কংগ্রেস নেতা এবং লোকসভায় বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ নির্বাচন কমিশন এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার (CEC) জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তোলেন। প্রায় ৫৫ মিনিটের সাংবাদিক বৈঠকে তিনি দাবি করেন, নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং ভোটার তালিকায় কারচুপির মাধ্যমে বিরোধীদের বিরুদ্ধে ‘ভোট চুরি’ হয়েছে। এই অভিযোগগুলি রাহুল গান্ধীর রাজনৈতিক দাবি; এগুলিকে স্বাধীনভাবে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না।
রাহুল গান্ধী জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেন এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহেরও তদন্ত হওয়া উচিত বলে জানান। তিনি বলেন, জ্ঞানেশ কুমারের নিয়োগের সময় তিনি তার বিরোধিতা করেছিলেন। অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশন SIR-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলির আইনি ভিত্তি রয়েছে বলে জানিয়েছে এবং কমিশনের অভ্যন্তরীণ মন্তব্য ও মতপার্থক্যকে স্বাভাবিক প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
রাহুল গান্ধী সাংবাদিক বৈঠকে নির্বাচন কমিশন, Special Intensive Revision (SIR) এবং ভোটার তালিকা-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন। তিনি অভিযোগ করেন, লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে এবং সেই কারণেই ক্ষমতাসীন বিজেপিকে সাধারণ অ্যান্টি-ইনকামবেন্সির মুখে পড়তে হয়নি।
নিজের অভিযোগের সমর্থনে তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং অন্যান্য নেতার ছবি ও পুরনো প্রকাশ্য বিবৃতি দেখান। রাহুল বলেন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
তবে নির্বাচনে ‘ভোট চুরি’ বা ব্যাপক কারচুপির অভিযোগকে তথ্যগতভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পৃথক প্রমাণ এবং সরকারি তদন্তের প্রয়োজন হবে। উপলব্ধ রিপোর্টিংয়ে এগুলিকে রাহুল গান্ধীর অভিযোগ হিসেবেই উল্লেখ করা হয়েছে।
রাহুল গান্ধী CEC জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ‘ভোট চুরি’, ‘আইন চুরি’ এবং ‘প্রতিষ্ঠান চুরি’-র মতো অভিযোগ তোলেন। তিনি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং কথিত অনিয়মের তদন্তে সহযোগিতা করার দাবি জানান।
তিনি বলেন, দেশে সরকারের বিরুদ্ধে অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি একটি সাধারণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। উদাহরণ হিসেবে তিনি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নির্বাচনী ফলাফলের উল্লেখ করেন এবং প্রশ্ন তোলেন, বিজেপি ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ক্ষেত্রেও একই ধরনের অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কেন দেখা যায়নি।
রাহুল এর কারণ হিসেবে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কথিত অনিয়মকে উল্লেখ করেন। এটি তাঁর রাজনৈতিক অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন বা কোনও বিচারবিভাগীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্ত নয়।
সাংবাদিক বৈঠকে রাহুল গান্ধী বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে তাঁর সন্দেহ ছিল। তিনি জানান, ২০২৫ সালে SIR নিয়ে তিনি একাধিক সাংবাদিক বৈঠক করেছিলেন এবং তখনও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা-সংক্রান্ত অভিযোগ তুলেছিলেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কিছু নির্বাচনের সময় প্রযুক্তিগত ও নির্বাচনী তথ্য বিশ্লেষণের পর তাঁর সন্দেহ আরও বাড়ে। এরপর বিরোধীরা বিষয়টি প্রকাশ্যে তুলে ধরতে শুরু করে।
তিনি আরও বলেন, বিরোধী দলগুলি এই ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ এবং সংবিধান ও নির্বাচনী প্রক্রিয়া-সংক্রান্ত প্রশ্ন নিয়ে তারা একসঙ্গে কাজ করবে।
Special Intensive Revision বা SIR হল ভোটার তালিকার ব্যাপক পর্যালোচনা ও সংশোধনের একটি প্রক্রিয়া। নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা আপডেট করা এবং যোগ্য ভোটারদের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য এই প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়েছে।
The Indian Express-এর তদন্ত অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুনে বিহার থেকে শুরু হওয়া SIR পরে ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পৌঁছায় এবং ড্রাফট ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটির বেশি নাম বাদ দেওয়া হয়। এই সংখ্যা ড্রাফট রোল থেকে বাদ পড়া নামের সঙ্গে সম্পর্কিত; এটিকে নিজে থেকেই স্থায়ীভাবে ভোটাধিকার বাতিল হওয়ার সমতুল্য ধরা যায় না।
SIR নিয়ে বিতর্ক মূলত নাম যাচাই, নথিপত্রের প্রক্রিয়া, নতুন ভোটারদের নিবন্ধন এবং ভোটার ডেটাবেসের প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা ঘিরে।
The Indian Express-এর ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশী গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার নির্বাচন কমিশনের কিছু সিদ্ধান্ত ও নির্দেশের বিরুদ্ধে লিখিত আপত্তি জানান। রিপোর্ট অনুযায়ী, তাঁরা কয়েকটি পদক্ষেপকে ‘অননুমোদিত’ এবং ‘অবৈধ’ বলে উল্লেখ করেন এবং অভিযোগ করেন যে তাঁদের না জানিয়েই কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এগুলি দুই নির্বাচন কমিশনারের নথিভুক্ত আপত্তি। এগুলিকে কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনও বিচারবিভাগীয় সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা যায় না।
রিপোর্ট প্রকাশের পর নির্বাচন কমিশন জানায়, সদস্যদের মধ্যে লিখিত মন্তব্য, প্রযুক্তিগত ইনপুট এবং অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনা প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার অংশ। কমিশন আরও জানিয়েছে, SIR-সহ তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগুলির আইনি ভিত্তি রয়েছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতভাবে নেওয়া হয়েছে।
নতুন ভোটারদের নিবন্ধনের জন্য ব্যবহৃত Form-6-এ SIR-সংক্রান্ত নতুন একটি ঘোষণা যুক্ত করা নিয়ে দুই নির্বাচন কমিশনার আপত্তি জানান।
The Indian Express-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, নতুন ব্যবস্থায় আবেদনকারীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তাঁর, তাঁর বাবা-মা অথবা দাদা-দিদা/ঠাকুরদা-ঠাকুমার নাম আগের SIR-এর ভোটার তালিকায় ছিল কি না। রিপোর্ট অনুযায়ী, নিয়ম সংশোধন না করে এই পরিবর্তন আনার কারণে সান্ধু ও যোশী এটিকে ‘অননুমোদিত’ এবং ‘অবৈধ’ বলে উল্লেখ করেন। তাঁদের মতে, এতে প্রথমবার ভোটার হতে চলা তরুণদের নিবন্ধন প্রক্রিয়া কঠিন হতে পারে।
দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তির মধ্যে ভোটার ডেটাবেস এবং নির্বাচনী সফটওয়্যারের নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও ছিল। The Indian Express-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, বিবেক যোশী ভোটার ডেটাবেস ধীরে ধীরে দিল্লিতে কেন্দ্রীভূত হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সুখবীর সিং সান্ধুও কিছু রাজ্য আধিকারিকের ERONet-এ পূর্ণ প্রবেশাধিকার না থাকার বিষয়টি উত্থাপন করেন এবং সিস্টেমের নিরাপত্তা ও ডেটা পরিবর্তনের অনুমতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
The Indian Express-এর রিপোর্টে গোয়ার একটি ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, SIR প্রক্রিয়ায় শুনানির পর ERO ৯৭ জন ভোটারকে যোগ্য বলে মনে করেন। কিন্তু সফটওয়্যারে তাঁদের পুনরায় ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার কোনও বিকল্প ছিল না।
রিপোর্ট অনুযায়ী, এই প্রযুক্তিগত সমস্যার সমাধানের জন্য গোয়ার আধিকারিকরা নির্বাচন কমিশনকে একাধিক ই-মেল পাঠান। কিন্তু চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের সময় পর্যন্ত সিস্টেমে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করা হয়নি।
পশ্চিমবঙ্গে SIR-সংক্রান্ত বিষয় নিয়েও নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরে প্রশ্ন ওঠে। The Indian Express-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রায় ৬০ লাখ ভোটারের রেকর্ডে অসঙ্গতি চিহ্নিত করা হয়েছিল এবং তদন্তের পর বড় সংখ্যায় নাম বাদ দেওয়া হয়।
রিপোর্ট অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপের পর বাদ দেওয়া এবং পরে যুক্ত করা নাম-সংক্রান্ত বিপুল সংখ্যক আপিল ট্রাইব্যুনালের সামনে আসে। সান্ধু এই আপিলগুলির কিছু প্রক্রিয়া ও অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
ভারতের নির্বাচন কমিশন সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদের অধীনে গঠিত একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে কমিশনে একজন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং দুজন নির্বাচন কমিশনার রয়েছেন। নির্বাচন কমিশনের সরকারি ওয়েবসাইটে জ্ঞানেশ কুমারকে CEC এবং সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশীকে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় CEC এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের ভূমিকা নিয়ে বর্তমান বিতর্ক এই তিন সদস্যের কাঠামোর মধ্যকার মতপার্থক্যের সঙ্গে যুক্ত। The Indian Express-এর রিপোর্টেও বলা হয়েছে, দুই নির্বাচন কমিশনার একাধিক বিষয়ে আনুষ্ঠানিক আপত্তি নথিভুক্ত করেছেন।
পুরো বিতর্কে দুটি পৃথক বিষয়কে আলাদা রাখা জরুরি। প্রথমটি হল রাহুল গান্ধী ও বিরোধী দলগুলির তোলা ‘ভোট চুরি’ এবং নির্বাচনী কারচুপির রাজনৈতিক অভিযোগ। দ্বিতীয়টি হল SIR এবং নির্বাচনী ডেটাবেস-সংক্রান্ত কিছু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দুই নির্বাচন কমিশনারের নথিভুক্ত লিখিত আপত্তি।
নির্বাচন কমিশন অভ্যন্তরীণ মন্তব্যকে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যালোচনা প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছে এবং জানিয়েছে, তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগুলির আইনি ভিত্তি রয়েছে। ফলে বর্তমান বিতর্কের তথ্যগত বিষয়গুলি SIR-এর প্রক্রিয়া, ভোটার তালিকার পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার ভূমিকা, কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং এসব নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলির অভিযোগকে ঘিরে ররাহুল গান্ধীর ভোট চুরি অভিযোগ, জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি ও SIR নিয়ে ১৪ আপত্তি
য়েছে।












