অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জেড-প্লাস নিরাপত্তা কমানো নিয়ে রাজ্যের রিপোর্ট তলব কলকাতা হাইকোর্টের

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জেড-প্লাস থেকে এক্স শ্রেণির নিরাপত্তা কমানোর ভিত্তি ও পরবর্তী নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিস্তারিত রিপোর্ট চেয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট। মামলার পরবর্তী শুনানি ১৩ অক্টোবর।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জেড-প্লাস নিরাপত্তা কমানো নিয়ে রাজ্যের রিপোর্ট তলব কলকাতা হাইকোর্টের
Photo Credit / Attribution: Google

কলকাতা। তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিরাপত্তা জেড-প্লাস থেকে কমিয়ে এক্স শ্রেণিতে নামানোর সিদ্ধান্তের বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে বিস্তারিত রিপোর্ট চেয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট। মঙ্গলবার মামলার শুনানিতে বিচারপতি কৃষ্ণ রাও নিরাপত্তা কমানোর ভিত্তি, তার পর সাংসদের পক্ষ থেকে জানানো কথিত হামলার ঘটনা এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগের বিষয়ে রাজ্য সরকারের কাছে একাধিক প্রশ্ন করেন। আদালত বিশেষভাবে জানতে চায়, নিরাপত্তা কমানোর পর অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর গুরুতর হামলা হলে তার দায় কার ওপর বর্তাবে। মামলার পরবর্তী শুনানি ১৩ অক্টোবর।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দায়ের করা আবেদনের ভিত্তিতে মামলাটি চলছে। তাঁর পক্ষ থেকে নিরাপত্তা কভার কমানোর সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। আবেদনের শুনানিতে তাঁর আইনজীবীরা জানান, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আগে জেড-প্লাস নিরাপত্তা পেতেন। মে মাসে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের পর তাঁর নিরাপত্তা এক্স শ্রেণিতে নামানো হয়। আইনজীবীদের দাবি, নিরাপত্তা কমানোর পর তাঁকে একাধিকবার কথিতভাবে নিশানা করা হয়েছে এবং নিরাপত্তা নিয়ে সরকারের কাছে অনুরোধও জানানো হয়েছিল।

শুনানিতে বিচারপতি কৃষ্ণ রাও নিরাপত্তা কমানোর প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য পরিণতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, পাথর ছোড়ার ঘটনাকে কেউ সাধারণ অপরাধ হিসেবে দেখতে পারেন, কিন্তু একই পাথর কারও শরীরে আঘাত করলে তার পরিণতি গুরুতর হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে আদালত জানতে চায়, নিরাপত্তা কভার কমানোর পর সাংসদের নিরাপত্তা ফের পর্যালোচনা করা হয়েছিল কি না এবং নিরাপত্তা নিয়ে তাঁর পক্ষ থেকে জানানো উদ্বেগের ভিত্তিতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনজীবী আদালতকে জানান, ২০১৬ সাল থেকে তিনি জেড-প্লাস নিরাপত্তা পেয়ে আসছেন। তাঁর পক্ষের দাবি, ২০২৪ সালে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের করা হুমকি মূল্যায়নের পরও তাঁকে দেশজুড়ে জেড-প্লাস নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছিল। মে মাসে নিরাপত্তা কভার কমানোর আগে কী ভিত্তিতে হুমকি মূল্যায়ন করা হয়েছিল এবং সেই সিদ্ধান্তের আদেশ বা কারণ তাঁকে জানানো হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।

আবেদনকারীর আইনজীবীর বক্তব্য, নিরাপত্তা কমানোর আগে হুমকি মূল্যায়ন করা প্রয়োজন ছিল। তাঁর যুক্তি ছিল, কোনও ব্যক্তির নিরাপত্তা দীর্ঘদিন ধরে নির্দিষ্ট স্তরে থাকলে তা কমানোর আগে সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা মূল্যায়ন এবং পরিস্থিতি স্পষ্ট করা উচিত। তিনি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কাছ থেকেও রিপোর্ট চাওয়ার আবেদন জানান, যাতে নিরাপত্তা কমানোর সিদ্ধান্তের ভিত্তি স্পষ্ট হয়।

কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল ধীরজ ত্রিবেদী ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কোনও ব্যক্তির নিরাপত্তার প্রয়োজন এবং হুমকির মূল্যায়ন রাজ্য পুলিশের মাধ্যমে করা হয়, কারণ আইনশৃঙ্খলা রাজ্যের আওতাধীন বিষয়। তিনি মে মাসে সোনারপুরে ঘটে যাওয়া কথিত ঘটনার উল্লেখ করে বলেন, সেখানে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে লক্ষ্য করে ডিম ছোড়ার ঘটনা সামনে এসেছিল। তবে উপলব্ধ হাসপাতালের রিপোর্টে এমন গুরুতর আঘাতের উল্লেখ ছিল না, যার কারণে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করার প্রয়োজন হয়েছিল।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে আদালতকে জানানো হয়, পুলিশের বিশেষ শাখার নিরাপত্তা মূল্যায়ন রিপোর্টে কলকাতা পুলিশের আওতাধীন এলাকায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য কোনও বিশেষ হুমকির কথা পাওয়া যায়নি। রাজ্য সরকারের আইনজীবী জানান, ওই মূল্যায়নের ভিত্তিতেই নিরাপত্তা এক্স শ্রেণিতে নামানো হয়েছিল। সরকার আরও জানায়, ২৯ মে একটি বিস্তারিত রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছিল। হাইকোর্ট এখন রাজ্য সরকারকে পুরো বিষয়টির বিস্তারিত বিবরণ হলফনামা আকারে জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

মে মাসের শেষ দিকে দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সফরের সময় কথিত বিক্ষোভ ও দুর্ব্যবহারের ঘটনার পর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন আরও সামনে আসে। ওই ঘটনায় পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেফতারও করেছিল। উপলব্ধ রিপোর্ট অনুযায়ী, ভিডিও ফুটেজের ভিত্তিতে পাঁচজনকে গ্রেফতার করা এবং আরও দু’জনকে জিজ্ঞাসাবাদের তথ্য পুলিশ জানিয়েছিল।

সোনারপুরের ঘটনার পর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, ওই সময় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে কিছু বস্তু ছোড়া হয়েছিল এবং তাঁর সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি বা হামলার চেষ্টার অভিযোগ সামনে এসেছিল। ঘটনার পর পুলিশ স্তরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনার বিষয়েও আলোচনা হয়। তবে ঘটনার কারণ এবং দায় নিয়ে পৃথক দাবি রয়েছে। আদালতে চলা শুনানিতে এই বিষয়গুলো প্রমাণের ভিত্তিতে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

মামলায় হাইকোর্টের সামনে মূল প্রশ্নগুলোর একটি হল, নিরাপত্তা কভার কমানোর সিদ্ধান্ত কোন হুমকি মূল্যায়নের ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছিল এবং পরবর্তী ঘটনাগুলোর পর নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুনরায় পর্যালোচনা করা হয়েছিল কি না। আদালত এই বিষয়ে রাজ্য সরকারের কাছে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে। এখনও নিরাপত্তা নিয়ে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি আদালত; বরং রাজ্যকে তার অবস্থান এবং সংশ্লিষ্ট নথি পেশ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

১৩ অক্টোবর মামলার পরবর্তী শুনানিতে রাজ্য সরকারকে নিরাপত্তা কমানোর সঙ্গে সম্পর্কিত বিস্তারিত রিপোর্ট আদালতে পেশ করতে হবে। রিপোর্টে নিরাপত্তা মূল্যায়ন, নিরাপত্তা কমানোর ভিত্তি, সংশ্লিষ্ট আদেশের অবস্থা এবং পরবর্তী সময়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষ থেকে জানানো নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগের ভিত্তিতে নেওয়া পদক্ষেপের তথ্য থাকবে।

শুনানিতে জেড-প্লাস এবং এক্স শ্রেণির নিরাপত্তার পার্থক্য নিয়েও আলোচনা হয়। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনজীবী আদালতকে জানান, এক্স শ্রেণির নিরাপত্তা ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে সীমিত, অন্যদিকে জেড-প্লাস স্তরে বেশি সংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী এবং ব্যক্তির পাশাপাশি তাঁর বাসভবন ও দফতরের নিরাপত্তার জন্য বিস্তৃত ব্যবস্থা থাকে। তবে কোনও ব্যক্তিকে কোন স্তরের নিরাপত্তা দেওয়া হবে, তা হুমকি মূল্যায়ন এবং সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা প্রোটোকলের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়।

মামলায় আদালতের বর্তমান অবস্থান নিরাপত্তার পর্যাপ্ততা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলার মধ্যে সীমাবদ্ধ। হাইকোর্ট এখনও বলেনি যে নিরাপত্তা কমানোর সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। আদালত সিদ্ধান্তের ভিত্তি, সংশ্লিষ্ট নথি এবং পরবর্তী পরিস্থিতি সম্পর্কে রাজ্য সরকারের কাছে তথ্য চেয়েছে। ফলে রাজ্যের রিপোর্ট এবং পরবর্তী শুনানির পরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত অবস্থান স্পষ্ট হবে।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিরাপত্তার বিষয়টি পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হলেও আদালতে এর বিচার হচ্ছে নিরাপত্তা মূল্যায়ন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে। আবেদনকারী পক্ষ নিরাপত্তা কমানোর পর ঘটে যাওয়া কথিত ঘটনাগুলোর উল্লেখ করে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার দাবি করছে। অন্যদিকে রাজ্য সরকারের বক্তব্য, নিরাপত্তা পর্যালোচনার পরই শ্রেণি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আদালতের সামনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, কোনও সুরক্ষাপ্রাপ্ত ব্যক্তির নিরাপত্তা কমানোর পর তাঁর ওপর হামলা হলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কোন স্তরে নির্ধারিত হবে। এই প্রেক্ষাপটে হাইকোর্ট রাজ্য সরকারকে সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া, হুমকি মূল্যায়ন এবং পরবর্তী পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ তথ্য পেশ করতে বলেছে। ১৩ অক্টোবর রাজ্যের রিপোর্ট পেশের পর নিরাপত্তা কমানোর সিদ্ধান্তের ভিত্তি এবং কথিত ঘটনাগুলোর পর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কী পরিবর্তন করা হয়েছিল, তা আরও স্পষ্ট হতে পারে।

Leave a comment