নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর উপনির্বাচনে প্রার্থী ঘোষণা বিজেপির

পশ্চিমবঙ্গের নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা উপনির্বাচনে বিজেপি হাসিরানি রথ ও শাশ্বর সরকারকে প্রার্থী করেছে। ৬ অক্টোবর ভোটগ্রহণ এবং ৯ অক্টোবর ফল ঘোষণা হবে।
নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর উপনির্বাচনে প্রার্থী ঘোষণা বিজেপির
Photo Credit / Attribution: Google

পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা উপনির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে। ভারতীয় জনতা পার্টি নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর আসনের জন্য তাদের প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেছে। নন্দীগ্রাম থেকে বিজেপি হাসিরানি রথকে প্রার্থী করেছে। হাসিরানি রথ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রয়াত ব্যক্তিগত সহকারী (PA) চন্দ্রনাথ রথের মা। মে মাসে বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের কিছুদিন পর চন্দ্রনাথ রথকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করছে কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো বা CBI।

বিজেপি রেজিনগর বিধানসভা আসনে শাশ্বর সরকারকে প্রার্থী করেছে। শাশ্বর সরকার দলের রাজ্য সম্পাদক এবং মুর্শিদাবাদের প্রাক্তন জেলা সভাপতি ছিলেন। দুই আসনেই এমন মুখকে প্রার্থী করেছে দল, যাদের মাধ্যমে স্থানীয় সংগঠন ও রাজনৈতিক সমীকরণকে সামলানোর চেষ্টা করা হয়েছে। নন্দীগ্রামে হাসিরানি রথের প্রার্থিতা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ তাঁর পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে শুভেন্দু অধিকারীর সম্পর্ক রয়েছে এবং তাঁর ছেলে চন্দ্রনাথ রথের হত্যাকাণ্ডের তদন্ত এখনও চলছে।

নন্দীগ্রাম আসন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে আগে থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে শুভেন্দু অধিকারী নন্দীগ্রামের পাশাপাশি ভবানীপুর আসন থেকেও জয়ী হয়েছিলেন। নিয়ম অনুযায়ী দুটি আসনের মধ্যে একটি ছাড়তে হয়। সেই কারণে তিনি নন্দীগ্রাম বিধানসভা আসন থেকে পদত্যাগ করেন। এর ফলেই এই আসনে উপনির্বাচনের পরিস্থিতি তৈরি হয়।

অন্যদিকে, বিধায়ক হুমায়ুন কবীর দুটি আসন থেকে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর একটি আসন ছেড়ে দেওয়ায় রেজিনগর আসনটিও খালি হয়। দুই আসনেই ৬ অক্টোবর ভোটগ্রহণ এবং ৯ অক্টোবর ফল ঘোষণা হওয়ার কথা রয়েছে।

হাসিরানি রথকে প্রার্থী করার পর নন্দীগ্রামের নির্বাচন আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। চন্দ্রনাথ রথ শুভেন্দু অধিকারীর ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং দীর্ঘদিন তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ করেছিলেন। নির্বাচনের ফল ঘোষণার দুই দিন পর তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। তাঁর হত্যাকাণ্ডের তদন্ত বর্তমানে CBI করছে। ফলে হাসিরানি রথের নির্বাচনে অংশগ্রহণের কারণে এই বিষয়টিও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে আসতে পারে। তবে হত্যাকাণ্ডের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই সামনে আসবে।

প্রার্থিতা ঘোষণার পর হাসিরানি রথ নির্বাচনে লড়াইয়ের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন। রিপোর্ট অনুযায়ী, তিনি স্থানীয় মন্দিরে গিয়ে পুজোও করেছেন এবং নন্দীগ্রামের মানুষের জন্য কাজ করার কথা বলেছেন। তিনি শুভেন্দু অধিকারীর এলাকায় করা কাজের প্রশংসা করে দলের সমর্থন নিয়ে নির্বাচনে লড়াই করার আস্থা প্রকাশ করেছেন। তাঁর নাম ঘোষণার পর বিজেপি কর্মীদের মধ্যেও নির্বাচনী তৎপরতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

নন্দীগ্রামের রাজনৈতিক গুরুত্ব শুধু একটি বিধানসভা আসন হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একটি বড় রাজনৈতিক সংঘর্ষের প্রতীক হয়ে রয়েছে। শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক ভিত্তির সঙ্গেও নন্দীগ্রামের সম্পর্ক রয়েছে। তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীর পরিবারের সদস্য হাসিরানি রথকে প্রার্থী করে বিজেপি একদিকে স্থানীয় আবেগকে গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেছে, অন্যদিকে শুভেন্দু অধিকারীর প্রভাবকেও নির্বাচনী লড়াইয়ে কাজে লাগানোর ইঙ্গিত দিয়েছে।

তৃণমূল কংগ্রেস নন্দীগ্রাম থেকে সঞ্চিতা প্রধান দে এবং রেজিনগর থেকে রবি-উল আলম চৌধুরীকে প্রার্থী করেছে। নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্বাচনে লড়ার জল্পনাও ছিল। তবে দলের পক্ষ থেকে প্রার্থী ঘোষণা হওয়ার পর সেই আলোচনা থেমে গেছে। এখন নন্দীগ্রামে বিজেপি ও তৃণমূলের প্রার্থীরা সরাসরি মুখোমুখি হবেন।

লড়াই শুধু বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। তৃণমূলের অভ্যন্তরে তৈরি একটি বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠীও দুই আসনে প্রার্থী দিয়েছে। ওই গোষ্ঠী নন্দীগ্রাম থেকে মোহাম্মদ এতেশামুল হক এবং রেজিনগর থেকে সফিউজ্জামান শেখকে প্রার্থী করেছে। এর ফলে নির্বাচনী লড়াই বহুমুখী হতে পারে। নন্দীগ্রামে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীর প্রার্থীরা মাঠে থাকায় ভোট ভাগাভাগির প্রভাবও ফলাফলে পড়তে পারে।

বিজেপির কাছে নন্দীগ্রাম আসনটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দলটি এই এলাকায় নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে চায়। শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর নন্দীগ্রামের রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বেড়েছে। তাঁর ছেড়ে দেওয়া আসনে উপনির্বাচনে দলের ফলাফলকে তাঁর প্রভাব এবং বিজেপির সাংগঠনিক শক্তির সঙ্গেও দেখা হবে। হাসিরানি রথের প্রার্থিতার ফলে নির্বাচনে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আবেগের বিষয়টিও যুক্ত হয়েছে।

অন্যদিকে, এই আসনে বিজেপির প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করার দায়িত্ব তৃণমূলের সামনে। দলটি স্থানীয় প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান দেকে মাঠে নামিয়েছে। ফলে আগামী দিনে দুই দলের প্রচারাভিযান জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নন্দীগ্রামের ভোটারদের সমর্থন পেতে উন্নয়ন, স্থানীয় সমস্যা, আইনশৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক হিংসার মতো বিষয় নির্বাচনী আলোচনার অংশ হতে পারে।

রেজিনগরেও লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। বিজেপি সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করা শাশ্বর সরকারকে প্রার্থী করেছে। অন্যদিকে তৃণমূল রবি-উল আলম চৌধুরীকে প্রার্থী করেছে। এর পাশাপাশি বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠীর উপস্থিতিও এই আসনের নির্বাচনী সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে। মুর্শিদাবাদ অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে রেজিনগরের লড়াইও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে প্রার্থীদের ছবি এখন অনেকটাই স্পষ্ট। বিজেপির হাসিরানি রথের প্রার্থিতাই সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে। তাঁর ছেলে চন্দ্রনাথ রথের হত্যাকাণ্ডের তদন্ত এখনও CBI-এর হাতে রয়েছে। এই বিষয়টি নির্বাচনী আলোচনায় কতটা প্রভাব ফেলে, তা আগামী দিনে স্পষ্ট হবে। বিজেপি বিষয়টিকে আবেগের পাশাপাশি ন্যায়বিচার ও স্থানীয় প্রতিনিধিত্বের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, অন্যদিকে বিরোধীদের পক্ষ থেকেও এ নিয়ে পৃথক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া আসতে পারে।

নির্বাচন কমিশনের কর্মসূচি অনুযায়ী ৬ অক্টোবর ভোটগ্রহণ এবং ৯ অক্টোবর গণনার পর ফল প্রকাশ হবে। মনোনয়ন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর নির্বাচনী প্রচার আরও জোরদার হবে। দুই প্রধান দলই তাদের প্রার্থীদের সমর্থনে প্রবীণ নেতাদের মাঠে নামাতে পারে। নন্দীগ্রামে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কারণ তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় এই এলাকার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

এই উপনির্বাচনে বিজেপির সামনে নিজেদের প্রভাব ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ রয়েছে, অন্যদিকে তৃণমূল নন্দীগ্রামকে নিজেদের রাজনৈতিক প্রভাবের আওতায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবে। তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ এবং পৃথক প্রার্থীদের উপস্থিতি নির্বাচনী লড়াইকে আরও জটিল করতে পারে। ফলে ৬ অক্টোবরের ভোট শুধু দুই প্রার্থীর মধ্যে লড়াই নয়, পশ্চিমবঙ্গের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও স্থানীয় সমীকরণেরও পরীক্ষা হতে চলেছে।

বিজেপির প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পর নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর—দুই আসনেই নির্বাচনী তৎপরতা বেড়েছে। নন্দীগ্রামে হাসিরানি রথ এবং রেজিনগরে শাশ্বর সরকারের নাম ঘোষণা করে বিজেপি তাদের নির্বাচনী অবস্থান স্পষ্ট করেছে। এখন মনোনয়ন, প্রচারাভিযান এবং ভোটের দিন ভোটারদের অবস্থানের দিকে নজর থাকবে। বিশেষ করে শুভেন্দু অধিকারীর প্রয়াত PA-এর মাকে প্রার্থী করার পর নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের অন্যতম আলোচিত আসনে পরিণত হয়েছে।

Leave a comment