আমেরিকায় টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস (TCS), ইনফোসিস, উইপ্রো এবং HCL-সহ আটটি আইটি সংস্থার গ্রিন কার্ড স্পনসরশিপ প্রক্রিয়া বন্ধ করার দাবি করা হয়েছে। তবে এই পদক্ষেপের আনুষ্ঠানিক সত্যতা, নির্দেশের প্রকৃত শর্ত এবং এর আওতায় থাকা আবেদনগুলির পরিধি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন আটটি বড় আইটি সংস্থার গ্রিন কার্ড-সংক্রান্ত প্রক্রিয়ায় বিধিনিষেধ আরোপ করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। তালিকায় TCS, ইনফোসিস, উইপ্রো, HCL, মাইক্রোসফট, অ্যাডোবি, কগনিজ্যান্ট এবং ক্যাপজেমিনির নাম রয়েছে। দাবি অনুযায়ী, এই সংস্থাগুলির কর্মীদের জন্য পার্মানেন্ট লেবার সার্টিফিকেশন (PERM) প্রক্রিয়া প্রভাবিত হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে কি না, তার আইনি ভিত্তি কী এবং কোন কোন আবেদন এর আওতায় পড়ছে, তা এখনও স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রশাসন আটটি আইটি সংস্থার নতুন PERM আবেদন গ্রহণ এবং আগে থেকে জমা পড়া আবেদনগুলির প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা দিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
PERM হল Program Electronic Review Management-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। এটি মার্কিন শ্রম দফতরের অধীনে পরিচালিত কর্মসংস্থানভিত্তিক শ্রম শংসাপত্র প্রক্রিয়া। কর্মসংস্থানভিত্তিক গ্রিন কার্ডের নির্দিষ্ট কয়েকটি শ্রেণিতে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়।
এই প্রক্রিয়ায় নিয়োগকর্তাকে মার্কিন শ্রম দফতরের কাছে প্রমাণ করতে হয় যে সংশ্লিষ্ট পদের জন্য নির্ধারিত নিয়োগের শর্ত পূরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি, বিদেশি কর্মী নিয়োগের ফলে একই ধরনের পরিস্থিতিতে কর্মরত মার্কিন কর্মীদের বেতন ও কাজের পরিবেশের উপর বিরূপ প্রভাব পড়বে না, সেটিও নিশ্চিত করতে হয়।
শুধু সংস্থাগুলির নাম প্রকাশ্যে আসার ভিত্তিতে কোনও পদক্ষেপের আইনি অবস্থান নির্ধারণ করা যায় না। সংশ্লিষ্ট সরকারি নির্দেশ, তার ভিত্তি এবং প্রযোজ্য আবেদনের পরিধি যাচাই করা জরুরি।
সাধারণত নিয়োগকর্তাকে প্রথমে সংশ্লিষ্ট পদের জন্য নিয়োগসংক্রান্ত নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে হয়। এরপর মার্কিন শ্রম দফতরের কাছে PERM আবেদন জমা দেওয়া হয়। শ্রম শংসাপত্র পাওয়ার পর নিয়োগকর্তা যোগ্যতা অনুযায়ী মার্কিন নাগরিকত্ব ও অভিবাসন পরিষেবা (USCIS)-এর কাছে ইমিগ্র্যান্ট ওয়ার্কার পিটিশন জমা দিতে পারেন।
এর পরবর্তী প্রক্রিয়া নির্ভর করে আবেদনকারীর শ্রেণি, অগ্রাধিকার তারিখ এবং ভিসার প্রাপ্যতার উপর।
তাই PERM-কে সরাসরি গ্রিন কার্ড হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। এটি নির্দিষ্ট কিছু কর্মসংস্থানভিত্তিক আবেদনের ক্ষেত্রে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়ার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এই পর্যায়ে বিলম্ব হলে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের পরবর্তী অভিবাসন প্রক্রিয়াও প্রভাবিত হতে পারে।
কোনও সংস্থার PERM আবেদনের উপর সত্যিই বিধিনিষেধ কার্যকর হলে, যেসব কর্মীর স্থায়ী বসবাসের প্রক্রিয়া এখনও শুরু হয়নি অথবা যাঁরা শ্রম শংসাপত্রের জন্য নিয়োগকর্তার আবেদন জমা দেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে নতুন আবেদন জমা দিতে দেরি হতে পারে।
যাঁদের আবেদন ইতিমধ্যেই প্রক্রিয়াধীন, তাঁদের উপর প্রভাব নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট সরকারি নির্দেশ এবং আবেদনের বর্তমান অবস্থার উপর। আনুষ্ঠানিক নির্দেশ যাচাই না করে সমস্ত পুরনো আবেদন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছে বলে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
TCS, ইনফোসিস, উইপ্রো এবং HCL-এর মতো সংস্থায় কর্মরত ভারতীয় পেশাদারদের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ স্থায়ী বসবাসের অনুমতি তাঁদের দীর্ঘমেয়াদি অভিবাসন পরিকল্পনা, পরিবারের ভবিষ্যৎ এবং কর্মসংস্থান-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত।
H-1B ভিসা এবং গ্রিন কার্ড দুটি পৃথক অভিবাসন ব্যবস্থা। H-1B হল একটি অ-অভিবাসী ভিসা শ্রেণি, যার আওতায় যোগ্য বিদেশি পেশাদাররা নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করতে পারেন। অন্যদিকে, গ্রিন কার্ড স্থায়ী বসবাসের মর্যাদা প্রদান করে।
সুতরাং, PERM প্রক্রিয়ায় সম্ভাব্য বাধার অর্থ এই নয় যে সংশ্লিষ্ট সমস্ত কর্মীর H-1B ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে অথবা তাঁদের অবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তে হবে।
কোনও কর্মীর যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস ও কাজ করার যোগ্যতা নির্ভর করে তাঁর ভিসার বৈধতা, নিয়োগকর্তা, অভিবাসন বিধি এবং ব্যক্তিগত পরিস্থিতির উপর। H-1B মর্যাদা বৈধ থাকলে শুধু গ্রিন কার্ড স্পনসরশিপে বিলম্বের কারণে সেই মর্যাদা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয় না। তবে ভিসা বা অনুমোদিত থাকার মেয়াদ শেষ হওয়া, চাকরি পরিবর্তন কিংবা অন্যান্য পরিস্থিতিতে পৃথক নিয়ম প্রযোজ্য হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থানভিত্তিক গ্রিন কার্ডের প্রাপ্যতা বিভিন্ন শ্রেণি এবং জাতীয়তার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। ভারতীয় আবেদনকারীদের বিশেষত EB-2 এবং EB-3 শ্রেণিতে দীর্ঘ অপেক্ষার মুখে পড়তে হতে পারে। এর প্রধান কারণ সীমিত সংখ্যক ভিসা এবং ভারতীয় আবেদনকারীদের বিপুল অপেক্ষমাণ তালিকা।
কোনও আবেদনকারী কবে গ্রিন কার্ড পাবেন, তা নির্ভর করে তাঁর অগ্রাধিকার তারিখ, কর্মসংস্থানভিত্তিক শ্রেণি এবং সংশ্লিষ্ট মাসের সরকারি ভিসা বুলেটিনের উপর। তাই সমস্ত ভারতীয় আবেদনকারীর জন্য ১২ থেকে ১৫ বছরের একই অপেক্ষার সময়সীমা প্রযোজ্য বলে উল্লেখ করা সঠিক হবে না।
একইভাবে, কোনও অর্থবর্ষ বা সরকারি বছরে ভিসার প্রাপ্যতা সীমিত হওয়ার অর্থ এই নয় যে সব ধরনের নতুন আবেদনের উপর সর্বজনীন নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। শ্রম শংসাপত্র, ইমিগ্র্যান্ট পিটিশন এবং গ্রিন কার্ডের চূড়ান্ত অনুমোদন পৃথক ধাপ।
প্রদত্ত প্রতিবেদনে মার্কিন শ্রমমন্ত্রীর বক্তব্যের সূত্রে দাবি করা হয়েছে, কিছু সংস্থা বিদেশি কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে অভিবাসন বিধির অনুপযুক্ত ব্যবহার করছে। এর ফলে মার্কিন কর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং বেতনের উপর কী প্রভাব পড়ছে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের তরফে মাইক্রোসফটকে ঘিরে করা অভিযোগের কথাও প্রতিবেদনে রয়েছে। দাবি করা হয়েছে, সংস্থাটি মার্কিন কর্মীদের ছাঁটাইয়ের সময় বিদেশি কর্মীদের জন্য H-1B ভিসা এবং গ্রিন কার্ডের ব্যবস্থা ব্যবহার করেছে।
তবে কোনও সংস্থার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। এই দাবিগুলি যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি, সংস্থার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এবং উপলব্ধ কর্মসংস্থান-সংক্রান্ত পরিসংখ্যান পরীক্ষা করা প্রয়োজন। সংস্থাগুলির বক্তব্য পাওয়া গেলে তা-ও প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
সংশ্লিষ্ট কর্মীদের প্রথমে নিজেদের সংস্থার মানবসম্পদ বিভাগ এবং অভিবাসন দলের কাছ থেকে আবেদনের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। তাঁদের বুঝতে হবে, তাঁদের আবেদন PERM, I-140 নাকি গ্রিন কার্ডের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
পাশাপাশি, মার্কিন শ্রম দফতর, USCIS এবং সরকারি ভিসা বুলেটিনে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তির উপর নজর রাখা প্রয়োজন। যাচাই না করা খবরের ভিত্তিতে চাকরি ছেড়ে দেওয়া, সংস্থা পরিবর্তন করা অথবা যুক্তরাষ্ট্রে থাকা বন্ধ করার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
বর্তমানে উপলব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে আটটি সংস্থার উপর কথিত বিধিনিষেধের আনুষ্ঠানিক অবস্থান এবং তার প্রকৃত প্রভাব যাচাই করা প্রয়োজন। পদক্ষেপটি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়ে থাকলে তার প্রভাব নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট কর্মসংস্থানভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের আবেদনগুলির অবস্থার উপর। H-1B ভিসাধারী-সহ সমস্ত ভারতীয় কর্মীর পরিস্থিতি এক নয়।











