বাংলাদেশে ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা মির্জা ফখরুলের বিপরীতে অলি আহমদ

বাংলাদেশে প্রায় ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে যাচ্ছে। BNP মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় বিরোধী জোট অলি আহমদকে প্রার্থী করেছে। মনোনয়ন বৈধ হলে ২০ আগস্ট সংসদ সদস্যরা ভোট দেবেন।

বাংলাদেশে প্রায় ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে যাচ্ছে। ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (BNP) মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে প্রার্থী করেছে, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় বিরোধী জোট অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমদকে প্রার্থী করেছে।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সাধারণ মানুষ সরাসরি ভোট দেন না। সংবিধান অনুযায়ী, সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেন। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফলাফল সংসদে রাজনৈতিক দলগুলোর শক্তির ওপর অনেকাংশে নির্ভর করে।

২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে BNP এবং তাদের সহযোগীরা সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। এই কারণে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদের প্রবল দাবিদার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে এবং তাঁর জয়ের সম্ভাবনা শক্তিশালী বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

১৯৯১ সালের পর বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি পদে কোনো প্রকৃত নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি। ১৯৯১ সালে আবদুর রহমান বিশ্বাস ও বদরুল হায়দার চৌধুরীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছিল। আবদুর রহমান বিশ্বাস জয়ী হন। এরপর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধী প্রার্থীরা সামনে আসেননি এবং একাধিক নির্বাচন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সম্পন্ন হয়েছে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া ১৩ আগস্ট সম্পন্ন হয়েছে। BNP-এর পক্ষ থেকে মির্জা ফখরুলের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ১১ দলীয় বিরোধী জোট অলি আহমদের পক্ষে দুটি মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে।

নির্বাচন কমিশন ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র যাচাই করবে। উভয় প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ থাকলে ২০ আগস্ট সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য ভোট দেবেন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবর্তনের সময় এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সাবেক রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করার পর রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হয় এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু হয়। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পর সংবিধান অনুযায়ী নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করা প্রয়োজন বলে নির্বাচন কমিশন আগেই জানিয়েছিল।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের রাজনীতির অভিজ্ঞ নেতাদের মধ্যে রয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় তাঁর রাজনৈতিক পথচলা ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে শুরু হয়। পরে তিনি দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন।

ছাত্র রাজনীতির পর তিনি কিছু সময় শিক্ষা ক্ষেত্রে কাজ করেন। ঢাকা কলেজসহ একাধিক সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিনি শিক্ষকতা করেন। পরে সরকারি চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন।

১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে স্থানীয় রাজনীতিতে তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব বাড়তে শুরু করে। পরে তিনি BNP-তে যোগ দেন এবং দলের সাংগঠনিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯০-এর দশকে জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা আরও শক্তিশালী হয়।

২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর তিনি সরকারের কৃষি প্রতিমন্ত্রী এবং বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি BNP-এর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হন এবং ২০১৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে দলের মহাসচিব হিসেবে নিয়োগ পান।

রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পাওয়ার পর ফখরুল দলের মহাসচিব এবং BNP-এর স্থায়ী কমিটি থেকে পদত্যাগ করেন। তাঁর মনোনয়ন দলীয়ভাবে নির্বাচন কমিশনের সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে পেশ করা হয়েছে।

মির্জা ফখরুলের বিপরীতে বিরোধী জোট অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমদকে প্রার্থী করেছে। অলি আহমদ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (LDP)-এর সভাপতি এবং দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকার জন্য তাঁকে ‘বীর বিক্রম’ সম্মানেও ভূষিত করা হয়েছিল।

সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। তিনি BNP-এর শুরুর দিকের নেতাদের মধ্যে ছিলেন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালে BNP ক্ষমতায় আসার পর তিনি সরকারের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

পরবর্তীতে রাজনৈতিক মতবিরোধের কারণে তিনি BNP থেকে আলাদা হয়ে ২০০৬ সালে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি গঠন করেন। এরপর থেকে তিনি LDP-এর সভাপতি। তিনি একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরোধী শিবিরের অভিজ্ঞ নেতা হিসেবে পরিচিত।

অলি আহমদকে শুধু জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে উল্লেখ করার পরিবর্তে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় বিরোধী জোটের প্রার্থী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। জোটটি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে নিজেদের প্রার্থী হিসেবে অলি আহমদের নাম সামনে এনেছে।

এর ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন পক্ষ এবং বিরোধী জোটের মধ্যে আনুষ্ঠানিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে সংসদে BNP এবং তাদের সহযোগীদের শক্তিশালী অবস্থানের কারণে ফলাফলের দিক থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাটি সমান নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি পদে ভোট হলে সংসদ সদস্যদের সংখ্যা BNP প্রার্থীর পক্ষে নির্ণায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির পদ মূলত সাংবিধানিক ও আনুষ্ঠানিক ভূমিকার। সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রকৃত নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের হাতে থাকে। তবে রাষ্ট্রপতি দেশের সাংবিধানিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন।

১৯৯১ সালের পর ধারাবাহিকভাবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে এবার দুই রাজনৈতিক শিবিরের প্রার্থী দেওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনাক্রম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর BNP ক্ষমতায় ফিরেছে এবং সংসদে তাদের শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধী প্রার্থী দেওয়া রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

২০ আগস্ট সম্ভাব্য ভোটগ্রহণ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার পর একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া হিসেবে অনুষ্ঠিত হতে পারে। উভয় প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ থাকলে সংসদ সদস্যদের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য ভোট দিতে হবে।

তবে সংসদে BNP-এর দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়া প্রায় নিশ্চিত বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতীকীভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই নির্বাচন ক্ষমতাসীন পক্ষ ও বিরোধী জোট নতুন রাজনৈতিক পর্যায়ে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কীভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে, সেটিও তুলে ধরবে।

 

Leave a comment