সাম্প্রতিক শান্তি সমঝোতার প্রচেষ্টার মধ্যেই একটি নতুন মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সিএনএনের প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন অনুযায়ী সাম্প্রতিক সংঘাত বা যুদ্ধের পর ইরান আগের তুলনায় আরও শক্তিশালী কৌশলগত অবস্থানে পৌঁছেছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, প্রয়োজন হলে ইরান এখন হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) ব্যাহত করার সক্ষমতা অর্জন করেছে, যা বিশ্বের তেল সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে বিবেচিত হয়।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, ইরানের সামরিক ও অপ্রচলিত সক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান এখন শুধু সরাসরি সামরিক সংঘাতেই নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতে সক্ষম কৌশলও ব্যবহার করতে পারে। সূত্রগুলোর দাবি, এই সক্ষমতা ইরানকে এমন একটি অবস্থানে নিয়ে গেছে, যেখান থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব ফেলা সম্ভব। কিছু মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, ইরানের কাছে এমন একটি কার্যকর “কৌশলগত অস্ত্র” রয়েছে, যার প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত অস্ত্রের চেয়েও বেশি হতে পারে।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ, যার মাধ্যমে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের বড় অংশ পরিবাহিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যদি এই পথ ব্যাহত করে, তবে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে আন্তর্জাতিক তেলের দাম ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে।
মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীদের সহযোগিতায় ইরান বাব-আল-মান্দেব প্রণালীতেও উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে বিশ্বের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ একযোগে প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্য সংকটকে আরও গভীর করতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক উত্তেজনা সত্ত্বেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে সামুদ্রিক রুটে আংশিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা চলছে। এর প্রভাব ভারতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সামুদ্রিক বাণিজ্যেও দেখা গেছে।
তথ্য অনুযায়ী, পারস্য উপসাগরে বর্তমানে প্রায় ৩৪টি জাহাজ আটকে রয়েছে, যার মধ্যে বেশ কয়েকটি ভারতীয় স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত। এসবের মধ্যে ইউরিয়া, ডিএপি, সালফার ও অ্যামোনিয়া বহনকারী সারবাহী জাহাজও রয়েছে। তবে একটি ভারতীয় এলএনজি ট্যাঙ্কার নিরাপদে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছে, যা এলাকায় সীমিত স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মার্কিন সেনাবাহিনী দাবি করেছে, ইরানের রেভলিউশনারি গার্ড (IRGC) হরমুজ অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর দিকে ড্রোন পাঠিয়েছিল। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, সম্ভাব্য ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আগেই এসব ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে। তাদের মতে, এই ঘটনা সামুদ্রিক নিরাপত্তার জন্য একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দেয় এবং অঞ্চলে সক্রিয় সামরিক উত্তেজনার উপস্থিতি তুলে ধরে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রাথমিক শান্তি সমঝোতা (MoU) নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ ইরানের প্রতিশ্রুতি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
অন্যদিকে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর মত, ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে প্রত্যাশিত পদক্ষেপ নাও নিতে পারে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও এই সমঝোতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তবে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সমঝোতাকে এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাদের যুক্তি, আলোচনাই স্থায়ী সমাধানের পথ।
সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সমঝোতার পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেছেন, কোনো পরিস্থিতিতেই ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সরাসরি অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে না। তার দাবি, এই সমঝোতা কোনো আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি নয়; বরং কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও শর্তের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে।
ট্রাম্প আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, আগামী দিনগুলোতে সমঝোতার পূর্ণ নথি প্রকাশ করা হবে, যাতে এর বিষয়বস্তু জনসমক্ষে আসে।
এই পরিস্থিতির মধ্যে বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠন ও নেতার প্রতিক্রিয়াও সামনে এসেছে। হিজবুল্লাহ নেতৃত্ব ইরানকে “ন্যায়পরায়ণ দেশ” হিসেবে উল্লেখ করে তার সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে।
একই সময়ে, চলমান সংঘাতকে কেন্দ্র করে লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যকার উত্তেজনাও আলোচনায় রয়েছে। কিছু নেতা যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং এর ফলে বেসামরিক জনগণের ওপর প্রভাবের বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
চীনও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছে। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, আলোচনার পরবর্তী ধাপ আরও কঠিন হতে পারে এবং স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে ধারাবাহিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
তার মন্তব্যে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, বিষয়টি কেবল দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এতে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর ভূমিকা ক্রমশ বাড়ছে।








