পিওকে-তে সংরক্ষিত আসন ইস্যুতে সংঘর্ষে ১১ জন নিহত, ৭০ জনের বেশি আহত

পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে সংরক্ষিত আসন নিয়ে চলমান বিরোধের মধ্যে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে অন্তত ১১ জন নিহত এবং ৭০ জনের বেশি আহত হয়েছে। ঘটনাকে ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে।

পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে (পিওকে) রোববার পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষে পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রাওয়ালকোট ও আশপাশের এলাকায় সংঘটিত এই সহিংসতায় অন্তত ১১ জন নিহত এবং ৭০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ও স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জানা গেছে, নিহতদের মধ্যে ৭ জন বেসামরিক ব্যক্তি ও ৪ জন পুলিশ সদস্য রয়েছেন।

সংঘর্ষের পর পুরো এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর মোতায়েন বাড়ানো হয়। বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি (JAAC)-এর এক সদস্যের মৃত্যুর প্রতিবাদে রাওয়ালকোটের একটি হাসপাতালের বাইরে সংগঠনের কর্মীরা বিক্ষোভ করছিলেন। অভিযোগ করা হয়, ওই সদস্য পুলিশি অভিযানের সময় নিহত হয়েছিলেন। এর পর সংগঠনের সমর্থকদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশ ও জনতার মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পরে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়, যেখানে গুলিবর্ষণ ও পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, সহিংসতায় বিক্ষোভকারীরাও অস্ত্র ব্যবহার করেছেন। অন্যদিকে বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, পুলিশ প্রথমে গুলি চালিয়েছিল, যার ফলে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে।

কমিশনারের দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১১ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪ জন পুলিশ সদস্য, ৭ জন বেসামরিক ব্যক্তি এবং একজন পথচারী রয়েছেন। এছাড়া প্রায় ৭০ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২৩ জন নিরাপত্তা কর্মী এবং প্রায় ৫০ জন বিক্ষোভকারী বলে জানানো হয়েছে।

আহতদের স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানানো হয়েছে। প্রশাসন জরুরি পরিষেবাগুলোকে সতর্ক অবস্থায় রেখেছে এবং চিকিৎসা সুবিধা বাড়ানো হয়েছে।

সহিংসতার পর পুলিশ অভিযান জোরদার করে প্রায় ৩০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নিরাপত্তা বাহিনী বিভিন্ন এলাকায় তল্লাশি অভিযানও শুরু করেছে।

প্রশাসন সংবেদনশীল এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করেছে এবং জনগণকে শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে। এছাড়া কয়েকটি এলাকায় ইন্টারনেট পরিষেবা ও জনসাধারণের চলাচলের ওপর সাময়িক বিধিনিষেধ আরোপের তথ্যও সামনে এসেছে।

এই বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে পিওকে আইনসভার ১২টি সংরক্ষিত আসন। এসব আসন তাদের জন্য নির্ধারিত, যারা জম্মু ও কাশ্মীর থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে পাকিস্তানের অন্যান্য অংশে বসতি স্থাপন করেছেন। এর মধ্যে ১৯৪৭, ১৯৬৫ ও ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময় বাস্তুচ্যুত হওয়া ব্যক্তিরাও অন্তর্ভুক্ত।

জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটির দাবি, এসব সংরক্ষিত আসনের কারণে স্থানীয় জনগণের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সংগঠনটির বক্তব্য, এই আসনগুলোর সুবিধা সীমিত কয়েকটি পরিবার ও গোষ্ঠীর মধ্যে কেন্দ্রীভূত, ফলে স্থানীয় জনগণের কণ্ঠস্বর দুর্বল হয়ে পড়ে।

এই সংরক্ষিত আসন বাতিলের দাবিতে JAAC দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে।

পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন পিওকে সরকার ৫ জুন সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় JAAC-কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। সরকার এ সিদ্ধান্তের পক্ষে জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার কারণ উল্লেখ করে।

নিষেধাজ্ঞার পর পুলিশ সংগঠনটির সমর্থকদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে এবং একাধিক গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং বিক্ষোভ আরও তীব্র রূপ ধারণ করে।

স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, JAAC-এর ৩৮টি দাবির অধিকাংশই ইতোমধ্যে মেনে নেওয়া হয়েছে, তবে সংগঠনটি আন্দোলন প্রত্যাহারে সম্মত নয়।

স্থানীয় কর্মকর্তাদের মতে, সংঘর্ষ চলাকালে বিক্ষোভকারীরা শটগানসহ অন্যান্য অস্ত্র ব্যবহার করে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা চালায়, যার জবাবে পুলিশ ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়।

অন্যদিকে বিক্ষোভকারী সংগঠনগুলোর অভিযোগ, পুলিশ অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে, যার ফলে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে এবং বহু নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।

ঘটনাটি এখন একটি বড় রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকটে রূপ নিয়েছে এবং এ বিষয়ে তদন্তের দাবিও উঠেছে।

পিওকে-তে আগামী ২৭ জুলাই আইনসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ৫৩ সদস্যের আইনসভায় ৪৫টি আসনে সরাসরি নির্বাচন হয়, আর ৮টি আসন নারী, কারিগরি বিশেষজ্ঞ এবং ধর্মীয় পণ্ডিতদের জন্য সংরক্ষিত।

তবে সাম্প্রতিক সহিংসতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা নির্বাচনী পরিবেশকে প্রভাবিত করেছে। নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

গত কয়েক বছরে পিওকে-র রাজনীতি ধারাবাহিকভাবে অস্থির ছিল। ২০২১ সালের নির্বাচনে Pakistan Tehreek-e-Insaf সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও পাকিস্তানে ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রভাব পিওকে-তেও পড়ে।

এর পর একাধিকবার প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তিত হয়েছে এবং রাজনৈতিক সমীকরণে পরিবর্তন এসেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে Pakistan Peoples Party-সংশ্লিষ্ট নেতৃত্ব প্রশাসনিক দায়িত্ব পেয়েছে, তবে রাজনৈতিক উত্তেজনা এখনও অব্যাহত রয়েছে।

 

Leave a comment