ষে সওয়াল

নির্বাচন কমিশনের কার্যপ্রণালী ও SIR নিয়ে বিতর্কের মধ্যে BJP সাংসদ সম্বিত পাত্রা কংগ্রেসের সমালোচনার জবাব দেন। তিনি নবীন চাওলার নিয়োগ এবং নির্বাচন কমিশনারদের বর্তমান নিয়োগব্যবস্থার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।

২৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে সাংবাদিক বৈঠকে ভারতীয় জনতা পার্টির (BJP) সাংসদ সম্বিত পাত্রা নির্বাচন কমিশনের কার্যপ্রণালী, বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা (SIR) এবং নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগব্যবস্থা নিয়ে কংগ্রেসের সমালোচনার জবাব দেন। তিনি প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার নবীন চাওলার নিয়োগ ও কংগ্রেস শাসনকালে নির্বাচন কমিশন-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের উল্লেখ করে বর্তমান নিয়োগব্যবস্থার পক্ষে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন।

SIR নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরে মতপার্থক্যের রিপোর্ট প্রকাশের পর বিরোধী দলগুলি কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এই প্রেক্ষাপটে BJP কংগ্রেসের অভিযোগের জবাব দিয়েছে।

সম্বিত পাত্রা বলেন, নির্বাচন কমিশনের কাজকর্ম ও স্বাধীনতা নিয়ে কংগ্রেস যে প্রশ্ন তুলছে, তা কংগ্রেসের অতীত রেকর্ডের প্রেক্ষাপটেও দেখা উচিত। তাঁর অভিযোগ, কংগ্রেসের দীর্ঘ শাসনকালে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা প্রভাবিত হয়েছিল।

পাত্রা প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনারদের উল্লেখ করে বলেন, কংগ্রেস শাসনকালে কিছু আধিকারিককে অবসর গ্রহণের পর সরকারি পদ দেওয়া হয়েছিল। তিনি এটিকে নির্বাচন কমিশন ও তৎকালীন সরকারের সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত করে বিরোধীদের বর্তমান অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

এগুলি পাত্রা ও BJP-র রাজনৈতিক অভিযোগ। অন্যদিকে, কংগ্রেস বিভিন্ন সময়ে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা এবং বর্তমান নিয়োগব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

পাত্রা প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার নবীন চাওলার বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, চাওলাকে ২০০৫ সালে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ করা হয় এবং পরে তিনি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় চাওলা মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ছিলেন।

পাত্রা ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্সের (UPA) জয়ের উল্লেখ করে নির্বাচন কমিশন ও তৎকালীন সরকারের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তবে কোনও নির্বাচনের ফলাফল এবং কোনও নির্বাচন কমিশনারের নিয়োগের মধ্যে সরাসরি সম্পর্কের সিদ্ধান্ত শুধু এই তথ্যের ভিত্তিতে টানা যায় না।

পাত্রার বক্তব্যের মূল যুক্তি ছিল, বর্তমান নির্বাচন কমিশন নিয়ে প্রশ্ন তোলার আগে কংগ্রেসেরও তার শাসনকালে নির্বাচন কমিশন-সংক্রান্ত নিয়োগ ও সিদ্ধান্ত নিয়ে জবাব দেওয়া উচিত।

BJP নেতা নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের বর্তমান ব্যবস্থারও উল্লেখ করেন। ২০২৩ সালে সংসদ মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ, পরিষেবার শর্ত ও মেয়াদ সংক্রান্ত নতুন আইন প্রণয়ন করে।

বর্তমান ব্যবস্থায় নির্বাচন কমিশনারদের নির্বাচন কমিটিতে প্রধানমন্ত্রী, লোকসভায় বিরোধী দলনেতা এবং প্রধানমন্ত্রী মনোনীত কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার একজন মন্ত্রী রয়েছেন। এর আগে সুপ্রিম কোর্টের অন্তর্বর্তী ব্যবস্থায় সংসদ আইন প্রণয়ন না করা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী, লোকসভায় বিরোধী দলনেতা এবং ভারতের প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছিল। ২০২৩ সালের আইন সেই কাঠামো পরিবর্তন করে।

পাত্রা নিয়োগব্যবস্থার এই পরিবর্তনকে নির্বাচন কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার সঙ্গে যুক্ত করে সরকারের অবস্থানকে সমর্থন করেন। নিয়োগব্যবস্থার সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে মামলা সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন।

বর্তমান বিতর্কের সূত্রপাত একটি রিপোর্টের পর, যেখানে দাবি করা হয়, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশী গত ১০ মাসে নির্বাচন কমিশনের কয়েকটি সিদ্ধান্ত ও প্রক্রিয়া নিয়ে অন্তত ১৪ বার আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানিয়েছেন। রিপোর্ট অনুযায়ী, আপত্তিগুলির সঙ্গে SIR, নতুন ভোটারের নিবন্ধন, ভোটার তালিকায় পরিবর্তন এবং নির্বাচনী তথ্য ব্যবস্থাপনার মতো বিষয় যুক্ত ছিল।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, কিছু ক্ষেত্রে দুই নির্বাচন কমিশনার প্রশ্ন তুলেছিলেন যে তাঁদের জ্ঞান বা অনুমোদন ছাড়াই কমিশনের নামে সিদ্ধান্ত বা নির্দেশ জারি করা হয়েছে। রিপোর্টে Form 6-এ পরিবর্তন, ভোটার তালিকার ডিজিটাল ডেটাবেস কেন্দ্রীভূত করা, পশ্চিমবঙ্গে ভোটারদের আপিল এবং গোয়ায় কিছু যোগ্য ভোটারকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয় উল্লেখ করা হয়।

রিপোর্টে আরও বলা হয়, কিছু আপত্তিতে কমিশনের আইটি ব্যবস্থা এবং ভোটার তথ্যের প্রবেশাধিকার নিয়েও উদ্বেগ জানানো হয়েছিল।

এই রিপোর্টগুলির পর নির্বাচন কমিশন-সংশ্লিষ্ট আধিকারিকরা বলেন, কমিশনের ভিতরে পৃথক মতামত, মন্তব্য ও পরামর্শ থাকা প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার অংশ। কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, SIR-সহ তার সিদ্ধান্তগুলি তিন নির্বাচন কমিশনারের অনুমোদন পেয়েছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতভাবে নেওয়া হয়েছে।

ফলে বর্তমান বিতর্কে দুটি পৃথক দাবি সামনে এসেছে। একদিকে প্রকাশিত রিপোর্টে দুই নির্বাচন কমিশনারের নথিভুক্ত আপত্তির বিবরণ রয়েছে, অন্যদিকে কমিশনের বক্তব্য, এই অভ্যন্তরীণ আলোচনাকে প্রাতিষ্ঠানিক মতবিরোধ বা একতরফা সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা উচিত নয়।

Special Intensive Revision বা SIR হল ভোটার তালিকার বিশেষ পুনর্বিবেচনা প্রক্রিয়া। এর উদ্দেশ্য ভোটার তালিকায় থাকা নাম এবং ভোটারদের যোগ্যতা-সংক্রান্ত রেকর্ড যাচাই করা।

সাম্প্রতিক মাসগুলিতে SIR-এর পরিধি একাধিক রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিস্তৃত হয়েছে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে খসড়া ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটির বেশি নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল। তবে কোনও নাম বাদ পড়ার অর্থ সবসময় ভোটারের ভোটাধিকার স্থায়ীভাবে শেষ হয়ে যাওয়া নয়; বিভিন্ন শ্রেণিতে দাবি, আপত্তি এবং আপিলের ব্যবস্থাও রয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে SIR নিয়ে বিচারবিভাগীয় হস্তক্ষেপ হয়েছে। নির্বাচন কমিশন সেপ্টেম্বরে সুপ্রিম কোর্টকে জানিয়েছিল, SIR-এর পর বাদ পড়া ভোটারদের পুনর্বহাল এবং অন্যান্য পরিবর্তন নিয়ে লক্ষাধিক আপিল বিচারাধীন রয়েছে।

সম্বিত পাত্রার সাংবাদিক বৈঠকের মূল বক্তব্য ছিল, বর্তমান বিতর্ককে শুধু SIR-এর সাম্প্রতিক ঘটনাগুলির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নির্বাচন কমিশনের অতীত কার্যপ্রণালী ও নিয়োগের প্রেক্ষাপটেও দেখা উচিত।

তিনি কংগ্রেসের শাসনকালে নির্বাচন কমিশন-সংক্রান্ত আধিকারিকদের নিয়োগের উল্লেখ করেন এবং বর্তমান সরকার নিয়োগপ্রক্রিয়ায় যে পরিবর্তন করেছে, তার পক্ষে বক্তব্য রাখেন। পাত্রা আরও বলেন, কমিশনের ভিতরে চিঠিপত্র এবং পৃথক মতামতকে গণতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখা উচিত। তাঁর বক্তব্য, নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যে মতবিনিময় এবং SIR নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে ঐকমত্য গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ।

এটি BJP-র রাজনৈতিক অবস্থান। অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলির বক্তব্য, দুই নির্বাচন কমিশনারের বারবার নথিভুক্ত আপত্তি কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

নির্বাচন কমিশনের কার্যপ্রণালী নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক বর্তমানে SIR, অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগব্যবস্থা—এই তিনটি বিষয়কে ঘিরে রয়েছে।

একদিকে BJP কংগ্রেসের পূর্ববর্তী শাসনকাল এবং প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের উল্লেখ করছে। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলি বর্তমান কমিশনের ভিতরে নথিভুক্ত আপত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। নির্বাচন কমিশন তার অবস্থান অনুযায়ী চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগুলি সর্বসম্মতভাবে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে।

নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং তার কাজকর্মের সঙ্গে নির্বাচন প্রক্রিয়া ও ভোটার তালিকা-সংক্রান্ত বিষয় সরাসরি যুক্ত। বর্তমান বিতর্কে SIR নিয়ে প্রকাশিত অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য এবং আদালতে চলমান কার্যক্রম পৃথকভাবে সামনে রয়েছে।

Leave a comment