নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে উপনির্বাচনে উত্তেজনা, হুমায়ুন কবীর হেফাজতে

পশ্চিমবঙ্গের নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা উপনির্বাচনে রাজনৈতিক উত্তেজনা। মুর্শিদাবাদে AJUP প্রধান হুমায়ুন কবীরকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে এবং নন্দীগ্রামে পোলিং এজেন্টদের নিয়ে অভিযোগ করেছে কংগ্রেস।

পশ্চিমবঙ্গ, অসম, তামিলনাড়ু ও পুদুচেরির ছয়টি বিধানসভা আসনে মঙ্গলবার উপনির্বাচনের ভোটগ্রহণ চলছে। ভোটগ্রহণের মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর আসনে রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের খবর সামনে এসেছে। মুর্শিদাবাদে আম জনতা উন্নয়ন পার্টি (AJUP)-এর প্রধান ও বিধায়ক হুমায়ুন কবীরকে তাঁর দলীয় কার্যালয় থেকে পুলিশ হেফাজতে নিয়েছে। তাঁকে হেফাজতে নেওয়ার কারণ পুলিশ এখনও স্পষ্ট করেনি।

অন্যদিকে, নন্দীগ্রামের কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধান অভিযোগ করেছেন, তাঁর পোলিং এজেন্টদের জোর করে সরিয়ে দেওয়া, হুমকি দেওয়া এবং তাঁদের নথিপত্র কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। এই অভিযোগের মধ্যেই BJP দাবি করেছে, নন্দীগ্রামে গতবারের তুলনায় এবার তাদের জয়ের ব্যবধান প্রায় পাঁচ গুণ বাড়তে পারে।

রেজিনগর বিধানসভা আসনে ভোটগ্রহণের মধ্যে AJUP প্রধান হুমায়ুন কবীরকে মুর্শিদাবাদে তাঁর দলীয় কার্যালয় থেকে পুলিশ হেফাজতে নিয়েছে। তাঁকে কোন মামলা বা কী কারণে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে, পুলিশ এখনও তা জানায়নি।

হুমায়ুন কবীরের ছেলে গোলাম নবী আজাদ রেজিনগর থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়েও হুমায়ুন কবীর প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর অভিযোগ, এলাকায় সঠিকভাবে ভোটগ্রহণ হচ্ছে না এবং পুলিশ সাধারণ ভোটারদের হয়রানি করছে।

তিনি আরও দাবি করেছেন, কিছু সময় ধরে মুসলিম ভোটারদের কথিতভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। তবে এই অভিযোগগুলির স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা যায়নি।

নন্দীগ্রামের কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধান ভোটগ্রহণের সময় অভিযোগ করেছেন, প্রত্যেক ভোটারের কোনও চাপ ছাড়াই ভোট দেওয়ার অধিকার রয়েছে। তাঁর দাবি, এলাকায় কথিতভাবে ভয় ও চাপের পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে।

মিলন প্রধানের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর পোলিং এজেন্টদের ভোটগ্রহণের আগেই কথিতভাবে জোর করে সরিয়ে দেওয়া এবং হুমকি দেওয়া হয়েছে। কয়েকজন এজেন্টের প্রয়োজনীয় নথিপত্র কেড়ে নেওয়ারও অভিযোগ করেছেন তিনি।

কংগ্রেস প্রার্থী এই ঘটনাগুলিকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার জন্য গুরুতর বলে উল্লেখ করে অবাধ ও নিরপেক্ষ ভোটগ্রহণের দাবি করেছেন। অভিযোগগুলির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও পুলিশের বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া এখনও সামনে আসেনি।

উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে BJP নন্দীগ্রামে বড় জয়ের দাবি করেছে। দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেছেন, এবার নন্দীগ্রামে BJP গতবারের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বড় ব্যবধানে জয় পেতে পারে।

BJP নেতাদের দাবি, এলাকায় দলের সমর্থন শক্তিশালী। রেজিনগর নিয়েও BJP-র বক্তব্য, এবারের নির্বাচনের ফল রাজনৈতিক সমীকরণে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে।

বাংলা সরকারের মন্ত্রী দিলীপ ঘোষও নন্দীগ্রামে BJP-র অবস্থান শক্তিশালী বলে দাবি করেছেন। তাঁর বক্তব্য, নন্দীগ্রাম আগে থেকেই BJP-র প্রভাবাধীন আসন এবং এবার জয়ের ব্যবধান আরও বাড়তে পারে।

রেজিনগর বিধানসভা আসনে এবার BJP, কংগ্রেস, TMC-র পৃথক রাজনৈতিক গোষ্ঠী, CPI(M) এবং হুমায়ুন কবীরের AJUP-র প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

রেজিনগর মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা। BJP প্রার্থী শঙ্করাও সরকারকে বাদ দিলে প্রধান দলগুলির একাধিক প্রার্থী মুসলিম সম্প্রদায়ের। কংগ্রেস মোহাম্মদ আবদুল্লাহিল কাফি, TMC রবি-উল আলম চৌধুরী এবং AJUP হুমায়ুন কবীরের ছেলে গোলাম নবী আজাদকে প্রার্থী করেছে।

এই আসনে মুসলিম ভোটারদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। সেই কারণে BJP ও বিরোধী দলগুলির মধ্যে নির্বাচনী কৌশল নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে ভোটগ্রহণের ঠিক এক দিন আগে নির্বাচন কমিশন স্থানীয় থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিককে বদল করে। বর্তমান আধিকারিক অজয় কুমার মিশ্রকে সরিয়ে দেবাশিস সরকারকে নতুন ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক করা হয়।

বিরোধী দলগুলির অভিযোগের পর এই পরিবর্তন করা হয়। বিরোধীদের অভিযোগ ছিল, তৎকালীন থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক শাসকপক্ষের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। নির্বাচন কমিশনের এই পদক্ষেপকে নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনার লক্ষ্যে নেওয়া পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়। তবে পুলিশ আধিকারিক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের পৃথক দাবি রয়েছে।

এই উপনির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, দীর্ঘ সময় পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী, বিধায়ক বা কোনও আসনের প্রার্থী—কোনও ভূমিকাতেই নেই।

মে ২০২৬-এ অনুষ্ঠিত বিধানসভা নির্বাচনে TMC ক্ষমতার বাইরে চলে যায় এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও নির্বাচনে পরাজিত হন। নন্দীগ্রাম থেকে তিনি উপনির্বাচনে লড়তে পারেন বলে প্রথম দিকে জল্পনা ছিল। শেষ পর্যন্ত তা হয়নি।

TMC-র মনোনীত প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান পরে তাঁর মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন। এরপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে সমর্থনের অবস্থান নেন।

নন্দীগ্রাম দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ২০০৭ সালের জমি অধিগ্রহণ বিরোধী আন্দোলনকে এই এলাকার রাজনীতিতে একটি নির্ণায়ক মোড় হিসেবে দেখা হয়। এই আন্দোলন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং TMC-কে রাজ্যের ক্ষমতায় পৌঁছাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

২০২১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নন্দীগ্রাম থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। তবে BJP-র শুভেন্দু অধিকারীর কাছে তিনি পরাজিত হন। এরপর থেকে নন্দীগ্রাম TMC ও BJP-র রাজনৈতিক সংঘাতের প্রতীক হয়ে ওঠে।

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে শুভেন্দু অধিকারী নন্দীগ্রামের পাশাপাশি ভবানীপুর থেকেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং দুই আসনেই জয়ী হন। ভবানীপুরে তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ১৫,১০৫ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন।

নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে BJP শুভেন্দু অধিকারীর প্রাক্তন সহযোগী চন্দ্রনাথ রথের মাকে প্রার্থী করেছে। ৬ মে ২০২৬ চন্দ্রনাথ রথকে হত্যা করা হয়। এই ঘটনার পর নন্দীগ্রামের নির্বাচন আরও সংবেদনশীল রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে।

কংগ্রেস ও BJP উভয়েই এই আসনে নিজেদের জয় নিয়ে আত্মবিশ্বাসী বলে অবস্থান জানিয়েছে। অন্যদিকে, TMC-র সরাসরি নির্বাচনী উপস্থিতি দুর্বল হলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কংগ্রেস প্রার্থীকে সমর্থন নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে ভিন্ন রাজনৈতিক মাত্রা দিয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের দুই আসনে ভোটগ্রহণের সময় সামনে আসা অভিযোগগুলি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক বাড়িয়েছে। কংগ্রেস তাদের পোলিং এজেন্টদের কথিতভাবে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করেছে। অন্যদিকে, হুমায়ুন কবীর পুলিশের বিরুদ্ধে পক্ষপাত এবং ভোটারদের হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন।

BJP এই রাজনৈতিক অভিযোগগুলির মধ্যেই নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর—দুই আসনেই ভালো ফল করার দাবি করেছে। এখন ভোটদানের প্রকৃত হার এবং ভোটারদের রায় কোন দলের পক্ষে যায়, সেদিকেই নজর রয়েছে। নির্বাচনের ফল নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণ কতটা বদলেছে, তা নির্ধারণ করবে।

 

Leave a comment