সুইজারল্যান্ডের ট্রিফট হিমবাহ থেকে ১৯৯২ সালে নিখোঁজ হওয়া দুই বেলজিয়ান পর্বতারোহীর দেহ ৩৪ বছর পর উদ্ধার করা হয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষায় তাদের পরিচয় নিশ্চিত হয়েছে। কর্মকর্তাদের মতে, হিমবাহ গলে যাওয়ার ফলে কয়েক দশক পুরনো দেহাবশেষ সামনে এসেছে।
সুইস কর্মকর্তাদের মতে, ২৬ জুলাই লুসার্ন শহরের দক্ষিণে অবস্থিত ট্রিফট হিমবাহে এক পথচারী মানবদেহের অবশেষ দেখতে পান। খবর পেয়ে কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেহাবশেষ উদ্ধার করেন। প্রাথমিক তদন্তের পর সেগুলো সায়ন শহরের একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে পরিচয় শনাক্তকরণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।
ডিএনএ বিশ্লেষণে নিশ্চিত হয় যে উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষ ১৯৯২ সালে ভেইসমিস পর্বতের আশপাশে নিখোঁজ হওয়া দুই বেলজিয়ান পর্বতারোহীর। কর্মকর্তাদের মতে, নিখোঁজ হওয়ার সময় তাদের বয়স ছিল যথাক্রমে ৩৯ ও ৪১ বছর। এত দীর্ঘ সময় ধরে তাদের সম্পর্কে কোনো নিশ্চিত সন্ধান পাওয়া যায়নি।
সুইস পুলিশের মতে, ট্রিফট হিমবাহ থেকেই দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। এলাকাটি সুইজারল্যান্ডের পার্বত্য অঞ্চলে অবস্থিত এবং এর আশপাশে একাধিক উঁচু শৃঙ্গ রয়েছে। দেহাবশেষ পাওয়ার পর কর্মকর্তারা বিশেষ উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেন।
পুলিশ দেহাবশেষ নিরাপদে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। এরপর উপলব্ধ নথি ও ডিএনএ নমুনার সাহায্যে পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। কর্মকর্তারা জানান, ওই দুই ব্যক্তি ১৯৯২ সালে ভেইসমিস পর্বতের কাছে নিখোঁজ হয়েছিলেন।
ভেইসমিসের উচ্চতা ৪,০০০ মিটারের বেশি এবং এলাকাটি পর্বতারোহীদের মধ্যে জনপ্রিয়। এখানে আবহাওয়া দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে এবং উচ্চতা, তুষার ও দুর্গম ভূখণ্ডের কারণে পর্বতারোহণ ঝুঁকিপূর্ণ।
সুইজারল্যান্ডের ভালিস অঞ্চলের কর্মকর্তাদের কাছে নিখোঁজ ব্যক্তিদের একটি রেকর্ড রয়েছে, যেখানে ১৯২৫ সাল পর্যন্ত মামলাগুলো নথিভুক্ত আছে। পুলিশের মতে, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ পাহাড়, নদী বা অন্যান্য জলভাগে নিখোঁজ হয়েছেন।
পার্বত্য অঞ্চলে খারাপ আবহাওয়া, তুষারপাত, তুষারধস ও দুর্গম ভূখণ্ডের কারণে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান করা অত্যন্ত কঠিন হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে বড় আকারের অনুসন্ধান অভিযান চালানোর পরও দেহাবশেষের সন্ধান মেলে না।
হিমবাহের ভেতরে চাপা পড়া দেহ বহু বছর সম্পূর্ণভাবে আড়ালে থাকতে পারে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বরফ সরে যাওয়ার সঙ্গে এসব দেহাবশেষ আবার সামনে আসতে পারে। এ কারণে জলবায়ু পরিবর্তন ও হিমবাহ গলে যাওয়ার মধ্যেও পুরনো নিখোঁজ ব্যক্তিদের ঘটনায় নতুন সূত্র পাওয়ার ঘটনা সামনে আসছে।
সুইস কর্মকর্তারা জানান, হিমবাহ গলে যাওয়ার কারণে কয়েক দশক পুরনো মানবদেহাবশেষ সামনে আসার ঘটনা এই প্রথম নয়। ২০২৩ সালে সুইজারল্যান্ডের বিখ্যাত ম্যাটারহর্ন পর্বতের কাছে একটি হিমবাহ থেকে মানবদেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছিল।
পরে ডিএনএ পরীক্ষায় নিশ্চিত হয় যে সেগুলো ১৯৮৬ সাল থেকে নিখোঁজ থাকা এক জার্মান পর্বতারোহীর দেহাবশেষ। এভাবে হিমবাহের পশ্চাদপসরণ পুরনো পর্বতারোহণ দুর্ঘটনা ও নিখোঁজের ঘটনাগুলোকেও আবার সামনে নিয়ে আসছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমবাহে আটকে থাকা মানবদেহাবশেষ শনাক্ত করা অনেক সময় কঠিন হয়। অতিরিক্ত ঠান্ডা এবং দীর্ঘ সময় বরফের নিচে চাপা থাকার কারণে দেহের অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন হতে পারে। এ ধরনের ক্ষেত্রে ডিএনএ পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দুই পর্বতারোহীর দেহাবশেষ উদ্ধারের ঘটনা এমন সময় সামনে এসেছে, যখন সুইজারল্যান্ডের হিমবাহগুলো দ্রুত সঙ্কুচিত হচ্ছে। বিজ্ঞানীদের মতে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তন হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়ার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে।

সুইস হিমবাহ পর্যবেক্ষণ সংস্থা গ্লেসিয়ার মনিটরিং ইন সুইজারল্যান্ডের (GLAMOS) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল পর্যন্ত এক দশকে দেশটির হিমবাহগুলো তাদের মোট আয়তনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ হারিয়েছে। ২০২৫ সালেও হিমবাহের পরিমাণে প্রায় ৩ শতাংশ হ্রাস রেকর্ড করা হয়।
২০২২ ও ২০২৩ সালে রেকর্ড তুষারহানি হওয়ার পরও এই হ্রাস অব্যাহত রয়েছে। এর মাধ্যমে সুইজারল্যান্ডের পার্বত্য অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অব্যাহত থাকার বিষয়টি সামনে এসেছে।
বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব উচ্চ পার্বত্য এলাকাতেও দেখা যাচ্ছে। সুইজারল্যান্ডের উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে অস্বাভাবিক উষ্ণ আবহাওয়া ও তুষারপাত কমে যাওয়ায় হিমবাহগুলোর ওপর চাপ বেড়েছে।
হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়ায় শুধু পরিবেশই প্রভাবিত হচ্ছে না, পার্বত্য পর্যটন ও স্কি রিসোর্টও প্রভাবিত হচ্ছে। তুষারের ঘাটতির কারণে অনেক স্কি এলাকায় কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ বাড়ছে।
ইউরোপীয় কমিশনের পর্যবেক্ষণ সংস্থা কোপার্নিকাসের মতে, বিশ্বজুড়ে হিমবাহ সঙ্কুচিত হওয়ার গতি ১৯৯০-এর দশক থেকে বেড়েছে এবং ২০০০ সালের পর তা আরও দ্রুত হয়েছে।
১৯৯২ সালে নিখোঁজ হওয়া দুই বেলজিয়ান নাগরিকের পরিবারের কাছে এই অনুসন্ধান একটি উত্তর নিয়ে এসেছে। কোনো ব্যক্তি কয়েক দশক ধরে নিখোঁজ থাকলে পরিবারগুলোর মধ্যে অনিশ্চয়তা বজায় থাকে। দেহাবশেষ উদ্ধার ও পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার ফলে অন্তত স্পষ্ট হয়েছে যে ওই দুই পর্বতারোহীর কী পরিণতি হয়েছিল।
তবে উপলব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে তাদের নিখোঁজ হওয়ার সঠিক পরিস্থিতি জানা যায়নি। দুর্ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছিল এবং দুই পর্বতারোহী হিমবাহের ঠিক কোন অংশে আটকে পড়েছিলেন, সেটিও স্পষ্ট নয়।
পুলিশ ও স্থানীয় কর্মকর্তারা ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত নথি পর্যালোচনা করছেন। ঘটনাটি আরও দেখিয়েছে যে পরিবর্তিত জলবায়ুর কারণে পুরনো নিখোঁজের ঘটনাগুলোর সূত্র সামনে আসার পাশাপাশি পার্বত্য অঞ্চলে পরিবেশগত পরিবর্তনের প্রভাবও দৃশ্যমান হচ্ছে।










