কেনিয়ায় প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাইলা ওডিঙ্গার শেষ বিদায় অনুষ্ঠানে পুলিশের গুলিতে নিহত তিন ব্যক্তি সংঘর্ষস্থল থেকে অনেক দূরে ছিলেন। BBC Africa Eye-এর তদন্তে এই তথ্য উঠে এসেছে। ঘটনাটির তদন্ত করছে কেনিয়ার স্বাধীন পুলিশ তদারকি কর্তৃপক্ষ (IPOA)। ঘটনার প্রায় এক বছর পরও তদন্ত শেষ হয়নি এবং কাউকে দায়বদ্ধ করা যায়নি।
কেনিয়ার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাইলা ওডিঙ্গাকে শেষ বিদায় জানাতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে পুলিশের গুলিতে নিহত তিন ব্যক্তির অবস্থান নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে। BBC Africa Eye-এর তদন্ত অনুযায়ী, নাইরোবির কাসারানি স্টেডিয়ামে ভিআইপি এলাকার কাছে জনতা ও পুলিশের মধ্যে যে সংঘর্ষ হয়েছিল, নিহত তিন ব্যক্তি তার থেকে যথেষ্ট দূরে ছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন সংঘর্ষস্থল থেকে প্রায় ৬০ মিটার দূরে ছিলেন। অন্য দু’জনের অবস্থান ছিল অন্তত ১৬০ মিটার দূরে।
ঘটনাটি ঘটে ১৬ অক্টোবর ২০২৫ সালে। ওই দিন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে শ্রদ্ধা জানাতে হাজার হাজার মানুষ স্টেডিয়ামে জড়ো হয়েছিলেন। পুলিশের গুলিতে তিনজনের মৃত্যু হয়। BBC ১,৫০০টিরও বেশি ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করার পাশাপাশি নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছে। তদন্তে পুলিশের পদক্ষেপ এবং জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ঘটনার প্রায় এক বছর পরও কেনিয়ার স্বাধীন পুলিশ তদারকি কর্তৃপক্ষের তদন্ত চলছে। এখনও কাউকে দায়বদ্ধ করা হয়নি।
রাইলা ওডিঙ্গার মৃত্যুর পর কেনিয়ায় শোকের পরিবেশ তৈরি হয়। ভারতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮০ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। তিনি কেনিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ছিলেন এবং দীর্ঘদিন বিরোধী রাজনীতির নেতৃত্ব দিয়েছেন।
ওডিঙ্গার মরদেহ কেনিয়ায় ফিরিয়ে আনা হলে নাইরোবির জোমো কেনিয়াট্টা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হন। প্রথমে সংসদ ভবনে তাঁর মরদেহ শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য রাখার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বিপুল জনসমাগম এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কায় শেষ মুহূর্তে অনুষ্ঠানস্থল পরিবর্তন করে কাসারানি স্টেডিয়াম নির্ধারণ করা হয়।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, ৪৮,০০০ দর্শক ধারণক্ষমতার স্টেডিয়ামটিতে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায়নি। হাজার হাজার মানুষ মাঠ ও দর্শকাসনে প্রবেশ করেন। প্রায় ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় তাঁদের কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। অনুষ্ঠান সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়ার জন্য পাবলিক অ্যাড্রেস ব্যবস্থাও উপলব্ধ ছিল না।
এই সময় জনতার একটি ছোট অংশ ভিআইপি প্যাভিলিয়নের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের দিকে প্লাস্টিকের চেয়ারসহ বিভিন্ন বস্তু ছুড়তে শুরু করে। এর পরেই পুলিশ গুলি চালায়। স্টেডিয়ামের অন্য অংশ থেকে পাওয়া ভিডিওতে জনতার বড় অংশকে শান্ত অবস্থায় দেখা যায়।
কেনিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কিপচুম্বা মুরকোমেন BBC-কে বলেন, জনতা পাথর ছোড়ার পর পুলিশ সংযতভাবে পদক্ষেপ করেছিল। তবে BBC-র বিশ্লেষণ করা ফুটেজে বিভিন্ন বস্তু ছুড়তে দেখা গেলেও, সেগুলির মধ্যে পাথর ছিল বলে তদন্তকারীরা কোনও প্রমাণ পাননি।
পুলিশের গুলিতে নিহত ব্যক্তিরা হলেন ইভান্স কিচে, ভিনসেন্ট ওগুটু এবং জিদাহ বুর্কা। ছবি, ভিডিও এবং স্টেডিয়ামের বিন্যাস বিশ্লেষণ করে গুলি লাগার সময় তাঁদের অবস্থান নির্ধারণের চেষ্টা করেছে BBC।
৪০ বছর বয়সি ইভান্স কিচে পেশায় রাঁধুনি ছিলেন এবং তাঁর সাতটি সন্তান ছিল। BBC-র বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গুলি লাগার সময় তিনি ভিআইপি এলাকার কাছে সংঘর্ষস্থল থেকে প্রায় ৬০ মিটার দূরে ছিলেন। তাঁর মাথায় গুলি লেগেছিল।
৩৬ বছর বয়সি ভিনসেন্ট ওগুটুর তিনটি সন্তান ছিল। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুকে গুলি লাগার কারণে তাঁর মৃত্যু হয়। BBC-র তদন্তে দেখা গেছে, তিনি সংঘর্ষস্থল থেকে অন্তত ১৬০ মিটার দূরে স্টেডিয়ামের বিপরীত দিকের দর্শক এলাকায় ছিলেন।
তৃতীয় নিহত ব্যক্তি ৪২ বছর বয়সি জিদাহ বুর্কা। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাথায় গুলি লাগার কারণে তাঁর মৃত্যু হয়। তিনিও সংঘর্ষস্থল থেকে অন্তত ১৬০ মিটার দূরে ছিলেন।
BBC-র তদন্তের প্রধান পর্যবেক্ষণ হল, তিনজনই জনতা ও পুলিশের সংঘর্ষের স্থান থেকে যথেষ্ট দূরে ছিলেন। তবে কোন কর্মকর্তার ছোড়া গুলিতে কোন ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছিল, তা তদন্তে নির্ধারণ করা যায়নি।
ঘটনাসংক্রান্ত ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে BBC Africa Eye একটি সময়রেখা তৈরি করেছে। তদন্তে অন্তত আটজন পুলিশ কর্মকর্তাকে একসঙ্গে কাজ করতে দেখা গেছে। তাঁদের পরনে ছিল কৌশলগত অভিযানের উপযোগী পোশাক ও সামরিক ধাঁচের ইউনিফর্ম। তাঁদের কাছে অ্যাসল্ট রাইফেল ছিল, মুখ ঢাকা ছিল এবং ইউনিফর্মে পরিচয়চিহ্ন স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছিল না।
BBC-র তথ্য অনুযায়ী, এই কর্মকর্তাদের পোশাক ও কার্যকলাপ রাষ্ট্রপতি উইলিয়াম রুটো এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা একটি বিশেষ নিরাপত্তা ইউনিটের কার্যপদ্ধতির সঙ্গে মেলে। ফুটেজে ওই দলের অন্তত তিনজন কর্মকর্তাকে অস্ত্র চালাতে দেখা গেছে।
ফরেনসিক বিশ্লেষণে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা একটি বিশেষ পুলিশ ইউনিটের কর্মকর্তারা প্রাণঘাতী গুলি চালিয়ে থাকতে পারেন। তবে নিহতদের শরীরে লাগা গুলি ওই ইউনিটের কর্মকর্তারাই চালিয়েছিলেন কি না, তা BBC নিশ্চিত করতে পারেনি। স্টেডিয়ামের ভিতরে অন্য পুলিশ সদস্যরাও গুলি চালিয়ে থাকতে পারেন—এই সম্ভাবনাও তদন্তে খারিজ করা যায়নি।
ফলে তদন্তের পর্যবেক্ষণ পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তার সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও, তিনটি মৃত্যুর জন্য নির্দিষ্ট কোনও কর্মকর্তাকে দায়ী করার প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করেনি।
ঘটনাটির তদন্ত করছে কেনিয়ার স্বাধীন পুলিশ তদারকি কর্তৃপক্ষ (IPOA)। পুলিশের পদক্ষেপ এবং তিন ব্যক্তির মৃত্যুর পরিস্থিতি খতিয়ে দেখছে সংস্থাটি। ঘটনার প্রায় এক বছর পরও তদন্ত শেষ হয়নি এবং কাউকে দায়বদ্ধ করা হয়নি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মুরকোমেন পুলিশের পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, কর্মকর্তারা একটানা কয়েক ঘণ্টা কাজ করার পর প্রচণ্ড চাপের মধ্যে ছিলেন। অনুষ্ঠানস্থল শেষ মুহূর্তে পরিবর্তন করায় নতুন জায়গায় নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য পুলিশ খুব কম সময় পেয়েছিল বলেও তিনি জানান।
মুরকোমেন BBC-কে বলেন, স্বাধীন পুলিশ তদারকি কর্তৃপক্ষের তদন্তের ফলাফল যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নিতে সহায়তা করবে। পুলিশের গুলি চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, কোনও কর্মকর্তা বসে সরাসরি কাউকে গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন, এমনটা হওয়া জরুরি নয়। তাঁর মতে, ঘটনাস্থলে উপস্থিত কোনও পুলিশ সদস্য তাৎক্ষণিকভাবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকতে পারেন।
কেনিয়ার ন্যাশনাল পুলিশ সার্ভিস BBC-কে জানিয়েছে, এই ঘটনা থেকে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া গেছে, যা ভবিষ্যতে আরও পেশাদারভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সহায়তা করবে। অন্যদিকে, BBC-র প্রশ্নের জবাব দেয়নি IPOA।
গুলিতে নিহত ভিনসেন্ট ওগুটুর স্ত্রী ইয়ভোন আকিনিয়ি BBC-কে জানান, ১৬ অক্টোবর সকালে তাঁর স্বামী নাইরোবির কেন্দ্রীয় এলাকায় বন্ধুদের সঙ্গে ছিলেন। লোকজনকে স্টেডিয়ামের দিকে যেতে দেখে তিনিও তাঁদের সঙ্গে সেখানে যান। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁর মৃত্যু হয়।
আকিনিয়ি বলেন, এই ঘটনা তাঁদের পরিবারের জীবন বদলে দিয়েছে। সন্তানদের পরিস্থিতি এবং স্বামীর মৃত্যু নিয়ে তিনি গভীর শোক প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারের আয়োজিত শ্রদ্ধা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়েছিলেন তাঁর স্বামী, কিন্তু কী কারণে তাঁর মৃত্যু হল, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
তিনি বলেন, যাঁদের কাছ থেকে নিরাপত্তা প্রত্যাশা করা হয়, তাঁদেরই পদক্ষেপ পরিবারের সদস্যদের যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। স্বামীর মৃত্যুর প্রায় এক বছর পরও এত মানুষের মধ্যে কেন তাঁর স্বামীই নিহত হলেন, সেই প্রশ্নের উত্তর তিনি পাননি।
BBC Africa Eye-এর তদন্তে কেনিয়ায় পুলিশের পদক্ষেপ, জনতা নিয়ন্ত্রণ এবং জবাবদিহি নিয়ে একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। তদন্ত অনুযায়ী, নিহত তিন ব্যক্তি সেই সংঘর্ষস্থল থেকে যথেষ্ট দূরে ছিলেন, যার পর পুলিশ গুলি চালিয়েছিল। একই সঙ্গে, ভিডিও ফুটেজ ও ফরেনসিক বিশ্লেষণে রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত একটি বিশেষ পুলিশ ইউনিটের সম্ভাব্য ভূমিকার ইঙ্গিত মিলেছে।
তবে কে কোন গুলি চালিয়েছিলেন এবং কোন কর্মকর্তার পদক্ষেপে তিনজনের মৃত্যু হয়েছিল, তা এখনও স্পষ্ট নয়। এই ঘটনায় স্বাধীন পুলিশ তদারকি কর্তৃপক্ষের তদন্তের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ হবে। নিহতদের পরিবার এখনও উত্তর পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে এবং কেনিয়ায় এই ঘটনার আইনি জবাবদিহি এখনও নির্ধারিত হয়নি।









