জনগণনা কার্যক্রমে শিক্ষকদের দায়িত্ব নিয়ে চলা বিতর্কের মধ্যে হাইকোর্ট মন্তব্য করেছে যে, স্কুলে পড়ানোর দায়িত্ব রয়েছে—শুধু এই কারণে শিক্ষকরা জনগণনার মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজ থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখতে পারেন না। জনগণনার জন্য শিক্ষকদের পরিষেবা নেওয়া যেতে পারে এবং নির্ধারিত দায়িত্ব পালন করতে হবে।
মামলাটি পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যুক্ত। শিক্ষকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, তাঁদের নির্ধারিত সময় পর্যন্ত স্কুলে পড়াতে হয়। এর পাশাপাশি জনগণনার জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে অতিরিক্ত সময় ও যাতায়াতের প্রয়োজন হয়। ফলে দুটি দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করতে বাস্তব সমস্যা হতে পারে।
আদালতের সামনে আরও বলা হয়, শিক্ষকরা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত স্কুলে থাকেন এবং অনেক ক্ষেত্রে কর্মস্থলে পৌঁছতে তাঁদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। ফলে জনগণনার মাঠপর্যায়ের কাজের জন্য পর্যাপ্ত সময় বের করা কঠিন হতে পারে। তবে আদালত স্পষ্ট করেছে, প্রশাসনিক বা লজিস্টিক সমস্যাকে জাতীয় এই কাজ থেকে বিরত থাকার কারণ হিসেবে দেখানো যায় না।
জনগণনা দেশের জনসংখ্যা সংক্রান্ত বৃহত্তম প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। এর আওতায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষ ও পরিবারের বিষয়ে নির্ধারিত তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এই কাজের জন্য বিপুল সংখ্যক কর্মীর প্রয়োজন হয়। শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে এই ধরনের সরকারি কাজে যুক্ত হয়ে আসছেন, কারণ নির্ধারিত ফর্ম অনুযায়ী মানুষের কাছে পৌঁছে তথ্য সংগ্রহের অভিজ্ঞতা তাঁদের রয়েছে।
এই কারণেই সরকারি সংস্থাগুলি জনগণনা কার্যক্রমে শিক্ষক ও অন্যান্য সরকারি কর্মীদের পরিষেবা ব্যবহার করে। জনগণনা সংক্রান্ত দায়িত্ব পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্মীকে নির্ধারিত প্রশিক্ষণ ও নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করতে হয়। প্রশাসনিক পর্যায়ে দায়িত্বের সময়সূচি এবং কাজ সম্পন্ন করার ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হয়।
মামলায় শিক্ষকদের নিয়মিত স্কুলের দায়িত্বের বিষয়টিও উঠে আসে। শিক্ষকদের বক্তব্য, শিশুদের পড়াশোনা যাতে ব্যাহত না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। শিক্ষকরা দীর্ঘ সময় জনগণনার কাজে যুক্ত থাকলে স্কুলে পড়াশোনা ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির ওপর প্রভাব পড়তে পারে। অন্যদিকে জনগণনার জন্য পর্যাপ্ত কর্মী নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রশাসনের।
হাইকোর্টের মন্তব্য এই দুই দায়িত্বের সমন্বয়ের বিষয়টি সামনে এনেছে। আদালত ইঙ্গিত দিয়েছে, জনগণনা কোনো সাধারণ দফতরভিত্তিক কাজ নয়; এটি জাতীয় পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। তাই নিয়মিত দায়িত্বের কথা উল্লেখ করে জনগণনা সংক্রান্ত দায়িত্ব এড়ানো যায় না।
এর আগে আদালতে জনগণনা সংক্রান্ত একই ধরনের বিষয় উঠেছে। কর্ণাটক হাইকোর্টও এপ্রিল ২০২৬-এ একটি মামলার শুনানির সময় জনগণনাকে জাতীয় দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করেছিল এবং একটি বেসরকারি স্কুলকে তার শিক্ষকদের জনগণনা কাজে উপলব্ধ করানোর নির্দেশ দিয়েছিল। আদালত আরও মনে করেছিল, শুধুমাত্র বাস্তব বা লজিস্টিক সমস্যার কারণে জনগণনায় সহযোগিতা প্রত্যাখ্যান করা যায় না।
জনগণনা চলাকালীন শিক্ষকদের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে পরিবারের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে হয়। এর জন্য তাঁদের নির্দিষ্ট এলাকা বরাদ্দ করা হয় এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী তথ্য নথিভুক্ত করা হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় সঠিক তথ্য সংগ্রহ এবং রেকর্ড সুরক্ষিত রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষকদের জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো নিয়মিত স্কুলের দায়িত্ব এবং জনগণনার মাঠপর্যায়ের কাজের মধ্যে সময়ের সমন্বয় করা। দুটি কাজের সময় পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষ হলে প্রশাসনকে এমন ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত না হয় এবং জনগণনার কাজও নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন করা যায়।
শিক্ষকদের বক্তব্য, তাঁরা সরকারি দায়িত্ব এড়াতে চান না, তবে কাজের বাস্তবসম্মত বণ্টন প্রয়োজন। তাঁদের প্রশ্ন, স্কুলে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত পড়ানোর পর জনগণনার কাজ করতে হলে অতিরিক্ত সময় ও যাতায়াতের ব্যবস্থা কীভাবে হবে। একইভাবে মহিলা শিক্ষক এবং দূরবর্তী এলাকায় কর্মরত শিক্ষকদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও যাতায়াতের বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
প্রশাসনের সামনে জনগণনার কাজ নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে শেষ করার দায়িত্ব রয়েছে। এর জন্য পর্যাপ্ত কর্মী নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, এলাকা বণ্টন এবং নজরদারির ব্যবস্থা করতে হয়। শিক্ষকদের সহযোগিতা ছাড়া এত বড় পরিসরের মাঠপর্যায়ের সমীক্ষা সম্পন্ন করা কঠিন হতে পারে।
জনগণনা সংক্রান্ত দায়িত্বকে সাধারণ ব্যক্তিগত কাজ হিসেবে দেখা যায় না। কোনো কর্মীকে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব দেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট আদেশ ও নিয়ম অনুযায়ী তা পালন করতে হয়। তবে দায়িত্বের পরিস্থিতি, সময় এবং অন্যান্য প্রশাসনিক সমস্যার সমাধান সংশ্লিষ্ট দফতরকে করতে হবে।
হাইকোর্টের মন্তব্যের পর শিক্ষকদের জনগণনা সংক্রান্ত দায়িত্ব নিয়ে অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। স্কুলে পড়ানোর দায়িত্ব রয়েছে—শুধু এই কারণ দেখিয়ে শিক্ষকরা জনগণনার কাজ প্রত্যাখ্যান করতে পারেন না। একই সঙ্গে জনগণনা এবং স্কুলশিক্ষার মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখার দায়িত্ব প্রশাসনের।












