মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনার জন্য নির্ধারিত ৬০ দিনের সময়সীমা বাড়াতে অস্বীকার করেছেন। সোমবার এই সময়সীমা শেষ হয়েছে। পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কোনো সমঝোতা না হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালী দুই দেশের উত্তেজনার নতুন কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, ইরান সমঝোতা করতে চায়, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যে ধরনের চুক্তিকে প্রয়োজনীয় মনে করে, তাতে যেতে চায় না। তাঁর এই বক্তব্য এমন সময় এসেছে, যখন দুই দেশের মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে মতপার্থক্য অব্যাহত রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা বা গুরুতরভাবে সীমিত করা। অন্যদিকে, তেহরান ধারাবাহিকভাবে বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্য ও শক্তি উৎপাদনের জন্য। দুই দেশের মধ্যে কোনো ব্যাপক ও স্থায়ী সমঝোতার পথে এটিই সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
সমঝোতা স্মারক বা MOU-তে আলোচনার সময়সীমা বাড়ানোর সুযোগ ছিল। তবে কয়েক সপ্তাহ ধরে আলোচনা চললেও কোনো সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি হয়নি এবং দুই পক্ষের মতপার্থক্য দূর করা সম্ভব হয়নি।
ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে সাক্ষাতের সময় ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে সমঝোতার প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। তবে নির্ধারিত ৬০ দিনের সময়সীমা শেষ হওয়া পর্যন্ত এমন কোনো সমঝোতা হয়নি, যা দীর্ঘদিনের পারমাণবিক বিরোধের অবসানের দিকে নির্ণায়ক অগ্রগতি নির্দেশ করে।
ইরানও ৬০ দিনের সময়সীমাকে আলোচনার প্রকৃত শেষ তারিখ হিসেবে মানতে অস্বীকার করেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, দুই দেশের মধ্যে এমন কোনো আলোচনা শুরুই হয়নি, যাকে ৬০ দিনের আনুষ্ঠানিক সময়সীমার সঙ্গে যুক্ত করা যায়।
বাঘাইয়ের মতে, যুক্তরাষ্ট্র শুরু থেকেই সমঝোতার আওতায় নিজেদের দায়িত্ব পালন করেনি। এ কারণে তেহরান এই সময়সীমাকে প্রকৃত আলোচনার সময়সীমা হিসেবে বিবেচনা করে না। ইরানের অবস্থান হলো, যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত নতুন কোনো সমঝোতার দিকে এগোনো কঠিন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও ইঙ্গিত দিয়েছে, শুধু সময়সীমা বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না। সম্ভাব্য যেকোনো আলোচনায় ইরানের সার্বভৌমত্ব, শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কার্যক্রম এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় রাখতে হবে বলে তেহরান মনে করে।
বর্তমানে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক হামলার পরিবর্তে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের জোর রয়েছে। জুলাইয়ের শেষের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর কোনো নতুন হামলা চালায়নি। এর পরিবর্তে ট্রাম্প প্রশাসন তেহরানের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে প্রভাবিত করতে পারে এমন নতুন পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন অর্থনৈতিক পদক্ষেপ ঘোষণা করা হতে পারে। তাঁর মতে, প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলো এখন পর্যন্ত কোনো দেশের বিরুদ্ধে নেওয়া সবচেয়ে কঠোর অর্থনৈতিক চাপের ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে থাকতে পারে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে ইরানের তেল ব্যবসা, আর্থিক লেনদেন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে। অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে ইরানকে আবার আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে মার্কিন শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করাই যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলের লক্ষ্য।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিরোধ শুধু পারমাণবিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ নেই। হরমুজ প্রণালীও দুই দেশের মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এই সমুদ্রপথ পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বের তেল ও গ্যাস বাণিজ্যের একটি বড় অংশ এই সমুদ্রপথ দিয়ে যায়। ফলে হরমুজ প্রণালীতে যেকোনো ধরনের বাধার প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ওপর নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতির ওপরও পড়তে পারে।

সোমবার ট্রাম্প দাবি করেন, হরমুজ প্রণালীতে অবরোধের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। তিনি এটিকে মার্কিন ভূখণ্ড ঘোষণার সম্ভাবনার ধারণাকেও সমর্থন করেন। এই বক্তব্য আঞ্চলিক উত্তেজনা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের মতে, জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে মার্কিন অবরোধের সময় ৬৪টি বাণিজ্যিক জাহাজের পথ পরিবর্তন করা হয়েছে। সামুদ্রিক নজরদারি সংস্থাগুলোর মতে, এই সময় হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের সংখ্যাতেও উল্লেখযোগ্য হ্রাস দেখা গেছে।
এই পরিস্থিতি দীর্ঘদিন চলতে থাকলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ, সামুদ্রিক বিমা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যয়ের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হওয়ায় এখানে যেকোনো সামরিক বা রাজনৈতিক অচলাবস্থা বৈশ্বিক বাজারের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
হরমুজ প্রণালী নিয়ে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ওমানকেও সতর্ক করেছেন। ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ওমান এই ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালে তার বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
ওমান ইরানের সঙ্গে মিলে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া এবং এর নিয়ন্ত্রণ দুই দেশের কাছে রাখার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। এর আগে ওমান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংলাপ প্রতিষ্ঠায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে মাসকাটের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনার প্রভাব পশ্চিম এশিয়ার বাইরেও পড়তে পারে। ইরানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা এবং হরমুজ প্রণালীতে সামুদ্রিক চলাচলের ওপর চাপ বাড়লে অপরিশোধিত তেলের দামে ওঠানামা বাড়তে পারে।
জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য এই পরিস্থিতি উদ্বেগের কারণ হতে পারে। তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হলে পরিবহন ব্যয় থেকে শিল্প উৎপাদন পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব পড়তে পারে। এর ফলে ইতিমধ্যেই চাপের মধ্যে থাকা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।
৬০ দিনের আলোচনার সময়সীমা শেষ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সমাধানের পথ আগের তুলনায় আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। ট্রাম্প প্রশাসন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করার প্রস্তুতি নিচ্ছে, অন্যদিকে ইরান মার্কিন শর্ত অনুযায়ী তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিতে পরিবর্তন করতে প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে না।
আগামী দিনগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হবে, মার্কিন অর্থনৈতিক চাপ ইরানকে নতুন করে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত করতে পারে কি না। অন্যদিকে, তেহরান তাদের বর্তমান অবস্থানে অটল থাকলে এবং হরমুজ প্রণালী নিয়ে উত্তেজনা বাড়লে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাতের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তবে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে গভীর মতপার্থক্য এবং পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি যেকোনো সম্ভাব্য সমঝোতাকে কঠিন করে তুলেছে। আগামী সপ্তাহগুলো পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।












