বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬, বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ৩৫ বছর পর প্রথমবার রাষ্ট্রপতি পদে দুই প্রার্থী মুখোমুখি হওয়ায় নির্বাচনে ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য ভোট দেবেন। ভোট হবে দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সাধারণ ভোটারদের সরাসরি ভূমিকা নেই। সংবিধান ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইনের অধীনে সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেন। এবার সংসদে একটি আসন খালি থাকায় মোট ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য ভোট দেওয়ার জন্য যোগ্য। এর মধ্যে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (BNP)-র ২৪৭ জন সংসদ সদস্য এবং জামায়াতে ইসলামীর ৭৭ জন সংসদ সদস্য রয়েছেন। এছাড়া ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি, স্বতন্ত্র শিবিরসহ অন্যান্য দলের সদস্যরাও নির্বাচকমণ্ডলীর অংশ।
সংসদে BNP-র শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে দলটির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের অবস্থান শক্তিশালী বলে বিবেচিত হচ্ছে। তবে ভোটগ্রহণ ও গণনা শেষ হওয়ার পরই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারিত হবে। BNP-র সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে ফখরুলের জয়ের সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি।
রাষ্ট্রপতি পদে দুই প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ক্ষমতাসীন BNP তাদের জ্যেষ্ঠ নেতা ও তৎকালীন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে প্রার্থী করেছে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় বিরোধী জোট লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির সভাপতি এবং সাবেক সামরিক কর্মকর্তা কর্নেল (অব.) ওলি আহমদকে প্রার্থী করেছে।
দুই প্রার্থীর মনোনয়নপত্র নির্বাচন কমিশন বৈধ ঘোষণা করেছিল। মনোনয়ন প্রত্যাহারের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর দুই প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চূড়ান্ত হয়।
ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত BNP-র শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠকে নেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী ও BNP-র সভাপতি তারেক রহমানের উপস্থিতিতে দল তার প্রার্থিতা অনুমোদন করে। মনোনয়ন জমা দেওয়ার পর ফখরুল দলটির মহাসচিব ও স্থায়ী কমিটি থেকে পদত্যাগ করেন। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি পদের সাংবিধানিক ভূমিকা এবং দলীয় সাংগঠনিক দায়িত্বের মধ্যে পৃথকীকরণ বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সংসদের অধিবেশন কক্ষে ভোটগ্রহণ হবে। ভোট দেওয়ার জন্য সংসদ সদস্যদের আলাদা বুথে যেতে হবে না। তাদের নির্ধারিত আসনে ব্যালট পেপার দেওয়া হবে। ভোটগ্রহণের জন্য নির্বাচন কমিশন বিশেষ প্রস্তুতি নিয়েছে।
প্রতিটি ব্যালট পেপারে রেকর্ডের জন্য কাউন্টারফয়েল এবং ভোট দেওয়ার জন্য মূল অংশ থাকবে। ব্যালট গ্রহণের আগে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী সংসদ সদস্যকে নিজের নাম ও স্বাক্ষর দিতে হবে। এরপর তিনি পছন্দের প্রার্থীর নামের সামনে নিজের নাম লিখে স্বাক্ষর করবেন। ভোটগ্রহণের জন্য অধিবেশন কক্ষে তিনটি স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স রাখা হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের একটি বিষয় হলো, নির্বাচন কমিশন ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থা করেছে। ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গণনা শুরু হবে। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের মতে, গণনাও সম্প্রচারের আওতায় থাকবে এবং ফলাফল তৈরির প্রক্রিয়া স্বচ্ছ রাখার চেষ্টা করা হবে।
ভোটগ্রহণ শেষ হলে ব্যালট পেপার বাছাই করে গণনা করা হবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার এএমএম নাসির উদ্দিন বৈধ ও অবৈধ ভোটের সংখ্যা এবং দুই প্রার্থী কত ভোট পেয়েছেন তা ঘোষণা করবেন। এরপর নির্বাচন কমিশন সচিবালয় গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশ করবে।
এই নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার বিষয়টি নিয়েও আলোচনা রয়েছে। বাংলাদেশের প্রধান হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেছেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও প্রযোজ্য হবে। এর অর্থ, সংসদ সদস্যরা নিজেদের দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারবেন না। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিলে তাদের সংসদ সদস্য পদে প্রভাব পড়তে পারে।
এই বিধান ফখরুলের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। সংসদে BNP-র স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির প্রার্থীর জয়ের জন্য শক্তিশালী ভিত্তি রয়েছে। অন্যদিকে, বিরোধী জোটের প্রার্থী ওলি আহমদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলত রাজনৈতিক বার্তা এবং বিরোধী ঐক্য প্রদর্শনের মাধ্যম হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ইতিহাসও এবারের নির্বাচনকে আলাদা করে তুলেছে। ১৯৯১ সালে সংসদীয় ব্যবস্থা পুনরায় চালু হওয়ার পর সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শুরু হয়। ১৯৯১ সালে দুই প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হয়েছে। ২০২৬ সালের নির্বাচন তাই ৩৫ বছর পর প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, যেখানে একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি পদ মূলত সাংবিধানিক ও আনুষ্ঠানিক ভূমিকার এবং সরকারের নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে থাকে। তবে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ রয়েছে, কারণ ক্ষমতাসীন BNP এই পদের জন্য তাদের একজন জ্যেষ্ঠ নেতাকে প্রার্থী করেছে।
সাবেক রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রয়োজন হয়। শাহাবুদ্দিন ২৪ জুলাই ২০২৬ রাষ্ট্রপতি পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তিনি স্বাস্থ্যসংক্রান্ত গুরুতর সমস্যাকে পদত্যাগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার পদত্যাগের পর সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি পদ শূন্য হওয়ার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা প্রয়োজন।
শাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করে এবং ২০ আগস্টের তারিখ নির্ধারণ করে। মনোনয়ন, যাচাই-বাছাই ও মনোনয়ন প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর এখন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও ওলি আহমদ।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের এক দিন আগে, ১৯ আগস্ট BNP-র সংসদ সদস্যদের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এতে দলের রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে সংসদ সদস্যদের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পর্কিত নির্দেশনা দেওয়া হয়।
এখন বৃহস্পতিবার দুপুরের ভোটগ্রহণের দিকে নজর রয়েছে। ৩৪৯ সংসদ সদস্যের ভোট গণনা শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশ তার ২৩তম রাষ্ট্রপতি পাবে। সংখ্যাগরিষ্ঠতা, দলীয় শৃঙ্খলা এবং সংসদে BNP-র সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এগিয়ে রয়েছেন। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক ভোট গণনা ও ফলাফল ঘোষণার পরই হবে।
এই নির্বাচন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক ব্যবস্থারও একটি ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে দুই প্রার্থীর সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিরোধী রাজনৈতিক সক্রিয়তার বিষয়টি তুলে ধরছে। একই সময়ে, সংসদে BNP-র শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতা দলটির প্রার্থীকে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত করার অবস্থানে রেখেছে।
ভোটগ্রহণ, ভোট গণনা এবং ফলাফল প্রকাশের প্রক্রিয়া সরাসরি সম্প্রচারের সিদ্ধান্তও নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বৃহস্পতিবারের এই নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনাক্রম হিসেবে নথিভুক্ত হতে পারে।










