টাটা পরিবারের সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব সিমন টাটা (Simone Tata) শুক্রবার ৯৫ বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছেন। তিনি মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে বয়স-সংক্রান্ত স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছিলেন।
মুম্বাই: ভারতের কসমেটিক্স এবং রিটেইল ইন্ডাস্ট্রির সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব সিমন টাটা (Simone Tata) ৯৫ বছর বয়সে মুম্বাইয়ে প্রয়াত হয়েছেন। তিনি দীর্ঘকাল ধরে বয়স-সংক্রান্ত স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছিলেন এবং অবশেষে ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে তাঁর জীবনাবসান হয়। সিমন টাটা ভারতীয় কসমেটিক ব্র্যান্ড ল্যাকমে (Lakme)-কে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিলেন এবং ট্রেন্ট (Trent)-এর ওয়েস্টসাইড (Westside) রিটেইল চেইনের মাধ্যমে আধুনিক ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।
সিমন টাটা এবং টাটা পরিবারের সম্পর্ক
সিমন টাটা, টাটা ট্রাস্টস-এর চেয়ারম্যান নোয়েল টাটার মা এবং টাটা গ্রুপের প্রাক্তন চেয়ারম্যান রতন টাটার সৎ মা ছিলেন। তিনি ট্রেন্ট-এর চেয়ারপার্সন এমেরিটার্স হিসাবে বহু বছর ধরে কোম্পানি ও ব্র্যান্ডের পরিচালনায় দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তাঁর অবদানে টাটা গ্রুপের রিটেইল এবং কসমেটিক্স ব্যবসা নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছিল।
সিমন টাটা ১৯৩০ সালে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মগত নাম ছিল সিমন ডুনোয়ার। তিনি একটি ধনী ফরাসি-সুইস পরিবারে বেড়ে ওঠেন। ১৯৫০-এর দশকের শুরুতে তিনি প্রথম ভারতে আসেন এবং এয়ার ইন্ডিয়ায় একটি ছোট কাজের সময় নবল টাটার সাথে তাঁর পরিচয় হয়। ১৯৫৫ সালে তাঁরা দুজনে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

ল্যাকমে-এর মাধ্যমে নারীর চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন
১৯৬২ সালে সিমন টাটা ল্যাকমে-এর বোর্ডে যোগ দেন। সেই সময় ল্যাকমে টাটা অয়েল মিলস-এর একটি ছোট কসমেটিক ইউনিট ছিল। ভারতে তখন মধ্যবিত্ত মহিলারা মেকআপ ব্যবহার করতে দ্বিধা বোধ করতেন। সিমন এই বিশ্বাস ছড়িয়ে দেন যে সৌন্দর্য প্রতিটি ভারতীয় মহিলার অধিকার, কেবল বিলাসিতা নয়। পরবর্তী দুই দশকে তিনি ল্যাকমে-কে শুধু একটি কসমেটিক ব্র্যান্ড নয়, বরং মহিলাদের আত্মবিশ্বাস ও আধুনিকতার প্রতীক করে তুলেছিলেন।
১৯৭০ এবং ১৯৮০-এর দশকে তাঁর কৌশলের অধীনে ল্যাকমে গ্ল্যামারের পাশাপাশি ভারতীয় মহিলাদের প্রয়োজন এবং বাজেট অনুযায়ী পণ্য চালু করে। ফলস্বরূপ, ল্যাকমে ভারতের শীর্ষস্থানীয় কসমেটিক কোম্পানি হয়ে ওঠে।
ব্র্যান্ডের বিক্রয় এবং নতুন রিটেইল উদ্যোগ
১৯৯০-এর দশকে ভারতের অর্থনৈতিক উদারীকরণের সময় সিমন টাটা ল্যাকমে-কে হিন্দুস্তান ইউনিলিভারের কাছে ৪৫ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি করে দেন। এই পদক্ষেপ থেকে প্রাপ্ত মূলধন তিনি নতুন রিটেইল উদ্যোগ ট্রেন্ট শুরু করতে ব্যবহার করেন। আজ ট্রেন্ট ওয়েস্টসাইড এবং জুডিও চেইনের মাধ্যমে আধুনিক ফ্যাশন রিটেইলের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে।
ল্যাকমে টাটা-এর একটি উদ্যোগ ছিল, যা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর অনুরোধে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তিনি দেখেছিলেন যে ভারতীয় মহিলারা বেশিরভাগই আমদানিকৃত কসমেটিক্স ব্যবহার করতেন, যার ফলে বিদেশী মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছিল। ব্র্যান্ডের নামটি ফরাসি অপেরা ‘ল্যাকমে’ থেকে নেওয়া হয়েছে, যার সম্পর্ক লক্ষ্মীর সাথে। সিমন টাটা বিপণনের নতুন মাত্রা নিয়ে এসেছিলেন এবং মহিলাদের মধ্যে মেকআপ নিয়ে সামাজিক দ্বিধা ভেঙেছিলেন।
সিমন টাটা স্যার রতন টাটা ইনস্টিটিউট এবং অন্যান্য দাতব্য সংস্থার কাজেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর অবদান কেবল ব্যবসার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তিনি ভারতীয় সমাজে মহিলাদের আত্মবিশ্বাস এবং আধুনিকতাকে উৎসাহিত করেছেন।











