২০২৭ সালের মধ্যে মহিলা ফুটবলের রাজস্ব ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়ানোর পূর্বাভাস FIFPRO-র

FIFPRO-র সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মধ্যে মহিলা ফুটবলের বৈশ্বিক রাজস্ব ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়াতে পারে। তবে খেলোয়াড়দের কম বেতন, অনিশ্চিত চুক্তি, বিলম্বিত পারিশ্রমিক এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার অভাবের সমস্যা রয়েছে।

FIFPRO-র একটি নতুন সমীক্ষা অনুযায়ী, মহিলা ফুটবলের বৈশ্বিক রাজস্ব ২০২৭ সালের মধ্যে ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে এই বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের মধ্যেও বহু খেলোয়াড় কম বেতন, অনিশ্চিত চুক্তি, বিলম্বিত পারিশ্রমিক এবং মানসিক চাপের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। ৮০০-রও বেশি ফুটবল খেলোয়াড়ের মতামতের ভিত্তিতে তৈরি এই সমীক্ষায় মহিলা ফুটবলের আর্থিক অগ্রগতির পাশাপাশি খেলোয়াড়দের কর্মসংস্থান ও মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যার কথা উঠে এসেছে।

সমীক্ষায় ৫৯% খেলোয়াড় ফুটবল থেকে আগেভাগে অবসর নেওয়ার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে আর্থিক সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে, ৪৬% খেলোয়াড় মনস্তাত্ত্বিক চাপকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সমীক্ষার ফলাফল মহিলা ফুটবলের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা এবং খেলোয়াড়দের বাস্তব কর্মপরিস্থিতির মধ্যে ব্যবধান তুলে ধরেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মহিলা ফুটবলের বৈশ্বিক রাজস্ব ছিল প্রায় ৫৮১ মিলিয়ন ডলার। অনুমান করা হচ্ছে, ২০২৭ সালের মধ্যে এই পরিমাণ ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। খেলাটির ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা, জনপরিসরে দৃশ্যমানতা, বিনিয়োগ এবং বাণিজ্যিক সুযোগের সম্প্রসারণ এই বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

তবে FIFPRO-র মতে, মহিলা ফুটবলের অর্থনৈতিক বিকাশের পাশাপাশি খেলোয়াড়দের সুরক্ষা এবং কর্মসংস্থানসংক্রান্ত অধিকারও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। সংগঠনটির মহিলা ফুটবল বিভাগের প্রধান অ্যালেক্স কালভিনের মতে, খেলোয়াড়দের জনপরিসরে দৃশ্যমানতা বৃদ্ধি, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং পর্যাপ্ত সহায়তা ব্যবস্থার অভাব মানসিক চাপ বাড়ানোর সম্ভাব্য কারণ।

কালভিন বলেন, খেলোয়াড়দের দৃশ্যমানতা বাড়লেও কম আয়ের কারণে তাঁদের কাছ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অন্যান্য জনপরিসরে আরও সক্রিয় থাকার প্রত্যাশা বাড়ছে। তাঁর মতে, কিছু খেলোয়াড়কে অপর্যাপ্ত আয়ের ঘাটতি পূরণ করতে অতিরিক্ত জনসংযোগমূলক কার্যকলাপের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

সমীক্ষার অন্যতম প্রধান ফলাফল মহিলা ফুটবল খেলোয়াড়দের মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যা। সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারী ৫৭% খেলোয়াড় জানিয়েছেন, তাঁরা মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অর্ধেক খেলোয়াড় প্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য নিজেদের ক্লাবের কাছ থেকে যথাযথ সমর্থন পাননি।

কালভিনের মতে, মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়লেও অনেক খেলোয়াড়ের মনে হচ্ছে, তাঁদের নিজেদের সমস্যার মোকাবিলা একাই করতে হচ্ছে। তিনি জানান, যেসব খেলোয়াড় বেশি মনস্তাত্ত্বিক চাপের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন, তাঁদের অনেকে ক্লাব বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পর্যাপ্ত মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা না পাওয়ার কথা বলেছেন।

খেলার পারফরম্যান্সের চাপ, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং জনসমক্ষে সমালোচনা খেলোয়াড়দের অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার খেলোয়াড় ও সমর্থকদের মধ্যে যোগাযোগ সহজ করেছে। তবে এর পাশাপাশি অনলাইন হয়রানি ও দুর্ব্যবহারের ঝুঁকিও বেড়েছে।

FIFPRO-র পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০১৭ সালের পর থেকে মহিলা ফুটবলে বেতন, বিনিয়োগ এবং জনপরিসরে দৃশ্যমানতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তা সত্ত্বেও পেশাদার পর্যায়ে খেলা সব খেলোয়াড় সমান আর্থিক নিরাপত্তা ও সহায়তা পাচ্ছেন না।

প্রতিবেদনে খেলোয়াড়দের পেশাদার পরিচয় সম্পর্কেও তথ্য উঠে এসেছে। FIFA-র সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনও খেলোয়াড়ের লিখিত চুক্তি থাকলে এবং ফুটবল খেলার সঙ্গে সম্পর্কিত খরচের চেয়ে বেশি পারিশ্রমিক পেলে তাঁকে পেশাদার খেলোয়াড় হিসেবে গণ্য করা হয়।

সমীক্ষায় ৬২% খেলোয়াড় নিজেদের পেশাদার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অন্যদিকে, ২৭% নিজেদের আধা-পেশাদার এবং ১২% শৌখিন খেলোয়াড় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। শতাংশের মোট যোগফল ১০০-র সামান্য বেশি, যা পরিসংখ্যান পূর্ণসংখ্যায় প্রকাশ করার কারণে হতে পারে।

সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারী সব খেলোয়াড়ই নিজেদের দেশের শীর্ষ স্তরের লিগে অংশগ্রহণকারী ক্লাবগুলির হয়ে খেলছিলেন। তা সত্ত্বেও, মাত্র ৭৮% খেলোয়াড় লিখিত চুক্তি থাকার কথা জানিয়েছেন এবং ৮২% বলেছেন, তাঁরা নিজেদের ক্লাব থেকে পারিশ্রমিক পান। মাত্র ৫৭% খেলোয়াড় জানিয়েছেন, এই পারিশ্রমিক ফুটবল খেলার সঙ্গে সম্পর্কিত খরচ মেটানোর জন্য যথেষ্ট।

কালভিনের মতে, যেসব খেলোয়াড় পেশাদার হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের পেশাদার বলে অনুভব করেন না, তাঁরা কর্মী হিসেবে প্রাপ্য সব সুবিধা পাচ্ছেন না। এই পরিস্থিতি চুক্তি, বেতন এবং সামাজিক সুরক্ষার বিষয়গুলিতে নজর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।

মহিলা ফুটবল খেলোয়াড়দের আয়ের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক বৈষম্যও স্পষ্ট। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ সালের পর থেকে খেলোয়াড়দের গড় মাসিক আয় তিন গুণ বেড়ে ২,৬০১ ডলারে পৌঁছেছে। তবে মধ্যম বেতন ১,৬৬৯ ডলার। মধ্যম বেতন হল সেই পরিমাণ, যার ওপরে এবং নীচে সমান সংখ্যক খেলোয়াড়ের আয় থাকে।

অঞ্চলভেদে গড় মাসিক বেতনে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। উত্তর আমেরিকায় গড় মাসিক বেতন ৬,৪৫০ ডলার এবং মধ্য ও পশ্চিম ইউরোপে ৩,৯৮২ ডলার। এর বিপরীতে, পূর্ব ইউরোপে গড় মাসিক আয় ৮৭৮ ডলার এবং আফ্রিকায় মাত্র ৪৮০ ডলার।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমেরিকা ও মেক্সিকোর মতো দেশের লিগগুলিতে খেলোয়াড়দের বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তা সত্ত্বেও, পূর্ব ইউরোপের ১০টি দেশে গড় বেতন জাতীয় ন্যূনতম মজুরির চেয়ে কম। পশ্চিম ইউরোপ এবং এশিয়া-ওশেনিয়ার মতো অঞ্চলগুলিতেও কয়েকটি বড় ফুটবল বাজার থাকা সত্ত্বেও গড় বেতন জাতীয় ন্যূনতম মজুরির তুলনায় খুব বেশি নয়।

FIFPRO জানিয়েছে, এই প্রতিবেদনে পৃথক লিগের পরিবর্তে আঞ্চলিক পরিসংখ্যানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেই কারণে সংগঠনটি বিভিন্ন লিগের গড় বেতনের পৃথক বিবরণ দিতে পারেনি।

মহিলা ফুটবলে চুক্তির গড় মেয়াদ ২০১৭ সালে প্রায় এক বছর থেকে বেড়ে ১৯ মাস হয়েছে। তা সত্ত্বেও, অনেক খেলোয়াড় বছরের ১২ মাসের জন্য নিয়মিত আয়ের নিশ্চয়তা পান না।

কালভিনের মতে, মাত্র প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ খেলোয়াড় পুরো ১২ মাসের পারিশ্রমিক পান। অনেক খেলোয়াড় সাত বা নয় মাসের চুক্তিতে কাজ করেন। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বছরের বাকি সময়ের জন্য তাঁদের আয়ের বিকল্প উৎস খুঁজতে হতে পারে।

সমীক্ষায় ২৪% খেলোয়াড় জানিয়েছেন, গত দুই মরশুমে তাঁরা দেরিতে বেতন পেয়েছেন। অন্যদিকে, ৪২% খেলোয়াড়কে পেনশনের সুবিধা দেওয়া হয়নি। এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মহিলা ফুটবলের বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ সত্ত্বেও অনেক খেলোয়াড়ের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা করা কঠিন হতে পারে।

ইংল্যান্ডের মহিলা সুপার লিগের মতো প্রতিযোগিতার সম্প্রসারণ মহিলা ফুটবলের দৃশ্যমানতা বাড়িয়েছে। তবে FIFPRO-র মতে, শীর্ষ লিগগুলির সাফল্যের কারণে অন্য বাজারে অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে খেলা খেলোয়াড়দের সমস্যাগুলি আড়ালে থেকে যেতে পারে।

কালভিনের মতে, মহিলা ফুটবলের অর্থনৈতিক বিকাশের সম্ভাবনা এখন অনেকটাই প্রতিষ্ঠিত। তবে খেলোয়াড়দের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম, নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং নীতিতে দ্রুত উন্নতি প্রয়োজন।

তাঁর মতে, বাণিজ্যিক বৃদ্ধির প্রতিফলন খেলোয়াড়দের উন্নত কর্মপরিবেশ, যথাযথ পারিশ্রমিক এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার মধ্যেও দেখা উচিত। পর্যাপ্ত সুরক্ষাব্যবস্থা খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স উন্নত করতে এবং নিজেদের পেশাগত জীবন আরও স্থিতিশীল করতে সহায়তা করতে পারে।

FIFPRO-র প্রতিবেদন মহিলা ফুটবলের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং খেলোয়াড়দের বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে ব্যবধান তুলে ধরেছে। একদিকে বৈশ্বিক রাজস্ব বৃদ্ধির পূর্বাভাস রয়েছে, অন্যদিকে কম বেতন, অনিশ্চিত চুক্তি, বিলম্বিত পারিশ্রমিক এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার অভাবের মতো সমস্যা এখনও বিদ্যমান।

 

Leave a comment