সাওয়ানের চতুর্থ সোমবারে মুজফ্ফরপুরের প্রসিদ্ধ বাবা গরীবনাথ ধাম ভক্ত ও কানওয়ারিয়ায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। গভীর রাত থেকেই কানওয়ারিয়া ও ভক্তদের আসার সংখ্যা বাড়তে থাকে। সোমবার সকালে মঙ্গলা আরতি ও বিশেষ পূজার পর জলাভিষেক শুরু হয়। বাবা গরীবনাথের দর্শন ও জলাভিষেকের জন্য মন্দিরের আশপাশে দীর্ঘ সারি দেখা যায়। এখন পর্যন্ত প্রায় দেড় লাখ ভক্তের পৌঁছানোর তথ্য সামনে এসেছে। মন্দির চত্বর থেকে কানওয়ারিয়া পথ পর্যন্ত ‘হর হর মহাদেব’ ও ‘বোল বম’ ধ্বনিতে পরিবেশ মুখর হয়ে ওঠে।
সাওয়ানের সোমবারে বাবা গরীবনাথ মন্দিরে জলাভিষেকের জন্য প্রতি বছরই বিপুল সংখ্যক ভক্ত আসেন। চতুর্থ সোমবার হওয়ায় এবারও ভক্তদের মধ্যে উৎসাহ দেখা যায়। বহু কানওয়ারিয়া রাত থেকেই মন্দিরের আশপাশে পৌঁছে নিজেদের পালার অপেক্ষা করতে থাকেন। সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভক্তদের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ে। ভিড় নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন ও মন্দির কর্তৃপক্ষ ব্যারিকেড এবং সারিবদ্ধ প্রবেশের ব্যবস্থা করেছে।
মঙ্গলা আরতির পর জলাভিষেক শুরু হতেই ভক্তদের সারি মন্দিরের দিকে এগোতে থাকে। কানওয়ারে করে আনা জল নিয়ে ভক্তরা মন্দিরে পৌঁছান। বহু ভক্ত গঙ্গাজল, দুধ, বেলপাতা, ফুল ও অন্যান্য পূজার সামগ্রী দিয়ে বাবা গরীবনাথের অভিষেক করেন। পূজার পর তাঁরা পরিবারের সুখ-সমৃদ্ধি, সুস্বাস্থ্য ও মনোকামনা পূরণের জন্য প্রার্থনা করেন।
সকাল থেকেই মন্দিরের আশপাশে ধর্মীয় পরিবেশ বজায় ছিল। বিভিন্ন জায়গায় কানওয়ারিয়াদের দল দেখা যায়। গেরুয়া পোশাক পরা ভক্তরা ‘বোল বম’ ও ‘হর হর মহাদেব’ ধ্বনি দিতে দিতে এগিয়ে যান। কানওয়ারিয়াদের দলে নারী, যুবক ও প্রবীণরাও ছিলেন।
বাবা গরীবনাথ ধামে এবার সাওয়ান উপলক্ষে হেলিকপ্টার থেকে পুষ্পবৃষ্টিও ভক্তদের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় সোমবারেও ভক্ত ও কানওয়ারিয়াদের উপর হেলিকপ্টার থেকে ফুল বর্ষণ করা হয়েছিল। তৃতীয় সোমবার সকালে পুষ্পবৃষ্টির সময় মন্দির চত্বর ‘হর হর মহাদেব’ ও ‘বোল বম’ ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে।
চতুর্থ সোমবারেও ভক্তদের উপর হেলিকপ্টার থেকে পুষ্পবৃষ্টির প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসন পুষ্পবৃষ্টির কারণে বাবা গরীবনাথ ধাম ও সংশ্লিষ্ট এলাকার আশপাশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়িয়েছে। প্রশাসন ২৩ আগস্ট সকাল থেকে ২৪ আগস্ট সন্ধ্যা পর্যন্ত নির্ধারিত এলাকা এবং তার পাঁচ কিলোমিটার ব্যাসার্ধকে রেড জোন ও নো-ড্রোন জোন ঘোষণা করেছে। এই সময় ড্রোন ও হট এয়ার বেলুন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা থাকবে।
হেলিকপ্টার থেকে পুষ্পবৃষ্টির সময় ভক্তদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশাসন বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করছে। মন্দির ও কানওয়ারিয়া পথে ভিড় নিয়ন্ত্রিত রাখার এবং কোনো স্থানে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে না দেওয়ার জন্য কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগের সোমবারগুলিতে পুষ্পবৃষ্টির সময় ভক্তদের মধ্যে উৎসাহের পরিবেশ দেখা গিয়েছিল।
শ্রাবণী মেলার সময় বাবা গরীবনাথ ধামে আসা ভক্তদের জন্য প্রশাসন একাধিক স্তরে ব্যবস্থা করেছে। কানওয়ারিয়া পথে পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় ব্যারিকেড দিয়ে ভক্তদের সারিবদ্ধভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মন্দিরের আশপাশে ভিড় পর্যবেক্ষণে পুলিশ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের দল সক্রিয় রয়েছে।
চতুর্থ সোমবার সকালে মুজফ্ফরপুর শহরেও সাওয়ানের আবহ দেখা যায়। কানওয়ারিয়াদের দল মন্দিরের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো পথ ‘বোল বম’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়। বিভিন্ন স্থানে স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বেচ্ছাসেবকরা কানওয়ারিয়াদের জন্য জল, শরবত ও অন্যান্য সুবিধার ব্যবস্থা করেন।
বাবা গরীবনাথ মন্দিরে জলাভিষেক করতে আসা ভক্তদের মধ্যে বড় সংখ্যক ছিলেন সেইসব কানওয়ারিয়া, যারা পালেজা ঘাটসহ বিভিন্ন স্থান থেকে কানওয়ারে জল নিয়ে মুজফ্ফরপুরে পৌঁছেছেন। পায়ে হেঁটে যাত্রা সম্পন্ন করার পর তাঁরা বাবা গরীবনাথের শিবলিঙ্গে জল অর্পণ করেন। বহু ভক্তের জন্য সাওয়ানের সোমবারে বাবার জলাভিষেক করা বহু বছরের ধর্মীয় পরম্পরার অংশ।
মন্দিরের আশপাশে ফুল, বেলপাতা, দুধ, প্রসাদ ও পূজার সামগ্রীর দোকানেও সকাল থেকেই ব্যস্ততা ছিল। ভক্তরা দর্শনের আগে পূজার সামগ্রী কিনতে দেখা যায়। সাওয়ানের সোমবারের কথা মাথায় রেখে দোকানিরা আগে থেকেই পর্যাপ্ত ফুল, বেলপাতা ও অন্যান্য সামগ্রী মজুত করেছিলেন।
ভিড়ের কারণে প্রবীণ, নারী ও শিশুদের জন্য বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের আবেদন জানানো হয়েছে। প্রশাসনের লক্ষ্য, ভক্তরা যাতে ধাক্কাধাক্কি ও অসুবিধা ছাড়াই জলাভিষেক করতে পারেন। মন্দিরে প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য পৃথক ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে ভিড়ের চাপ এক জায়গায় জমা না হয়।
এর আগে দ্বিতীয় সোমবার বাবা গরীবনাথ মন্দিরে প্রায় ১.৪ লাখ লিটার জল দিয়ে জলাভিষেকের তথ্য সামনে এসেছিল। সেদিনও রবিবার থেকেই কানওয়ারিয়াদের ভিড় বাড়তে শুরু করে এবং সোমবার পর্যন্ত জলাভিষেক চলেছিল। একই সঙ্গে প্রথমবার বাবা গরীবনাথ ধামে হেলিকপ্টার থেকে পুষ্পবৃষ্টি করা হয়েছিল।
তৃতীয় সোমবারও হেলিকপ্টার থেকে পুষ্পবৃষ্টি করা হয়। ভক্তদের নিরাপত্তা ও নির্বিঘ্ন জলাভিষেক নিশ্চিত করতে প্রশাসন রাতভর মন্দির চত্বর ও কানওয়ারিয়া পথের ব্যবস্থাপনা পরিদর্শন করে।
চতুর্থ সোমবারও ভক্তদের বিপুল ভিড়ের কারণে প্রশাসন সতর্ক রয়েছে। মন্দির চত্বরের পাশাপাশি কানওয়ারিয়া পথ, প্রধান মোড় ও পার্কিং এলাকায় নজরদারি রাখা হয়েছে। ভিড় বাড়লে পুলিশ সদস্যরা ভক্তদের পৃথক সারিতে ভাগ করে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
ভক্তদের জন্য চিকিৎসা ও জরুরি পরিষেবাও সক্রিয় রাখা হয়েছে। বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিতির কারণে ভিড় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সহায়তা দেওয়াকে প্রশাসন অগ্রাধিকার দিয়েছে।
বাবা গরীবনাথ ধামে সাওয়ানের সোমবারের ধর্মীয় গুরুত্বের কারণে মুজফ্ফরপুর ছাড়াও আশপাশের জেলা থেকে ভক্তরা এখানে আসেন। বহু পরিবার রবিবার রাতেই শহরে পৌঁছে যায়, যাতে সোমবার সকালে জলাভিষেক করতে পারেন। শেষ ও চতুর্থ সোমবারেও বাইরে থেকে আসা ভক্তদের সংখ্যা বেশি ছিল।
মন্দির চত্বরে শিবমন্ত্র ও জয়ধ্বনির আওয়াজ অব্যাহত থাকে। ভক্তরা সারিতে দাঁড়িয়ে নিজেদের পালার অপেক্ষা করেন। দর্শন ও জলাভিষেকের সুযোগ পাওয়ার পর তাঁরা শিবলিঙ্গে জল অর্পণ করে প্রার্থনা করেন।
হেলিকপ্টার থেকে পুষ্পবৃষ্টির কারণে এবার ভক্তদের মধ্যে অতিরিক্ত উৎসাহ দেখা যাচ্ছে। আকাশ থেকে ফুল বর্ষণের দৃশ্য দেখার জন্য তাঁদের মধ্যে আগ্রহ রয়েছে। এর জন্য প্রশাসন নো-ড্রোন জোন ঘোষণা করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করেছে।
চতুর্থ সোমবার বাবা গরীবনাথ ধামে ভক্তদের ভিড় সাওয়ান উপলক্ষে মুজফ্ফরপুরের ধর্মীয় জমায়েতের চিত্র তুলে ধরে। সকাল থেকে দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভক্তদের সারি এগিয়ে চলতে থাকে। মন্দিরে জলাভিষেক ও দর্শনের প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।










