ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU)-এর বাজার ভারতীয় চাল রপ্তানিকারকদের জন্য ক্রমশ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। ইউরোপীয় খাদ্য নিরাপত্তা ও গুণমানের কঠোর মানদণ্ডে ভারতীয় চালের একাধিক চালান উত্তীর্ণ হতে না পারায় রপ্তানিকারকদের সমস্যাও বাড়ছে।
ইউরোপীয় খাদ্য নিরাপত্তা মানদণ্ডের আওতায় ২০২৫ সালে ভারতীয় চালের ৫২টি চালানে নিয়ন্ত্রক সতর্কতা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে প্রধান উদ্বেগ ছিল কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ এবং খাদ্য নিরাপত্তা-সংক্রান্ত মান। এর ফলে ইউরোপীয় বাজারের জন্য ভারতীয় চালের গুণমান নিয়ন্ত্রণ ও সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
জুলাই ২০২৬-এ প্রকাশিত ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর রিসার্চ অন ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক রিলেশন্স (ICRIER)-এর একটি ওয়ার্কিং পেপার অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারত ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রায় ৪.৭৪ লক্ষ টন চাল রপ্তানি করেছে। একই সময়ে ভারতীয় চালের ৫২টি চালান EU-এর নজরদারি ব্যবস্থায় ধরা পড়ে। প্রধান চাল রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তানের ৫৫টি চালানে সতর্কতা নথিভুক্ত হয়, আর ভারত এই তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে ছিল।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয় চালের প্রায় প্রতি ৯,১০০ টন রপ্তানি পরিমাণের মধ্যে একটি চালান নিয়ন্ত্রক পরীক্ষায় সমস্যাযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এর তুলনায় কম্বোডিয়া, মিয়ানমার এবং থাইল্যান্ডের মতো প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলোর ক্ষেত্রে এ ধরনের চালানের সংখ্যা অনেক কম ছিল। এই তথ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের Rapid Alert System for Food and Feed (RASFF)-এর সঙ্গে সম্পর্কিত।

RASFF খাদ্য ও পশুখাদ্য-সংক্রান্ত সম্ভাব্য ঝুঁকির তথ্য আদান-প্রদানের জন্য ব্যবহৃত হয়। এ ধরনের সতর্কতা কোনও দেশের সম্পূর্ণ রপ্তানিকে অনিরাপদ প্রমাণ করে না। তবে একই ধরনের সমস্যা বারবার সামনে এলে তা রপ্তানিকারক ও নিয়ন্ত্রকদের জন্য উদ্বেগের বিষয় হতে পারে।
ICRIER-এর গবেষণায় ভারতের রপ্তানি নজরদারি ব্যবস্থায় Agricultural and Processed Food Products Export Development Authority (APEDA) এবং Export Inspection Council (EIC)-এর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। APEDA কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের রপ্তানি বাড়ানো এবং ট্রেসেবিলিটি-সংক্রান্ত ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অন্যদিকে, EIC পরিদর্শন ও সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত।
তবে দুই প্রতিষ্ঠানের কিছু দায়িত্ব পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। মানদণ্ড, রপ্তানিকারকদের প্রশিক্ষণ এবং ল্যাবরেটরি নেটওয়ার্কের মতো ক্ষেত্রে উভয় প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা থাকায় দায়বদ্ধতার স্পষ্ট সীমা নিয়ে সমস্যা তৈরি হতে পারে। রপ্তানিকারকদের বক্তব্য অনুযায়ী, বিভিন্ন স্তরের অনুমোদন ও সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে তাদের একাধিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করতে হয়। এতে রপ্তানি প্রক্রিয়া জটিল হওয়ার পাশাপাশি সময় ও খরচও বাড়তে পারে।
ICRIER-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, APEDA দেশে ১২৬টি ল্যাবরেটরিকে অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫০টি ল্যাব চাল পরীক্ষা করতে সক্ষম। আবার এসবের মধ্যে ৪৭টি ল্যাব ভারতীয় খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রকের স্তরে নোটিফায়েড। রিপোর্টে চাল রপ্তানির নজরদারির জন্য একটি নোডাল এজেন্সি গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, পরীক্ষা, সার্টিফিকেশন এবং রপ্তানির শেষ ধাপ পর্যন্ত সম্পূর্ণ সরবরাহ শৃঙ্খলে এন্ড-টু-এন্ড ট্রেসেবিলিটি উন্নত করা যেতে পারে।
EU-তে ভারতীয় চালের কিছু চালানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার প্রধান কারণ হিসেবে এমন কীটনাশকের অবশিষ্টাংশের কথা বলা হয়েছে, যেগুলির ওপর ইউরোপীয় ইউনিয়নে কঠোর নিষেধাজ্ঞা অথবা কম সর্বোচ্চ অবশিষ্টাংশের সীমা কার্যকর রয়েছে, যদিও ভারতে কিছু ক্ষেত্রে সেগুলির ব্যবহার এখনও চলছে। এছাড়া সংরক্ষণ, ফসল কাটার পরবর্তী প্রক্রিয়া এবং চাল হ্যান্ডলিংয়ের ঘাটতির কারণে ফাঙ্গাস বা অন্যান্য গুণমান-সংক্রান্ত সমস্যাও তৈরি হতে পারে। রপ্তানিকারকদের পক্ষ থেকে এ ধরনের কীটনাশকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং ইউরোপীয় মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উৎপাদন প্রক্রিয়া গড়ে তোলার দাবি উঠে আসছে।
ইউরোপীয় বাজারে ভারতের চাল বাণিজ্যের প্রধান শক্তি বাসমতি চাল। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, EU-তে ভারতীয় চাল বাণিজ্যের প্রায় ৯২ শতাংশ বাসমতির সঙ্গে যুক্ত। ইউরোপীয় ইউনিয়নে চালের বিভিন্ন ধরনের জন্য আমদানি শুল্কও আলাদা। মিলড রাইসের ক্ষেত্রে শুল্ক প্রায় ২০০ ইউরো প্রতি টন এবং নন-বাসমতি ব্রাউন রাইসের ক্ষেত্রে প্রায় ৩০ ইউরো প্রতি টন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, বাসমতি ব্রাউন রাইস আমদানি শুল্কের ক্ষেত্রে পৃথক ব্যবস্থার সুবিধা পায়।










