ভেনেজুয়েলায় ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্পে মৃত ২৩৫, আহত ৪,৩০০-এর বেশি, নিখোঁজ ৩৯ হাজার

ভেনেজুয়েলায় ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্পের পর সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ২৩৫ জনে পৌঁছেছে। ৪,৩০০ জনের বেশি আহত, প্রায় ৩৯,০০০ মানুষ নিখোঁজ এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণ ও উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

ভেনেজুয়েলায় ৭.৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৩৫ জনে পৌঁছেছে। এতে ৪,৩০০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। সরকারের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩৯,০০০ মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে বহু মানুষ আটকে থাকার আশঙ্কা রয়েছে। উদ্ধারকারী সংস্থাগুলোর মতে, একাধিক স্থানে ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে মানুষের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে, ফলে উদ্ধার অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে।

২৫ জুন ১৮২১ সালের ঐতিহাসিক কারাবোবো যুদ্ধের বার্ষিকী উপলক্ষে দেশে জাতীয় ছুটির দিনে এই ভূমিকম্প আঘাত হানে। সে সময় অধিকাংশ মানুষ বাড়িতে অবস্থান করছিলেন এবং ফিফা বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখছিলেন। ফলে বহু মানুষ ভবন ধসে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনগুলোতে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বহু ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে এবং অনেক স্থানে এখনও উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) প্রাথমিক মূল্যায়নে সতর্ক করেছে যে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হতে পারে। সংস্থাটির মতে, ১০,০০০-এর বেশি মানুষের মৃত্যুর সম্ভাবনা প্রায় ৪৪ শতাংশ, আর অত্যন্ত গুরুতর পরিস্থিতিতে মৃতের সংখ্যা এক লাখ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের খুঁজে চলেছেন। হাসপাতালগুলোতে আহতদের চিকিৎসা চলছে এবং বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ী চিকিৎসা শিবির ও ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপন করা হয়েছে।

ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে উত্তর উপকূলীয় রাজ্য লা গুয়াইরায়। কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে ৭০ হাজারের বেশি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাজ্যে ১০০টির বেশি ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। পরে সরকারি তথ্যে জানানো হয়েছে, প্রায় ২৫০টি ভবন হয় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে, নয়তো গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

স্থানীয় প্রশাসনের মতে, বহু বহুতল ভবন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। রাজধানী কারাকাসের নিকটবর্তী এই এলাকায় উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও সুপেয় পানির সরবরাহও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

ভেনেজুয়েলা সরকার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় যুদ্ধকালীন তৎপরতায় ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধারকর্মীর সংখ্যা ৪,২০০ থেকে বাড়িয়ে ১১,৫০০ করা হয়েছে। সেনাবাহিনী, জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা, দমকল বিভাগ এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করছে।

উদ্ধারকারী দল ভারী যন্ত্রপাতি, অনুসন্ধানী কুকুর এবং আধুনিক সরঞ্জামের সাহায্যে ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া মানুষের সন্ধান চালাচ্ছে। যেসব এলাকা থেকে এখনও জীবিত মানুষের উপস্থিতির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, সেসব এলাকাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৪,৩০০ জনের বেশি আহতকে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী এসেছে লা গুয়াইরা ও আশপাশের এলাকা থেকে। অনেক হাসপাতাল ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি রোগীর চিকিৎসা দিচ্ছে। এ কারণে সরকার অস্থায়ী ফিল্ড হাসপাতাল চালু করেছে।

দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকেও চিকিৎসক দল ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পাঠানো হয়েছে। গুরুতর আহতদের জন্য বিশেষ চিকিৎসা ইউনিটের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ ও রক্তের সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে।

সরকারের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে ভেনেজুয়েলার প্রায় ৯.৫ লাখ কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে। বিপুল সংখ্যক আবাসিক ভবন, সড়ক, সেতু, সরকারি ভবন এবং জনপরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রাজধানী কারাকাসের প্রধান বিমানবন্দরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক ত্রাণসামগ্রী পৌঁছাতে সমস্যা হচ্ছে। বহু সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ত্রাণবাহী যানবাহনের চলাচলও ব্যাহত হয়েছে।

ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। সরকার সব সরকারি সংস্থাকে ত্রাণ কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য অস্থায়ী ত্রাণশিবির নির্মাণ করা হচ্ছে এবং খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় সামগ্রীর সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।

ভেনেজুয়েলায় ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্পে মৃত ২৩৫, আহত ৪,৩০০-এর বেশি, নিখোঁজ ৩৯ হাজার

সরকার নাগরিকদের আফটারশকের সম্ভাবনা বিবেচনায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবন থেকে দূরে থাকার এবং শুধুমাত্র সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করার আহ্বান জানিয়েছে।

দুর্যোগের পর একাধিক দেশ সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে কথা বলে সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রও জরুরি মানবিক সহায়তা পাঠানো শুরু করেছে। মার্কিন সাউদার্ন কমান্ডের মাধ্যমে ত্রাণসামগ্রী, চিকিৎসা সহায়তা এবং অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল ভেনেজুয়েলায় পাঠানো হচ্ছে। এছাড়া আহতদের জন্য বিশেষ বিমান এবং অন্যান্য সম্পদ সরবরাহের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।

কানাডা ৩৫ লাখ ডলার মানবিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এই অর্থ খাদ্য, বিশুদ্ধ পানীয় জল, স্বাস্থ্যসেবা, স্যানিটেশন এবং অন্যান্য জরুরি ত্রাণ কার্যক্রমে ব্যবহার করা হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনেজুয়েলা ও তার উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হানা প্রায় ৭.৫ মাত্রার এই ভূমিকম্প গত এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী। এর আগে ১৯০০ সালে সান নার্সিসো অঞ্চলে ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল, যাতে বহু ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বিপুল সংখ্যক মানুষ প্রভাবিত হন।

ভেনেজুয়েলা ক্যারিবীয় প্লেট এবং দক্ষিণ আমেরিকান প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত। এই দুটি টেকটোনিক প্লেটের মধ্যে নিয়মিত ভূতাত্ত্বিক নড়াচড়া হয়। প্লেটগুলোর মধ্যে সঞ্চিত শক্তি হঠাৎ মুক্ত হলে শক্তিশালী ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়।

বিজ্ঞানীদের মতে, এই ভূমিকম্পের পর আরও আফটারশক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এসব কম্পন আগে থেকেই দুর্বল হয়ে পড়া ভবনগুলোর আরও ক্ষতি করতে পারে। তাই ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় মানুষকে সতর্ক থাকার এবং প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

ভেনেজুয়েলার সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া মানুষকে নিরাপদে উদ্ধার করা, ক্ষতিগ্রস্ত লাখো মানুষের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনরুদ্ধার করা। ক্রমবর্ধমান মৃতের সংখ্যা, হাজারো আহতের চিকিৎসা, বিপুল সংখ্যক নিখোঁজ মানুষের অনুসন্ধান এবং সম্ভাব্য আফটারশক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং জোরদার উদ্ধার অভিযান চললেও আগামী দিনগুলো ভেনেজুয়েলার জন্য কঠিন বলে বিবেচিত হচ্ছে। উদ্ধারকারী সংস্থাগুলোর মতে, ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া মানুষকে জীবিত উদ্ধার করার ক্ষেত্রে আগামী ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

 

Leave a comment