সংগ্রাম যত কঠিন, সাফল্যের গল্পও যেন ততটাই অনুপ্রেরণাদায়ক। রাজস্থানের হিরাবতী গ্রামের সুশীলা প্রজাপতের জীবন তারই উদাহরণ। শ্রমিক পরিবারের মেয়ে হয়েও দৌড়ের প্রতি ভালোবাসাকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে গিয়েছেন তিনি। সম্প্রতি রাজস্থান স্টেট অনূর্ধ্ব-২৩ অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে ১০,০০০ মিটার দৌড়ে সোনা জিতে নিজের পদকের সংখ্যা আরও বাড়িয়েছেন। এখন তাঁর চোখ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার দিকে।
গ্রামের দৌড় থেকেই স্বপ্নের শুরু
ছোটবেলায় গ্রামের বন্ধুদের সঙ্গে দৌড়ানোর মধ্য দিয়েই সুশীলার অ্যাথলেটিক্সের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। সেই সাধারণ শখই ধীরে ধীরে পরিণত হয় লক্ষ্যে। ২০২২ সালে চুরুতে অনুষ্ঠিত জুনিয়র রাজ্যস্তরের প্রতিযোগিতায় প্রথম বড় সাফল্য পান তিনি। ৩ কিলোমিটার দৌড়ে জেতেন স্বর্ণপদক, আর ১৫০০ মিটার ইভেন্টে পান ব্রোঞ্জ।এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ক্রস-কান্ট্রি থেকে শুরু করে অনূর্ধ্ব-২৩ স্তরের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় ধারাবাহিকভাবে নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিতে থাকেন এই তরুণ অ্যাথলিট।
ঝুলিতে ৮টি সোনা, সঙ্গে রুপো-ব্রোঞ্জও
সুশীলার পদকের তালিকাও তাঁর পরিশ্রমের সাক্ষ্য দেয়। এখনও পর্যন্ত তিনি ৮টি স্বর্ণ, ৪টি রৌপ্য এবং ২টি ব্রোঞ্জ পদক জিতেছেন। ২০২৩ সালে আজমির ও বিকানেরের বিভিন্ন প্রতিযোগিতাতেও সাফল্য পেয়েছেন। ঝুনঝুনুতে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-২৩ প্রতিযোগিতায় ১০ কিলোমিটার ও ৫ কিলোমিটার দৌড়ে সোনা জিতে নজর কাড়েন তিনি।সম্প্রতি রাজস্থান স্টেট অনূর্ধ্ব-২৩ অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে ১০,০০০ মিটার ইভেন্টে প্রথম হয়ে আরও একটি স্বর্ণপদক যোগ করেছেন। একই প্রতিযোগিতায় ৫,০০০ মিটার দৌড়ে তাঁর ঝুলিতে এসেছে রৌপ্যপদক।
বাবা শ্রমিক, তবুও থামেনি মেয়ের দৌড়
সুশীলার পথচলা সহজ ছিল না। দিদওয়ানা-কুচামান জেলার হিরাবতী গ্রামের এই অ্যাথলিটের বাবা শ্রমিকের কাজ করেন। সীমিত আর্থিক সামর্থ্যের মধ্যেও সুশীলা নিজের খেলাধুলার স্বপ্নকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন।অভাব তাঁর গতি কমাতে পারেনি। বরং কঠিন পরিস্থিতিই তাঁকে আরও দৃঢ় করেছে। নিজের প্রতিভা, অধ্যবসায় এবং নিয়মিত প্রশিক্ষণের জোরেই রাজ্যস্তরে নিজের পরিচিতি তৈরি করেছেন তিনি।
প্রতিদিন ১৫-১৮ কিলোমিটার অনুশীলন
দূরপাল্লার দৌড়ে সাফল্য পেতে নিয়মিত অনুশীলনকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন সুশীলা। প্রতিদিন প্রায় ১৫ থেকে ১৮ কিলোমিটার দৌড়ের প্রশিক্ষণ নেন তিনি। ভোরেই শুরু হয়ে যায় তাঁর অনুশীলন।তাঁর মতে, শুধু প্রতিভা থাকলেই দূরপাল্লার দৌড়ে সাফল্য পাওয়া যায় না। প্রয়োজন দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, শৃঙ্খলা এবং অনুশীলনের প্রতি অটল থাকা। প্রতিযোগিতার মরশুমেও নিজের ট্রেনিং রুটিন বজায় রাখেন তিনি।
ছয় মাস আগে যোগ দিয়েছেন BSF-এ
খেলাধুলার পাশাপাশি সুশীলা এখন পেশাগত দায়িত্বও সামলাচ্ছেন। প্রায় ছয় মাস আগে তিনি BSF-এ যোগ দিয়েছেন। চাকরির দায়িত্বের সঙ্গে তাল মিলিয়েই অ্যাথলেটিক্সের প্রশিক্ষণ চালিয়ে যাচ্ছেন।জাতীয় স্তরের প্রতিযোগিতায় অংশ নিলেও এখনও সেখানে পদক জিততে পারেননি তিনি। তাই আগামী দিনে জাতীয় মঞ্চে পদক জয় করাই তাঁর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
এবার স্বপ্ন আন্তর্জাতিক মঞ্চে
রাজ্যস্তরে একাধিক পদক জেতার পর এবার আরও বড় লক্ষ্যের দিকে এগোতে চান সুশীলা। জাতীয় স্তরে পদক জিতে দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন তিনি।শ্রমিক পরিবারের সাধারণ মেয়ে থেকে রাজ্যস্তরের সফল দূরপাল্লার দৌড়বিদ হয়ে ওঠার এই যাত্রা প্রমাণ করে—সুযোগ সীমিত হলেও স্বপ্ন দেখার অধিকার সীমিত নয়। কঠোর পরিশ্রম আর আত্মবিশ্বাস থাকলে প্রতিকূলতাকেও পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।
পরিবারের আর্থিক অনটন কখনও তাঁর স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। গ্রামের মাটিতে বন্ধুদের সঙ্গে দৌড়ানোর শখ থেকেই শুরু। আজ সেই সুশীলা প্রজাপত দূরপাল্লার দৌড়ে জিতে নিয়েছেন একের পর এক পদক। ইতিমধ্যেই তাঁর ঝুলিতে রয়েছে ৮টি স্বর্ণপদক। এবার লক্ষ্য জাতীয় সাফল্য পেরিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা।




