বিহারে মৎস্যজীবীদের নামে পরিচালিত একটি সমবায় প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে বড় ধরনের কথিত জালিয়াতির অভিযোগ সামনে এসেছে। বিহার স্টেট ফিশারিজ কো-অপারেটিভ ফেডারেশন লিমিটেড বা কাফেডের নামে রাজ্যের ১৪ লাখেরও বেশি মৎস্যজীবীর কাছ থেকে সদস্যপদের নামে ১০০ টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এই হিসাবে কথিত আদায়ের পরিমাণ প্রায় ১৪ কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছায়। বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় মৎস্য দফতর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলিকে কাফেডের সঙ্গে কোনও ধরনের সহযোগিতা না করার নির্দেশ দিয়েছে। দফতরের জারি করা চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটির কার্যপ্রণালী নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে এবং অর্থনৈতিক অপরাধ দফতরের তদন্তেরও উল্লেখ করা হয়েছে।
জাগরণের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাফেডের গঠন এবং নিবন্ধনের সঙ্গে সম্পর্কিত নথি পরীক্ষা করার সময় বিষয়টি সামনে আসে। অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধন করানোর সময় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করা হয় এবং বিভ্রান্তিকর নথি ব্যবহার করা হয়। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কাফেডের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ঋষিকেশ কশ্যপের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানটিকে বৈধ রূপ দেওয়ার জন্য এমন কিছু সমিতি ও নথি ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে, যেগুলির আইনি বৈধতা আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। তবে তদন্ত সম্পূর্ণ হওয়ার পরই এই অভিযোগগুলির চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারিত হবে।
মৎস্য দফতরের পক্ষ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর জারি করা চিঠিতে কাফেডের কার্যকলাপ নিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলিকে সতর্ক করা হয়েছে। দফতরের মতে, বিভিন্ন তদন্ত রিপোর্ট এবং পাটনা হাইকোর্টের নির্দেশের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটির বৈধতা ও কার্যপ্রণালী নিয়ে গুরুতর আপত্তি সামনে এসেছে। এই ভিত্তিতে মৎস্যচাষের সঙ্গে যুক্ত সরকারি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলিকে কাফেডের সঙ্গে কোনও ধরনের অংশীদারিত্ব বা সহযোগিতা এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে।
এই ঘটনার পটভূমিতে সমবায় প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন সংক্রান্ত পুরনো বিরোধের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাফেডের নিবন্ধনের সময় কথিতভাবে এই তথ্য গোপন করা হয় যে বিহার স্বাবলম্বী সমবায় সমিতি ট্রাইব্যুনাল ১৫ নভেম্বর ২০২১ তারিখে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটিকে আইনত বিলুপ্ত করেছিল। এছাড়া পাটনা হাইকোর্টের ২০১৭ সালের নির্দেশের কথাও দফতরের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। দফতরের বক্তব্য, এই পরিস্থিতি সত্ত্বেও কাফেডের নিবন্ধনের জন্য এমন নথি পেশ করা হয়, যার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির বৈধতার দাবি করা হয়েছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাফেডের পক্ষ থেকে প্রায় ৫০টি প্রাথমিক সদস্য সমিতি থাকার দাবি করা হয়েছিল। দফতরীয় তদন্তে এই দাবিও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। অভিযোগ, এমন প্রতিষ্ঠানগুলিকে নথিতে সক্রিয় বা অস্তিত্বশীল হিসেবে দেখানো হয়েছিল, যেগুলির আইনি বৈধতা শেষ হয়ে গিয়েছিল। কথিতভাবে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের রিপোর্টের সাহায্যে এই সমিতিগুলিকে সক্রিয় দেখানোর চেষ্টা করা হয়। এরপর প্রতিষ্ঠানটিকে মাল্টি-স্টেট সমবায় ব্যবস্থার অধীনে উন্নীত করার প্রক্রিয়া নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে।
এই পুরো ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলির একটি হল মৎস্যজীবীদের কাছ থেকে কথিত অর্থ আদায়। দফতরীয় তথ্য অনুযায়ী, কাফেড বিহার সরকারের সরকারি লোগো ব্যবহার করে মৎস্যজীবীদের কাছে নিজেদের পরিচয় সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো তুলে ধরার চেষ্টা করেছিল। অভিযোগ, এই মাধ্যমে প্রায় ১৪ লাখ মৎস্যজীবীকে শ্রমিক ও কারিগর ফিশারিজ কার্ড দেওয়া হয় এবং প্রত্যেকের কাছ থেকে ১০০ টাকা নেওয়া হয়। ১৪ লাখ মানুষের কাছ থেকে ১০০ টাকা করে নেওয়া হলে মোট অর্থের পরিমাণ প্রায় ১৪ কোটি টাকা হয়। এই কথিত অর্থ আদায়েরও তদন্ত করছে অর্থনৈতিক অপরাধ দফতর।
সরকারি লোগো ব্যবহারের বিষয়টিও গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কোনও বেসরকারি বা অননুমোদিত প্রতিষ্ঠান সরকারি পরিচয় বা প্রতীক ব্যবহার করলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। মৎস্য দফতরের বক্তব্য, কাফেডের কার্যকলাপের কারণে বিপুল সংখ্যক মৎস্যজীবীর মধ্যে এই ধারণা তৈরি হতে পারত যে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সরকারের অনুমোদিতভাবে সম্পর্ক রয়েছে। এই কারণেই দফতর মৎস্যজীবী এবং মৎস্যক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলিকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে।
তদন্তে শুধু সদস্যপদ কার্ড এবং কথিত অর্থ আদায়ের বিষয়ই সামনে আসেনি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাফেডের বিরুদ্ধে জাতীয় ফেডারেশনের নাম অপব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। এর মাধ্যমে বিহার স্টেট কো-অপারেটিভ ব্যাংক লিমিটেডে কথিতভাবে এমন একটি অ্যাকাউন্ট খোলার চেষ্টা করা হয়, যার নাম সরকারি বা অনুমোদিত সমবায় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ ছিল। দফতরীয় তদন্তে এই অ্যাকাউন্ট এবং প্রতিষ্ঠানটির পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
ঘটনার সঙ্গে একটি ভুয়ো ওয়েবসাইট তৈরির অভিযোগও সামনে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিজেকে প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে পরিচয় দিয়ে অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করেছিলেন। তদন্তে অভিযোগটি সত্য প্রমাণিত হলে বিষয়টি শুধু নথিগত অনিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টার বিষয়ও সামনে আসবে। বর্তমানে এই দিকটিও তদন্ত করা হচ্ছে।
কাফেডের কার্যকলাপের আরও একটি বিষয় জাতীয় মৎস্য উন্নয়ন বোর্ড বা এনএফডিবি-র সঙ্গে যুক্ত অ্যাকোয়া ওয়ান সেন্টারের অনুদানের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাটনা ও মধুবনীতে অনুমোদিত অ্যাকোয়া ওয়ান সেন্টারের নামে আর্থিক অনুদান পাওয়ার জন্য সন্দেহজনক এবং কথিতভাবে জাল বিল পেশ করা হয়েছিল। এই ঘটনার তদন্ত এখন কেন্দ্রীয় স্তরে করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
অ্যাকোয়া ওয়ান সেন্টারের মতো প্রকল্পের উদ্দেশ্য হল মৎস্যক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সুবিধা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা। এই পরিস্থিতিতে কোনও প্রকল্পের নামে ভুল নথি পেশ করে অনুদান পাওয়ার চেষ্টা করা হয়ে থাকলে, প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছনো সরকারি সহায়তার ওপরও তার প্রভাব পড়তে পারে। এই কারণে দফতরীয় স্তরে নথি পরীক্ষা এবং আর্থিক লেনদেনের তদন্তকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মৎস্য পরিচালকের চিঠিতে ভবিষ্যতে বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারির আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূলত দরভাঙ্গার বাসিন্দা ঋষিকেশ কশ্যপের কার্যকলাপ নিয়ে দফতর আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে সমান্তরাল নোড এজেন্সি হিসেবে কাজ করে কমন সার্ভিস সেন্টার বা সিএসসি বরাদ্দ এবং পোর্টাল নিবন্ধনের মতো কার্যকলাপের মাধ্যমে ভবিষ্যতে সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামে মানুষকে বিভ্রান্ত করা হতে পারে। তবে এটি দফতরের প্রকাশ করা আশঙ্কা, তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল হিসেবে এটিকে দেখা যাবে না।
এই কারণেই মৎস্য দফতর রাজ্যের মৎস্যজীবীদের সঙ্গে যুক্ত সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানগুলিকে সতর্ক করেছে। দফতরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কাফেডের সঙ্গে কোনও ধরনের সহযোগিতা বা অংশীদারিত্ব করা যাবে না। এই নির্দেশ এমন সময় এসেছে, যখন রাজ্যে মৎস্যজীবীদের জন্য বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প এবং অনলাইন পরিষেবাও চালু রয়েছে। বিহার মৎস্য অধিদপ্তরের সরকারি ওয়েবসাইটে আর্থিক বছর ২০২৬-২৭-এর প্রকল্পগুলির জন্য আবেদন এবং মৎস্য প্রকল্প সংক্রান্ত পরিষেবা পাওয়া যাচ্ছে।
এই ঘটনায় অর্থনৈতিক অপরাধ দফতরের তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কথিতভাবে বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। তদন্তকারী সংস্থাকে খতিয়ে দেখতে হবে কার্ড দেওয়ার নামে বাস্তবে কতজনের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে, অর্থ কোন মাধ্যমে জমা হয়েছে, কোথায় ব্যবহার করা হয়েছে এবং এই পুরো প্রক্রিয়ায় কারা জড়িত ছিলেন। এর পাশাপাশি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ডিজিটাল পেমেন্ট, ওয়েবসাইট এবং নথিও পরীক্ষা করা হতে পারে।
মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ রাজ্যে বিপুল সংখ্যক পরিবার মৎস্যচাষ, মাছ ধরা এবং এর সঙ্গে যুক্ত ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। কোনও প্রতিষ্ঠানের নাম, সরকারি লোগো বা প্রকল্পের মাধ্যমে এই সম্প্রদায়কে বিভ্রান্ত করা হলে তার সরাসরি আর্থিক প্রভাব পরিবারগুলির ওপর পড়তে পারে। ব্যক্তিগত স্তরে ১০০ টাকার পরিমাণ কম মনে হলেও লাখ লাখ মানুষের কাছ থেকে একসঙ্গে অর্থ আদায় হলে তা কোটি টাকায় পৌঁছে যায়।
দফতরীয় পদক্ষেপ থেকে বোঝা যাচ্ছে, প্রশাসন এখন প্রতিষ্ঠানটির কার্যকলাপ নিয়ে সতর্ক হয়েছে। কাফেডের সঙ্গে সহযোগিতা না করার নির্দেশ সংশ্লিষ্ট সরকারি এবং মৎস্যক্ষেত্রের প্রতিষ্ঠানগুলির কাছে পাঠানো হয়েছে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে সরকারি ব্যবস্থার সঙ্গে কোনও ধরনের আনুষ্ঠানিক অংশীদারিত্ব করা কঠিন হতে পারে, যতক্ষণ না তার বৈধতা এবং কার্যকলাপ নিয়ে পরিস্থিতি স্পষ্ট হচ্ছে।
এই ঘটনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, ১৪ লাখেরও বেশি মৎস্যজীবীর নামে কথিতভাবে সংগৃহীত প্রায় ১৪ কোটি টাকার প্রকৃত হিসাব কী। তদন্তে এটিও নির্ধারণ করতে হবে কতগুলি ফিশারিজ কার্ড জারি করা হয়েছে, কতজনের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়েছে এবং এর বিনিময়ে কোনও বাস্তব সরকারি বা সমবায় সুবিধা দেওয়া হয়েছিল কি না। পাশাপাশি সরকারি লোগো এবং সমবায় প্রতিষ্ঠানের নাম কথিতভাবে ব্যবহারের বিষয়টিও তদন্ত করা হচ্ছে।
কাফেডের নিবন্ধন থেকে শুরু করে কথিত সদস্যপদ ফি, সরকারি লোগোর ব্যবহার, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ওয়েবসাইট এবং অনুদান সংক্রান্ত নথি—একাধিক স্তরে প্রশ্ন উঠেছে। দফতরীয় চিঠিতে এই কার্যকলাপগুলিকে গুরুত্ব দিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলিকে সতর্ক করা হয়েছে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক অপরাধ দফতর এবং অন্যান্য স্তরে চলা তদন্তের পরই স্পষ্ট হবে কথিত আর্থিক অনিয়মের প্রকৃত পরিসর কতটা এবং এর জন্য কারা দায়ী।
এই মুহূর্তে বিহারের মৎস্যজীবীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল কোনও প্রতিষ্ঠানের নামে সদস্যপদ, কার্ড, সরকারি প্রকল্প বা সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে অর্থ চাওয়া হলে তার সরকারি অনুমোদন যাচাই করা। বিহার মৎস্য অধিদপ্তরের সরকারি ওয়েবসাইটে রাজ্যের মৎস্য প্রকল্প এবং আবেদন সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
কাফেডের ঘটনায় দফতর যে পদক্ষেপ শুরু করেছে, তাতে আগামী দিনে তদন্তের পরিধি আরও বাড়তে পারে। কথিত ১৪ কোটি টাকা আদায়, সরকারি লোগোর ব্যবহার, ভুয়ো নথি, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং অনুদান সংক্রান্ত অভিযোগ পৃথকভাবে বিভিন্ন স্তরে তদন্তের পরই পুরো বিষয়টি স্পষ্ট হবে। এখনও পর্যন্ত সামনে আসা তথ্য মূলত দফতরীয় তদন্ত, রিপোর্ট এবং উত্থাপিত অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে; তাই অভিযোগগুলিকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।











