বাড়িতে চাল বা অন্যান্য শস্য সংরক্ষণের জন্য কীটনাশক ব্যবহার অনেক পরিবারেরই পরিচিত অভ্যাস। কিন্তু সেই অসাবধানতাই কখনও কখনও প্রাণঘাতী বিপদের কারণ হতে পারে। সম্প্রতি অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড থেকে নির্গত বিষাক্ত ফসফিন গ্যাসের সংস্পর্শে এসে গুরুতর অসুস্থ হয়েছে মাত্র ৯ কেজি ওজনের এক শিশু। চিকিৎসকদের দাবি, এই ধরনের বিষক্রিয়ার নির্দিষ্ট কোনও প্রতিষেধক নেই এবং দ্রুত চিকিৎসা না পেলে মৃত্যুঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।
চালের কৌটোয় কীটনাশক, সেখান থেকেই বিপদের সূত্রপাত
পরিবারের সদস্যরা চালে পোকামাকড়ের আক্রমণ ঠেকাতে চালের বড় পাত্রে অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইডের পাউচ রেখেছিলেন। কিছুদিন পর থেকেই বাড়ির ভিতরে তীব্র গন্ধ ছড়াতে শুরু করে। পরে জানা যায়, ওই কীটনাশক থেকেই নির্গত হওয়া ফসফিন গ্যাস শিশুর শরীরে শ্বাসের মাধ্যমে প্রবেশ করেছে।প্রথমে শিশুটির বমি, ডায়রিয়া এবং তীব্র জলশূন্যতার উপসর্গ দেখা দেয়। পরে অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
১৫ ঘণ্টায় তিনবার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মাত্র ১৫ ঘণ্টার মধ্যে তিনবার শিশুটির হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে তাকে উন্নত লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে।চিকিৎসকদের সন্দেহ, বারবার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট এবং দ্রুত শারীরিক অবনতির কারণই ছিল অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড বিষক্রিয়া। পরে পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকেবাড়িতে কীটনাশক ব্যবহারের তথ্য পাওয়ার পর বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়।
কী এই অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড?
অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড একটি অত্যন্ত শক্তিশালী কীটনাশক, যা সাধারণত শস্য, চাল, গম বা অন্যান্য খাদ্যশস্যে পোকামাকড় দমন করতে ব্যবহার করা হয়।এই রাসায়নিকটি আর্দ্রতার সংস্পর্শে এলেই ফসফিন (Phosphine) নামে একটি বিষাক্ত গ্যাস তৈরি করে। এই গ্যাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।
কেন এত বিপজ্জনক ফসফিন গ্যাস?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফসফিন গ্যাস শরীরের কোষের শক্তি উৎপাদনের প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। ফলে হৃদযন্ত্র, লিভার, কিডনি, মস্তিষ্কসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে।
এই বিষক্রিয়ার ফলে দেখা দিতে পারে—
তীব্র বমি ও ডায়রিয়া
শরীরে জলশূন্যতা
শ্বাসকষ্ট
রক্তচাপ কমে যাওয়া
হৃদস্পন্দনের অনিয়ম
হার্ট ফেলিওর
মাল্টি-অর্গান ফেলিওর
কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট
শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি
চিকিৎসকদের মতে, ছোট শিশুদের শরীরের ওজন কম হওয়ায় অল্প পরিমাণ বিষাক্ত গ্যাসও মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।
এই ঘটনায় শিশুটির দিদিরও বমি ও ডায়রিয়ার সমস্যা হয়েছিল। তবে বড় হওয়ায় সে দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে। কিন্তু ছোট শিশুর শরীর সেই বিষক্রিয়ার ধাক্কা সামলাতে পারেনি।
প্রতিষেধক নেই, তাই সতর্কতাই একমাত্র উপায়
অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড বিষক্রিয়ার কোনও নির্দিষ্ট প্রতিষেধক নেই। চিকিৎসা মূলত রোগীর শ্বাসপ্রশ্বাস, হৃদযন্ত্র এবং অন্যান্য অঙ্গের কার্যক্ষমতা বজায় রাখার ওপর নির্ভর করে।
তাই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ—
বাড়িতে অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড ব্যবহার এড়িয়ে চলুন।
কীটনাশক ব্যবহার করলে লেবেলের নির্দেশিকা অবশ্যই মেনে চলুন।
শিশুদের নাগালের বাইরে রাখুন।
ব্যবহারের সময় পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা রাখুন।
তীব্র গন্ধ বা অসুস্থতা অনুভব করলে দ্রুত স্থান ত্যাগ করুন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
চালের পাত্রে পোকামাকড় রুখতে ব্যবহৃত অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড থেকেই ঘটতে পারে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা। বিষাক্ত ফসফিন গ্যাসের সংস্পর্শে এসে গুরুতর অসুস্থ হয়েছে ৯ কেজি ওজনের এক শিশু। চিকিৎসকদের মতে, এই বিষক্রিয়ায় দ্রুত হৃদযন্ত্র বিকল হওয়া থেকে শুরু করে একাধিক অঙ্গের ক্ষতি হতে পারে। বাড়িতে কীটনাশক ব্যবহারে চরম সতর্কতার বার্তা দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।








