বলিউডের রুপোলি পর্দায় তাঁর সৌন্দর্য ও অভিনয় একসময় দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল। রাজেশ খান্না, ধর্মেন্দ্র, জিতেন্দ্র, বিনোদ খান্না থেকে সঞ্জীব কুমার—একাধিক জনপ্রিয় নায়কের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। কিন্তু ক্যামেরার বাইরের জীবন ছিল অনেক বেশি কঠিন। মাত্র ২৫ বছর বয়সে স্বামীকে হারানো, এরপর বয়সে অনেক বড় এবং আগেই তিনবার বিবাহিত এক তারকার সঙ্গে নতুন সংসার—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন যেন সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানায়। তিনি আর কেউ নন, লীনা চন্দভারকর।
![]()
বিজ্ঞাপন থেকে বলিউডে পা
১৯৫০ সালের ২৯ অগাস্ট কর্ণাটকের ধারওয়াড়ে জন্ম লীনা চন্দভারকরের। তাঁর পরিবার ছিল কোঙ্কনি বংশোদ্ভূত এবং বাবা ছিলেন সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত। অভিনয়ের জগতে আসার আগে বিজ্ঞাপনে কাজ করতেন লীনা।এরপর ফিল্মফেয়ার ফ্রেশ ফেস প্রতিযোগিতায় অংশ নেন তিনি। সেই প্রতিযোগিতার সাফল্যই তাঁর সামনে হিন্দি সিনেমার দরজা খুলে দেয়। ১৯৬৮ সালে ‘মন কা মীত’ ছবির মাধ্যমে বড় পর্দায় আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। ছবিতে তাঁর বিপরীতে ছিলেন সোম দত্ত। প্রথম ছবির পরই নজরে আসেন লীনা এবং একের পর এক অভিনয়ের সুযোগ পেতে থাকেন।
একের পর এক বড় তারকার সঙ্গে অভিনয়
সত্তরের দশকে লীনা চন্দভারকরের কেরিয়ার দ্রুত এগিয়ে যায়। ‘মেহবুব কি মেহেন্দি’ ছবিতে রাজেশ খান্নার সঙ্গে তাঁর জুটি দর্শকদের নজর কেড়েছিল।এছাড়াও ধর্মেন্দ্রর সঙ্গে ‘রাখওয়ালা’ ও ‘এক মহল হো সপনো কা’, জিতেন্দ্রর সঙ্গে ‘হামজোলি’, ‘বিদাই’ ও ‘নালায়ক’, বিনোদ খান্নার সঙ্গে ‘কয়েদ’ ও ‘জালিমাত’-এর মতো ছবিতে অভিনয় করেন তিনি। সঞ্জীব কুমারের সঙ্গেও ‘মানচালি’ ও ‘আনহনি’-তে দেখা যায় তাঁকে। এমনকী দিলীপ কুমারের সঙ্গেও ‘বৈরাগ’ ছবিতে অভিনয় করেছিলেন লীনা।অর্থাৎ, সেই সময়ের একাধিক প্রথম সারির নায়কের সঙ্গে কাজ করে নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন তিনি।
![]()
২৫ বছরেই নেমে আসে অন্ধকার
কেরিয়ারের মধ্যগগনে থাকতেই লীনার ব্যক্তিগত জীবনে ঘটে যায় ভয়াবহ ঘটনা। তাঁর প্রথম বিয়ে হয়েছিল সিদ্ধার্থ বান্দোদকরের সঙ্গে। সিদ্ধার্থ ছিলেন গোয়ার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী দয়ানন্দ বান্দোদকরের ছেলে।বিয়ের মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই এক দুর্ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যু হয় সিদ্ধার্থের। তখন লীনার বয়স মাত্র ২৫ বছর। এত অল্প বয়সে স্বামীকে হারিয়ে কার্যত ভেঙে পড়েন তিনি।
এরপর জীবনে এলেন কিশোর কুমার
প্রথম স্বামীর মৃত্যুর পর বেশ কিছুটা সময় পেরিয়ে লীনার জীবনে আসেন কিশোর কুমার। বয়সের বড় ব্যবধান এবং কিশোর কুমারের আগের তিনটি বিয়ে—সব মিলিয়ে তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে সেই সময় যথেষ্ট আলোচনা হয়েছিল।এমনকি লীনার বাবা প্রথমদিকে এই বিয়েতে সম্মতি দেননি। তবে শেষ পর্যন্ত দু'জন বিয়ে করেন এবং তাঁদের সংসারে জন্ম নেয় পুত্র সুমিত কুমার।কিন্তু লীনার জীবনে ফের নেমে আসে শোকের ছায়া। ১৯৮৭ সালে কিশোর কুমারের মৃত্যু হয়। ফলে দ্বিতীয়বারও স্বামীকে হারানোর যন্ত্রণা সহ্য করতে হয় তাঁকে।
সংসারের পর বদলে যায় অভিনয়জীবন
কিশোর কুমারকে বিয়ের পর ধীরে ধীরে চলচ্চিত্র থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন লীনা। যদিও পরবর্তী সময়ে কয়েকটি ছবিতে তাঁকে দেখা গিয়েছিল।১৯৮৫ সালে ‘সরফরোশ’ ছবিতে অভিনয় করেন তিনি। এরপর ১৯৮৯ সালে মুক্তি পায় ‘মমতা কি ছাওঁ মে’, যেটিকে তাঁর শেষ চলচ্চিত্রগুলির অন্যতম হিসেবে ধরা হয়। ছবিতে রাজেশ খান্নার সঙ্গেও কাজ করেছিলেন লীনা।পরবর্তীকালে টেলিভিশনেও তাঁর উপস্থিতি দেখা যায়। ২০০৭ সালে ‘কে ফর কিশোর’ নামের সঙ্গীতভিত্তিক রিয়েলিটি শোয়ের প্রথম পর্বে অতিথি বিচারক হিসেবে উপস্থিত হয়েছিলেন তিনি।
![]()
রুপোলি পর্দার বাইরে অন্যরকম এক জীবন
লীনা চন্দভারকরের অভিনয়জীবন যতটা ঝলমলে, ব্যক্তিগত জীবনের গল্প ততটাই বেদনাদায়ক। অল্প বয়সে স্বামীকে হারানো থেকে শুরু করে ফের নতুন করে সংসার বাঁধা এবং দ্বিতীয়বার স্বামীহারা হওয়া—জীবনের একাধিক কঠিন অধ্যায় তাঁকে পেরোতে হয়েছে।আজও ষাট-সত্তরের দশকের হিন্দি সিনেমার জনপ্রিয় অভিনেত্রী হিসেবে লীনা চন্দভারকরের নাম স্মরণ করা হয়। তাঁর জীবন প্রমাণ করে, রুপোলি পর্দার আলো থাকলেও ব্যক্তিগত জীবনের বাস্তবতা অনেক সময় তার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে।
![]()
ষাট ও সত্তরের দশকের জনপ্রিয় বলিউড অভিনেত্রী লীনা চন্দভারকরের ব্যক্তিগত জীবন ছিল অত্যন্ত ঘটনাবহুল। মাত্র ২৫ বছর বয়সে প্রথম স্বামীকে হারানোর পর তিনি বিয়ে করেন কিংবদন্তি গায়ক-অভিনেতা কিশোর কুমারকে। কিন্তু সেই সংসারও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। আজ তাঁর জন্মদিনে ফিরে দেখা যাক তাঁর জীবনকাহিনি।





