সাওনের মাসে লাখো ভক্ত ভগবান শিবের দর্শন ও জলাভিষেকের জন্য বাবা ধামের উদ্দেশে যাত্রা করেন। সেই ভক্তদের ভিড়ে বারাণসীর দীপক ও তাঁর দিব্যাঙ্গ বন্ধুর যাত্রা গত প্রায় ৮ বছর ধরে বন্ধুত্ব ও আস্থার একটি বিশেষ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। এবারও দীপক তাঁর দিব্যাঙ্গ বন্ধুকে কাঁধে বসিয়ে প্রায় ১০৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদযাত্রায় বেরিয়েছেন।
দীপক বারাণসী থেকে এই যাত্রা শুরু করেছেন। তাঁর উদ্দেশ্য শুধু বাবা বৈদ্যনাথের দর্শন করা নয়, বরং তাঁর সেই বন্ধুর ইচ্ছা পূরণ করা, যিনি দিব্যাঙ্গ হওয়ার কারণে নিজে হেঁটে এত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে পারেন না। বন্ধুর ইচ্ছাকে নিজের দায়িত্ব হিসেবে নিয়ে দীপক প্রতি বছর তাঁকে কাঁধে বসিয়ে বাবা ধামের উদ্দেশে যাত্রা করেন।
এই যাত্রায় দীপকের বন্ধু তাঁর কাঁধে বসে পথ পাড়ি দেন এবং দীপক নিয়মিত হেঁটে এগিয়ে যান। ১০৫ কিলোমিটার দূরত্বের পাশাপাশি একজন ব্যক্তিকে কাঁধে বসিয়ে এই পথ অতিক্রম করা তাঁর জন্য অতিরিক্ত শারীরিক চ্যালেঞ্জ। গরম, বৃষ্টি, ক্লান্তি, পায়ের ব্যথা এবং দীর্ঘ সময় হাঁটার মতো পরিস্থিতির মধ্যেও দীপক বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চলেন।
প্রায় ৮ বছর আগে দীপকের দিব্যাঙ্গ বন্ধু বাবা ধামে গিয়ে ভগবান শিবের দর্শন করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন বলে জানা যায়। তাঁর শারীরিক অবস্থার কারণে নিজে দীর্ঘ পদযাত্রা করা সম্ভব ছিল না। এরপর দীপক তাঁর বন্ধুর ইচ্ছা পূরণের সিদ্ধান্ত নেন। সেই সময় থেকে এই যাত্রা দুজনের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে।
প্রতি সাওনে যখন কাঁওয়ারিয়ারা বাবা বৈদ্যনাথের দর্শনের জন্য বের হন, দীপকও বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে যাত্রা শুরু করেন। তাঁদের যাত্রার পদ্ধতি আলাদা হলেও উদ্দেশ্য একই—বাবার দরবারে পৌঁছানো এবং বন্ধুর মনোকামনা পূরণ করা।
এবারও দীপক বন্ধুকে কাঁধে বসিয়ে যাত্রা শুরু করলে পথে তাঁদের দিকে বহু মানুষের নজর পড়ে। অনেক ভক্ত তাঁদের বন্ধুত্বের প্রশংসা করেন। কেউ কেউ এটিকে বন্ধুত্ব ও সমর্পণের দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেন। যাত্রাপথে তাঁদের সঙ্গে দেখা হওয়া মানুষজন তাঁদের সাহায্যও করেন এবং এগিয়ে যাওয়ার জন্য উৎসাহ দেন।
বাবা ধামের উদ্দেশে যাত্রা করা ভক্তরা সাধারণত কয়েক দিন ধরে হেঁটে পথ পাড়ি দেন এবং সীমিত সামগ্রী সঙ্গে রাখেন। দীপকের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ আরও বেশি, কারণ তাঁকে পুরো যাত্রায় বন্ধুকেও সামলাতে হয়। বিশ্রামের সময় বন্ধুর দেখাশোনা করতে হয় এবং যাত্রা পুনরায় শুরু হলে তাঁকে কাঁধে বসিয়ে এগিয়ে যেতে হয়।
১০৫ কিলোমিটারের এই যাত্রা শারীরিকভাবে কঠিন হতে পারে। দীর্ঘ সময় ওজন বহন করে হাঁটার কারণে কাঁধ, পিঠ ও পায়ে চাপ পড়ে। তা সত্ত্বেও দীপক প্রতি বছর এই যাত্রা সম্পন্ন করার চেষ্টা করেন। তাঁর এই যাত্রার প্রধান উদ্দেশ্য বন্ধুর ইচ্ছা পূরণ করা।
দীপকের বন্ধুর জন্যও এই যাত্রা গুরুত্বপূর্ণ। দিব্যাঙ্গতার কারণে তিনি একা এ ধরনের যাত্রা করতে পারেন না। দীপকের সহায়তায় তিনি কাঁধে বসে বাবা ধামে পৌঁছানোর ইচ্ছা পূরণের পথে রয়েছেন।
সাওনে বাবা বৈদ্যনাথ ধামে যাওয়া কাঁওয়ারিয়াদের ভিড় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসে। বারাণসী ও পূর্বাঞ্চলের বহু ভক্তও এই ধর্মীয় যাত্রায় অংশ নেন। সেই ভিড়ের অংশ দীপক ও তাঁর বন্ধুও। তবে তাঁদের যাত্রার ধরন অন্যদের থেকে আলাদা।
যাত্রাপথে তাঁদের দেখে অনেক কাঁওয়ারিয়া থেমে কথা বলেন। কেউ তাঁদের বন্ধুত্বের বিষয়ে জানতে চান, আবার কেউ দীপকের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন। দীপক গত ৮ বছর ধরে বন্ধুর বাবা ধামে যাওয়ার ইচ্ছা পূরণের জন্য এই কঠিন যাত্রা করে আসছেন।
এই যাত্রায় দীপক তাঁর বন্ধুর দিব্যাঙ্গতাকে যাত্রার বাধা হিসেবে না দেখে নিজেই তাঁর হয়ে পথ চলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বন্ধুর পা দীর্ঘ পদযাত্রার জন্য সক্ষম না হলেও দীপকের পদক্ষেপ তাঁকে বাবা ধামের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
দুজনের এই যাত্রায় আস্থাও বজায় রয়েছে। পথে ভগবান শিবের জয়ধ্বনি, কাঁওয়ারিয়াদের ভিড় এবং সাওনের পরিবেশ তাঁদের যাত্রা অব্যাহত রাখতে সহায়তা করছে। দীপকের লক্ষ্য হলো বন্ধুকে নিয়ে বাবা ধামে পৌঁছানো এবং তাঁকে ভগবান শিবের দর্শন করানো।
গত ৮ বছর ধরে চলা এই যাত্রা দুজনের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করেছে। প্রতি বছর সাওন এলে তাঁদের যাত্রার প্রস্তুতি শুরু হয়। এবারও তাঁরা বারাণসী থেকে বাবা ধামের দিকে রওনা হয়েছেন।
এখন তাঁদের লক্ষ্য ১০৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বাবা বৈদ্যনাথের দরবারে পৌঁছানো। যাত্রাপথে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ এলেও দীপক বন্ধুকে কাঁধে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। বারাণসী থেকে বাবা ধাম পর্যন্ত এই ১০৫ কিলোমিটারের যাত্রা তাঁদের কাছে শুধু ধর্মীয় আস্থার পথ নয়; এটি ৮ বছর ধরে চলে আসা বন্ধুত্ব ও বন্ধুর ইচ্ছা পূরণের দায়িত্বেরও প্রতিফলন।












