দিল্লির কালকাজি এলাকার আস্থা কুঞ্জ পার্কে ২১ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ১৭ বছর বয়সি এক নাবালিকার সঙ্গে কথিত গণধর্ষণের ঘটনায় তিন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তে ৩০০টিরও বেশি CCTV ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখা হয়েছে এবং নাবালিকার দেখানো ঘটনাস্থলগুলি থেকে জৈবিক ও অন্যান্য ফরেনসিক প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে।
পুলিশের দাবি, অভিযুক্তরা নিজেদের পুলিশকর্মী পরিচয় দিয়ে নাবালিকা এবং তার ১৭ বছর বয়সি বন্ধুকে থামিয়েছিল। এরপর দুজনকে আলাদা করে হুমকি দেওয়া হয় এবং নাবালিকাকে পার্কের একটি নির্জন অংশে নিয়ে যাওয়া হয়।
পুলিশ অভিযুক্তদের আসিফ, হেমন্ত এবং মহেশ হিসেবে শনাক্ত করেছে। তবে কিছু প্রাথমিক প্রতিবেদনে তৃতীয় অভিযুক্তের নাম মুকেশ বলা হয়েছিল। পরবর্তী পুলিশি তদন্ত ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে নাম নিয়ে পার্থক্য দেখা দিয়েছে। ফলে সরকারি রেকর্ডের ভিত্তিতে নামের নিশ্চিতকরণ গুরুত্বপূর্ণ।
তিন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের পর বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ তাদের মোবাইল ফোন, যোগাযোগ এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত প্রমাণ পরীক্ষা করছে, যাতে ঘটনার আগে ও পরে তাদের গতিবিধির সম্পূর্ণ ধারাবাহিকতা নির্ধারণ করা যায়।
তদন্তের সময় আস্থা কুঞ্জ পার্ক এবং আশপাশের এলাকায় থাকা ৩০০টিরও বেশি CCTV ক্যামেরার ফুটেজ পরীক্ষা করা হয়েছে। কর্মকর্তাদের মতে, ফুটেজ এবং অন্যান্য সূত্রের ভিত্তিতে প্রাথমিকভাবে প্রায় ২০ জনকে শনাক্ত করা হয়। পরে প্রযুক্তিগত নজরদারি এবং স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত তথ্যের মাধ্যমে অভিযুক্তদের কাছে পৌঁছায় পুলিশ।
তবে তদন্তে পার্কের ভেতরের সংশ্লিষ্ট অংশে CCTV কভারেজ এবং আলোর ঘাটতির বিষয়টিও সামনে এসেছে। পুলিশ পার্কের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, নিরাপত্তারক্ষীদের মোতায়েন এবং টহল সংক্রান্ত বিষয়ও খতিয়ে দেখা শুরু করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘটনার সময় ঘটনাস্থলের আশপাশে কোনো নিরাপত্তারক্ষী ছিল না।
পুলিশের মতে, নাবালিকা অভিযুক্তদের পোশাক, শারীরিক গঠন, নাম বা ডাকনাম এবং পালানোর পথ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছিল। এসব তথ্য অভিযুক্তদের শনাক্ত করতে তদন্তকারীদের সহায়তা করে।
পরে নাবালিকা পুলিশ ও ফরেনসিক দলের সঙ্গে আস্থা কুঞ্জ পার্কে গিয়ে কথিত ঘটনার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন স্থান শনাক্ত করে। তদন্তকারীরা সেখান থেকে জৈবিক ও অন্যান্য ফরেনসিক প্রমাণ সংগ্রহ করেছেন। পুলিশ DNA প্রোফাইলিং এবং অন্যান্য ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছে।
অভিযুক্তদের আগে কোনো অন্য অপরাধমূলক ঘটনার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযুক্তরা এর আগে পার্কে আসা অন্য কোনো ব্যক্তিকে হয়রানি বা নিশানা করেছিল কি না, তদন্তের সেই দিকটিও পরীক্ষা করা হচ্ছে।
পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, ২১ সেপ্টেম্বর জন্মদিন উপলক্ষে নাবালিকা তার ১৭ বছর বয়সি বন্ধুর সঙ্গে কালকাজি মন্দিরে গিয়েছিল। মন্দিরে পুজো দেওয়ার পর দুজনে কালকাজি মেট্রো স্টেশনের বাইরে চিপস এবং জল কিনেছিল।
এরপর দুজনে আস্থা কুঞ্জ পার্কের ৭ নম্বর গেট দিয়ে ঢোকে। তারা একটি বেঞ্চে বসে থাকার সময় তিন অভিযুক্ত কথিতভাবে তাদের কাছে আসে। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্তরা নিজেদের পুলিশকর্মী পরিচয় দিয়ে দুজনকে হুমকি দিতে শুরু করে।
অভিযুক্তরা কথিতভাবে নাবালিকা ও তার বন্ধুর বিরুদ্ধে ভুল কাজের অভিযোগ তোলে এবং পুলিশি পদক্ষেপের ভয় দেখায়। এরপর নাবালিকাকে তার বন্ধুর কাছ থেকে আলাদা করে পার্কের একটি নির্জন অংশে নিয়ে যাওয়া হয়।
পুলিশের মতে, নাবালিকা অভিযোগে জানিয়েছে, অভিযুক্তদের একজন কথিতভাবে বন্দুক দেখায় এবং পরে ছুরি দিয়ে তাকে হুমকি দেয়। পুলিশের দাবি, তিন অভিযুক্ত বিভিন্ন স্থানে নাবালিকার সঙ্গে কথিতভাবে ধর্ষণ করে। ঘটনার সময় একজন অভিযুক্ত কথিতভাবে নজরদারি করছিল এবং অন্যজন নাবালিকাকে হুমকি দিচ্ছিল।
পুলিশ জানিয়েছে, কথিত ঘটনার পর তিন অভিযুক্ত নাবালিকা ও তার বন্ধুকে কাউকে ঘটনা জানালে গুরুতর পরিণতির হুমকি দেয়। এরপর তাদের মোবাইল ফোন ফিরিয়ে দিয়ে দুজনকে পার্ক থেকে বেরিয়ে যেতে দেওয়া হয়।
ঘটনার পর নাবালিকা তার বন্ধুকে পুরো বিষয়টি জানায়। এরপর বন্ধু পুলিশ কন্ট্রোল রুমে ফোন করে। রাত প্রায় ৮টা ৪৫ মিনিটে PCR কল পাওয়ার পর পুলিশ দল পার্কের ৭ নম্বর গেটের কাছে পৌঁছায়।
অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশ একাধিক দল গঠন করেছিল। কর্মকর্তাদের মতে, আমর কলোনি এলাকায় আসিফকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করার সময় সে কথিতভাবে পুলিশ দলের দিকে গুলি চালায়। পুলিশের দাবি, পাল্টা পদক্ষেপে তার পায়ে গুলি লাগে এবং এরপর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এরপর প্রযুক্তিগত তদন্ত এবং CCTV ফুটেজের সাহায্যে অন্য দুই অভিযুক্তকেও গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ তিন অভিযুক্তের মোবাইল ফোন এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত প্রমাণ তদন্তের আওতায় নিয়েছে।
ঘটনার পর আস্থা কুঞ্জ পার্কের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও তদন্তের আওতায় এসেছে। পুলিশের মতে, পার্কটি বড় এবং বেশ কয়েকটি জায়গায় এর সীমানা প্রাচীর ভাঙা রয়েছে। কিছু প্রবেশপথে নিরাপত্তারক্ষী নেই এবং একাধিক অংশে পর্যাপ্ত আলোর অভাব রয়েছে।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, কথিত ঘটনা যেখানে ঘটেছে, সেই অংশে CCTV কভারেজ সীমিত ছিল। পার্কে নিরাপত্তারক্ষীদের মোতায়েন এবং নিয়মিত টহলের ব্যবস্থা কী ছিল, পুলিশ এখন তা খতিয়ে দেখছে।
ঘটনাটি এমন সময় সামনে এসেছে, যখন সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ দিল্লিতে নাবালকদের বিরুদ্ধে যৌন অপরাধের একাধিক ঘটনা রিপোর্ট হয়েছে। India Today-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আস্থা কুঞ্জ পার্কের ঘটনা দুই সপ্তাহের মধ্যে দিল্লিতে নাবালিকার বিরুদ্ধে যৌন হামলার চতুর্থ রিপোর্টেড ঘটনা ছিল। এর মধ্যে ৬ বছর বয়সি এক শিশুর সঙ্গে ধর্ষণ এবং ১৭ বছর বয়সি এক নাবালিকাকে ঘিরে আরেকটি গুরুতর ঘটনার উল্লেখ রয়েছে।
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, NCRB-এর ২০২৪ সালের পরিসংখ্যানে দিল্লিতে POCSO আইনের অধীনে ১,৫৫৩টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছিল, অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন চারটিরও বেশি মামলা। ২০২৫ সালের NCRB রিপোর্ট এখনও উপলব্ধ নয়। এই ধরনের পরিসংখ্যান নথিভুক্ত মামলার ভিত্তিতে তৈরি এবং প্রকৃত ঘটনার সম্পূর্ণ সংখ্যা তা অনিবার্যভাবে নির্দেশ করে না।
দিল্লি পুলিশ এখন ফরেনসিক রিপোর্ট, DNA প্রোফাইলিং, CCTV ফুটেজ, মোবাইল ফোন এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত প্রমাণ একত্র করে তদন্ত চালাচ্ছে। অভিযুক্তদের মধ্যে প্রত্যেকের ভূমিকা কী ছিল এবং ঘটনার আগে ও পরে তাদের গতিবিধি কী ছিল, তাও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
নাবালিকা ভুক্তভোগীর পরিচয় আইন অনুযায়ী প্রকাশ করা হয়নি। মামলায় উত্থাপিত অভিযোগের বিচারিক প্রক্রিয়া এখনও চলমান এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত দোষসিদ্ধি আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।










