উত্তর ইথিওপিয়ার আমহারা অঞ্চলে অবস্থিত ত্সাদকানে দেবে মিতমাক সেন্ট মেরি মঠে বিশেষ প্রার্থনা অনুষ্ঠানের সময় ভূমিধসে অন্তত ১৪ জন নিহত এবং সাতজন আহত হয়েছেন। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়াদের খোঁজে পরিচালিত উদ্ধার অভিযান শেষ হয়েছে এবং নিহতদের দাফন কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
স্থানীয় কর্মকর্তাদের মতে, ঘটনার আগে সারারাত ভারী বৃষ্টি হয়। এতে পাহাড়ের মাটি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ভোরের দিকে পাহাড়ের একটি বড় অংশ ধসে সরাসরি সেই স্থানে পড়ে, যেখানে বিপুল সংখ্যক ধর্মপ্রাণ মানুষ বিশেষ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছিলেন। মঠের প্রার্থনার গুহাটি পাহাড় কেটে নির্মিত। ওই গুহাসদৃশ প্রার্থনাকক্ষে উপস্থিত ভক্তদের ওপর হঠাৎ মাটি ও পাথর ধসে পড়ে। এতে অনেকেই সরে যাওয়ার সুযোগ পাননি।
এই ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পবিত্র জল দিয়ে শুদ্ধিকরণের ঐতিহ্যবাহী আচার অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। ইথিওপিয়ান অর্থোডক্স খ্রিস্টান সম্প্রদায়ে এই আচারটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। বিশ্বাস করা হয়, এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের শারীরিক ও মানসিক সমস্যার আধ্যাত্মিক উপশম মেলে। স্থানীয় গির্জা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিহতদের অধিকাংশই এই পবিত্র জল আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নিতে মঠে এসেছিলেন।
গির্জা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনায় নিহত ১১ জনকে মঠ প্রাঙ্গণেই দাফন করা হয়েছে। বাকি নিহতদের মরদেহ নিজ নিজ এলাকায় দাফনের জন্য পাঠানো হয়েছে। দুর্ঘটনায় কয়েকটি মরদেহ গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পরিচয় শনাক্ত করাও চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। প্রশাসন ও গির্জা কর্তৃপক্ষ স্বজনদের সহায়তায় পরিচয় নিশ্চিত করার কাজ করছে।
দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয় প্রশাসন, নিরাপত্তা বাহিনী, স্বাস্থ্যকর্মী এবং আশপাশের গ্রামের বাসিন্দারা যৌথভাবে উদ্ধার ও ত্রাণ অভিযান শুরু করেন। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আহতদের উদ্ধার করে নিকটবর্তী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রাথমিকভাবে আরও কয়েকজন ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকার আশঙ্কা থাকলেও বিস্তৃত অনুসন্ধানের পর কর্তৃপক্ষ উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করে।
দুর্ঘটনার পর ইথিওপিয়ান অর্থোডক্স চার্চের নর্থ শেওয়া ডায়োসিসের প্রধান আর্চবিশপ আবুনে ক্লেমেন্টোস মঠে পৌঁছান। তিনি নিহতদের জন্য বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করেন, আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সমবেদনা জানান। গির্জা প্রশাসন এই ঘটনাকে পুরো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক বলে উল্লেখ করেছে।
ইথিওপিয়ায় জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত প্রধান বর্ষাকাল থাকে। এ সময় দেশের বহু পার্বত্য ও ঢালু এলাকায় ভূমিধস ও বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রায়ই দেখা যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, টানা ভারী বৃষ্টিতে মাটি দুর্বল হয়ে পড়ায় পাহাড়ের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং বড় আকারের ভূমিধসের ঘটনা ঘটে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইথিওপিয়া একাধিক বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছে। মার্চ ২০২৬ সালে দক্ষিণের গামো অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিজনিত বন্যা ও ভূমিধসে ১০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। এর আগে জুলাই ২০২৪ সালে পার্শ্ববর্তী গেজে গোফা অঞ্চলে ভয়াবহ ভূমিধসে ২২৯ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। এটি ইথিওপিয়ার ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ আবহাওয়াজনিত দুর্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয়। ওই ঘটনায় উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া একাধিক ত্রাণকর্মীও নিহত হয়েছিলেন।
গত দুই দশকে পূর্ব আফ্রিকার আবহাওয়ার ধরনে বড় পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, অতিবৃষ্টি এবং দীর্ঘস্থায়ী খরার ঘটনা আগের তুলনায় বেশি ঘন ঘন এবং অধিক তীব্র হচ্ছে।
জলবায়ু বিজ্ঞানীদের মতে, মানব কর্মকাণ্ডের কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে বায়ুমণ্ডলে আর্দ্রতা বাড়ছে, যার ফলে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টির সম্ভাবনাও বেড়েছে। এর কারণে ভূমিধস, আকস্মিক বন্যা এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি ক্রমাগত বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইথিওপিয়ার মতো পার্বত্য দেশে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার উন্নত পর্যবেক্ষণ, বৃষ্টিভিত্তিক আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং ঝুঁকিপূর্ণ ধর্মীয় ও আবাসিক স্থানের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনায় প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হতে পারে।








