USCIRF-এর RSS নিষেধাজ্ঞার সুপারিশ মোহন ভাগবতের বিদেশ সফরের আগে

মার্কিন ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশন USCIRF RSS নেতাদের কূটনৈতিক মর্যাদা না দেওয়া এবং উচ্চপর্যায়ের সরকারি বৈঠক থেকে দূরে থাকার সুপারিশ করেছে। RSS প্রধান মোহন ভাগবতের আমেরিকা, কানাডা ও ব্রিটেন সফরের আগে এই মন্তব্য সামনে এসেছে।

ওয়াশিংটন: মার্কিন ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশন (USCIRF) জাতীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (RSS) নিয়ে মার্কিন সরকারের কাছে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। কমিশনের কর্মকর্তারা RSS নেতাদের কূটনৈতিক মর্যাদা না দেওয়া এবং তাদের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের সরকারি বৈঠক থেকে দূরে থাকার সুপারিশ করেছেন।

USCIRF-এর চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ বলেছেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি RSS-এর সদস্য এবং সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত সহযোগী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। RSS প্রধান মোহন ভাগবতের আসন্ন আমেরিকা সফরের উল্লেখ করে মাহমুদ মার্কিন সরকারকে RSS-এর বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান।

USCIRF কমিশনার জিন মিলসও RSS নেতাদের বিষয়ে মার্কিন প্রশাসনের অবস্থান স্পষ্ট করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, RSS-এর সঙ্গে যুক্ত নেতারা ভারত সরকারের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও তাঁদের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক বা কূটনৈতিক মর্যাদা পাওয়ার স্বয়ংক্রিয় অধিকারী হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।

মিলস বলেন, ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘনের জন্য যেসব RSS সদস্যের দায় নির্ধারিত হয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি মার্কিন সরকারের বিবেচনা করা উচিত। কমিশন তাদের কর্মকর্তাদের বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম X-এও প্রকাশ করেছে।

তবে USCIRF-এর সুপারিশের অর্থ এই নয় যে RSS-এর ওপর আমেরিকায় তাৎক্ষণিক কোনো নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে। কমিশন ধর্মীয় স্বাধীনতা সংক্রান্ত বিষয়ে মার্কিন সরকারকে পরামর্শ ও নীতিগত সুপারিশ দেয়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট মার্কিন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনের আওতায় পড়ে।

RSS প্রধান মোহন ভাগবত ২৫ আগস্ট থেকে আমেরিকা, কানাডা ও ব্রিটেনে সফরে যাবেন। সফরে বিভিন্ন ভারতীয় প্রবাসী সংগঠন ও সম্প্রদায়ের অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ২৯ আগস্ট নিউইয়র্কে আমেরিকান হিন্দুজ ফর এনগেজমেন্ট অ্যান্ড ডায়ালগ (AHEAD) আয়োজিত ‘ইউনিভার্সাল অননেস সেলিব্রেশন্স’ অনুষ্ঠানে ভাগবতের অংশ নেওয়ার তথ্য সামনে এসেছে।

এই সফরের সময় ভারতে ধর্মীয় স্বাধীনতা, সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি এবং RSS-এর ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মন্তব্য নিয়ে আলোচনা চলছে। USCIRF-এর সর্বশেষ মন্তব্যের পর ভাগবতের বিদেশ সফরকে ঘিরে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিতর্কও সামনে এসেছে।

অন্যদিকে, কানাডায় ১০০টির বেশি সংগঠন মোহন ভাগবতের প্রস্তাবিত সফরকে সমর্থন করেছে। সংগঠনগুলো কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এবং সরকারের মন্ত্রীদের চিঠি দিয়ে ভাগবতকে দেশে প্রবেশে বাধা দেওয়ার দাবির বিরোধিতা করেছে।

চিঠিতে সংগঠনগুলো বলেছে, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার আগে বিশ্বাসযোগ্য ও স্বাধীন প্রমাণ বিবেচনা করা উচিত। তারা কানাডা সরকারকে আইন, উপলব্ধ প্রমাণ এবং যথাযথ প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

ভাগবতের সফর নিয়ে কানাডায় বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। কিছু সংগঠন তাঁর প্রবেশ নিয়ে প্রশ্ন তুললেও অন্য সংগঠনগুলো তাঁর সফরের অধিকারকে সমর্থন করছে।

United States Commission on International Religious Freedom বা USCIRF আমেরিকার একটি স্বাধীন ফেডারেল সরকারি প্রতিষ্ঠান। ১৯৯৮ সালের International Religious Freedom Act-এর অধীনে মার্কিন কংগ্রেস এটি প্রতিষ্ঠা করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা এবং ধর্মীয় নিপীড়ন সংক্রান্ত বিষয়ে মার্কিন সরকারকে পরামর্শ দেওয়া এর প্রধান উদ্দেশ্য।

USCIRF বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে এবং প্রতিবেদনের মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও কংগ্রেসকে নীতিগত সুপারিশ দেয়। ধর্মীয় স্বাধীনতার গুরুতর লঙ্ঘনের ভিত্তিতে কোনো কোনো দেশকে Country of Particular Concern বা CPC ঘোষণা করার সুপারিশও কমিশন করতে পারে।

এছাড়া নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক চাপ বা অন্যান্য নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করতে পারে কমিশন। তবে USCIRF-এর সুপারিশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে মার্কিন আইন বা নিষেধাজ্ঞায় পরিণত হয় না।

USCIRF কোনো বেসরকারি বেসরকারি সংস্থা নয়; এটি মার্কিন কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত একটি স্বাধীন সরকারি কমিশন। এর সদস্যরা মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবং কংগ্রেসের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যুক্ত নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্বাচিত হন।

এই কারণে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে কমিশনের প্রতিবেদন ও সুপারিশকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে কোনো দেশ বা সংগঠনের ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা আরোপের নির্বাহী ক্ষমতা USCIRF-এর নেই। কোনো নিষেধাজ্ঞা বা কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে মার্কিন সরকারকে পৃথক আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।

তাই RSS নিয়ে USCIRF-এর সর্বশেষ দাবিকে একটি নীতিগত সুপারিশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত, আমেরিকায় RSS-এর ওপর তাৎক্ষণিক কার্যকর নিষেধাজ্ঞা হিসেবে নয়।

ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে ভারত ও USCIRF-এর মধ্যে এর আগেও প্রকাশ্য মতপার্থক্য দেখা গেছে। মার্চে প্রকাশিত USCIRF-এর বার্ষিক প্রতিবেদনে ভারতে ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিস্থিতি নিয়ে গুরুতর মন্তব্য করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে RSS এবং রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং বা RAW-সহ কিছু প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার সুপারিশের উল্লেখ ছিল।

ভারত সরকার ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে USCIRF-এর বিরুদ্ধে ভারতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ তুলেছিল। ভারতীয় পক্ষের বক্তব্য ছিল, কমিশনের প্রতিবেদন সন্দেহজনক উৎস এবং একতরফা মতাদর্শগত বয়ানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়।

ভারত USCIRF-এর সমালোচনাকে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবেও দেখেছে এবং কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এর আগে USCIRF-এর ভারত সংক্রান্ত মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকায় হিন্দু মন্দিরে ভাঙচুরের ঘটনাগুলোর বিষয়টি তুলেছিল। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল ১৬ মার্চ বলেছিলেন, USCIRF-এর উচিত ভারতের বেছে নেওয়া সমালোচনার পরিবর্তে আমেরিকায় ধর্মীয় স্থানে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর দিকেও নজর দেওয়া।

ভারতের বক্তব্য ছিল, ধর্মীয় স্বাধীনতার মূল্যায়নের সময় সব দেশে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে একই দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা উচিত। নতুন USCIRF সুপারিশের পর দুই পক্ষের পুরনো মতপার্থক্য আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনায় এসেছে।

USCIRF-এর সর্বশেষ সুপারিশের পর এখন মার্কিন প্রশাসনের প্রতিক্রিয়ার দিকে নজর রয়েছে। আপাতত কমিশনের দাবি RSS-এর ওপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করে না। মার্কিন সরকার কোনো সংগঠন বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বিবেচনা করলে সংশ্লিষ্ট আইন ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অধীনে পৃথক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

 

Leave a comment