Bel Mala Making Business: বেলের খোলস দিয়ে এমন সুন্দর জিনিস তৈরি হয়! ৩৬ বছর ধরে বাঁকুড়ার এই গ্রামের ঘরে ঘরে চলছে অভিনব কাজ

বেলের খোলস দিয়ে কীভাবে তৈরি হয় সুন্দর বেলমালা? বাঁকুড়ার শুশুনিয়া গ্রামে ৩৬ বছর ধরে চলে এই অভিনব কাজ। জানুন তৈরির পদ্ধতি, দাম ও কারিগরদের আয়ের গল্প।

বেল ফলের খোলস ফেলে না দিয়ে তা দিয়েই তৈরি হচ্ছে মালা! শুনতে অবাক লাগলেও বাঁকুড়ার শুশুনিয়া গ্রামের কারিগরদের কাছে এটাই বহু বছরের পরিচিত কাজ। বেলের খোলস সংগ্রহ থেকে শুরু করে তা পরিষ্কার করা, বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে ছোট ছোট গোলাকার অংশ তৈরি এবং শেষে সুতোয় গেঁথে মালা বানানো—প্রতিটি ধাপেই প্রয়োজন নিখুঁত হাতের কাজ। প্রায় ৩৬ বছর ধরে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে গ্রামের একাধিক পরিবার।

বেলের খোলসেই লুকিয়ে গ্রামের অন্যরকম জীবিকা

বেল ফল সাধারণত শরবত বা বিভিন্ন খাবার তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু শুশুনিয়ার কারিগরদের কাছে বেলের খোলসও মূল্যবান উপকরণ। স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা বেল ছাড়াও বিষ্ণুপুর থেকে বেলের খোলস কিনে আনেন তাঁরা।প্রায় ১৬০টি বেলের খোলস কিনতে খরচ হয় ৪০০ টাকা, এরপর শুরু হয় মালা তৈরির দীর্ঘ প্রক্রিয়া।

প্রথমে খোলস পরিষ্কার, তারপর শুরু আসল কাজ

বেল থেকে শাঁস সম্পূর্ণ বের করে নেওয়ার পর খোলসের বাইরের অংশ চেঁছে পরিষ্কার করা হয়। খোলসের উপরের আবরণ ভালোভাবে সরিয়ে সেটিকে মসৃণ করা হয়।এই প্রাথমিক কাজটি শেষ হওয়ার পরই বেলের খোলসকে মালা তৈরির উপযোগী করা হয়। তবে এরপরের ধাপটি আরও বেশি দক্ষতা ও ধৈর্যের দাবি রাখে।

বিশেষ যন্ত্রে তৈরি হয় ছোট ছোট গোলাকার অংশ

বেলের খোলস প্রস্তুত হয়ে গেলে শুরু হয় সবচেয়ে সূক্ষ্ম কাজ। বিশেষ ধরনের যন্ত্রের সাহায্যে খোলসের ভিতরে গোলাকার নকশা তৈরি করা হয়। এরপর সেই গোল অংশগুলি খোলস থেকে আলাদা করে নেওয়া হয়।একটির পর একটি ছোট গোলাকার টুকরো তৈরি করতে হয়। গোটা প্রক্রিয়াতেই কারিগরের হাতের নিপুণতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামান্য ভুল হলেই খোলস নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

ছুঁচে গেঁথেই তৈরি হয় বেলমালা

ছোট ছোট গোলাকার অংশগুলি আলাদা করে নেওয়ার পর বিশেষ ধরনের ছুঁচ ব্যবহার করে একে একে গেঁথে তৈরি করা হয় মালা। ফলে সাধারণ একটি বেলের খোলস ধীরে ধীরে পরিণত হয় সুন্দর বেলমালায়।এই কাজ দেখতে সহজ মনে হলেও প্রতিটি ধাপে অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরে কাজ করতে করতে শুশুনিয়ার কারিগররা এই দক্ষতা অর্জন করেছেন।

৫ টাকায় এক মালা, মহাজনের হাত ধরে যায় বিভিন্ন বাজারে

প্রস্তুত হওয়ার পর প্রতি বেলমালা প্রায় ৫ টাকা দরে বিক্রি হয়। অর্থাৎ ২০টি মালার দাম দাঁড়ায় ১০০ টাকা।গ্রামের কারিগরেরা সাধারণত তৈরি মালা মহাজনদের কাছে বিক্রি করেন। সেখান থেকেই সেগুলি পৌঁছে যায় বিভিন্ন বাজারে। ফলে রাজ্যের নানা জায়গায় বিক্রি হওয়া বেলমালার একটি উল্লেখযোগ্য অংশের সঙ্গে শুশুনিয়ার কারিগরদের শ্রম জড়িয়ে রয়েছে বলে স্থানীয় প্রস্তুতকারকদের দাবি।

সারাদিন পরিশ্রম করেও আয় ২৫০-৩০০ টাকা

বেলমালা তৈরি করে খুব দ্রুততার সঙ্গে সারাদিন কাজ করলে একজন কারিগর প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত উপার্জন করতে পারেন বলে জানিয়েছেন প্রস্তুতকারক সঞ্জয় দাস।তবে বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে এই আয় সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেই দাবি তাঁদের। সংসারের খরচ সামলাতে এই সামান্য উপার্জন যথেষ্ট নয়। শিল্পী ভাতার মতো সরকারি সহায়তা পেলে তাঁদের আর্থিক চাপ কিছুটা কমত বলেও জানিয়েছেন কারিগরেরা।

নতুন প্রজন্ম কি হারিয়ে দেবে এই ঐতিহ্য?

শুশুনিয়ার এই শিল্পের সঙ্গে বহু বছরের ঐতিহ্য জড়িয়ে থাকলেও নতুন প্রজন্মের অনেকেই এখন এই পেশায় আসতে চাইছেন না। কম আয় এবং কঠোর পরিশ্রমের কারণে ধীরে ধীরে এই কাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন তরুণ প্রজন্মের অনেকে।একদিকে যেমন শুশুনিয়ার পাথর শিল্পেও আগের মতো জৌলুস নেই, তেমনই বেলমালা তৈরির এই ঐতিহ্যও টিকে থাকার লড়াই করছে।

বেল মানেই গরমের দিনে ঠান্ডা বেলের শরবত—এমনটাই জানেন অধিকাংশ মানুষ। কিন্তু এই ফলের খোলস দিয়েও যে তৈরি হতে পারে সুন্দর মালা, তা অনেকেরই অজানা। বাঁকুড়ার শুশুনিয়া গ্রামের বেশ কিছু পরিবার প্রায় ৩৬ বছর ধরে বেলের খোলস থেকে তৈরি করছেন বেলমালা। জটিল ও সময়সাপেক্ষ এই হস্তশিল্পই তাঁদের অন্যতম জীবিকার মাধ্যম।

Leave a comment