সৌদি আরবের দুটি প্রধান বিমানবন্দরকে ৬ ও ৭ অক্টোবর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু বানানোর দাবি করেছে হুথি বিদ্রোহীরা। সৌদি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, হামলায় তিনজন নিহত এবং ৩৬ জন আহত হয়েছেন। হামলাগুলোর লক্ষ্য ছিল আভা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট এবং রিয়াদের কিং খালিদ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। সৌদি আরবের জেনারেল অথরিটি অব সিভিল এভিয়েশন (GACA) বুধবার হামলা ও হতাহতের তথ্য জানিয়েছে। হুথি সংগঠনও দুটি হামলার দায় স্বীকার করেছে।
এরপর ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট হুথিদের সামরিক অবস্থানের বিরুদ্ধে পাল্টা হামলা চালানোর দাবি করেছে। জোটের দাবি, ইয়েমেনে ৮০টির বেশি হুথি সামরিক অবস্থানকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
সৌদি কর্মকর্তাদের মতে, আভা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে হামলায় দুই নারী নিহত হয়েছেন। দুজনই বিদেশি নাগরিক এবং তাঁদের মরক্কো ও আলজেরিয়ার নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। এই হামলায় মোট ২৮ জন আহত হওয়ার তথ্য জানানো হয়েছে। আহতদের মধ্যে সৌদি আরবের নাগরিকদের পাশাপাশি বাংলাদেশ ও ফিলিপাইনের নাগরিকরাও রয়েছেন।
হামলার পর আহত সবাইকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়। সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং যাত্রী ও কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
সৌদি আরবের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত আভা বিমানবন্দর ইয়েমেন সীমান্তের তুলনামূলক কাছাকাছি হওয়ায় অতীতেও হুথি হামলার লক্ষ্য হয়েছে।
হুথিরা রিয়াদের কিং খালিদ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টকেও লক্ষ্যবস্তু করার দাবি করেছে। কর্মকর্তাদের মতে, এই হামলায় একজন সুদানি নাগরিক নিহত হয়েছেন।
এই হামলায় আটজন আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন সৌদি নাগরিক, দুইজন মিশরের বাসিন্দা এবং একজন পাকিস্তানি নাগরিক রয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।
রাজধানী রিয়াদের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে লক্ষ্যবস্তু করা হওয়ায় হামলার পরিসর আরও বিস্তৃত হয়েছে। বিমানবন্দরে যাত্রীদের নিরাপত্তা এবং বিমান চলাচল নিয়ে কর্তৃপক্ষ সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিয়েছে।
হুথি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থানে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করেছেন। তাঁর মতে, সংগঠনটি ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি ড্রোন ব্যবহার করে তিনটি বড় সামরিক অভিযান চালিয়েছে।
হুথি মুখপাত্রের দাবি অনুযায়ী, প্রথম অভিযানে রিয়াদের কিং খালিদ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টকে লক্ষ্য করা হয়। সংগঠনটির দাবি, হামলা লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছায় এবং এর ফলে বিমান চলাচল প্রভাবিত হয়।
দ্বিতীয় অভিযানে রাবিঘে সৌদি আরামকোর একটি তেল স্থাপনাকে লক্ষ্য করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে। হুথি মুখপাত্র বলেন, হামলার পর সেখানে আগুন ধরে যায়।
তৃতীয় অভিযানে আভা বিমানবন্দর, খামিস মুশাইত বিমানঘাঁটি এবং আসির অঞ্চলের একটি সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। এছাড়া নাজরান ও জিজানেও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার কথা বলা হয়েছে।
এই দাবিগুলোর সবগুলোর স্বাধীনভাবে তাৎক্ষণিক নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।
হুথিরা সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোকেও লক্ষ্যবস্তু করার দাবি করেছে। সংগঠনটির সামরিক মুখপাত্র রাবিঘে আরামকোর একটি তেল স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করেছেন।
আরামকো সৌদি আরবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি কোম্পানি এবং দেশটির তেল অর্থনীতিতে এর কেন্দ্রীয় ভূমিকা রয়েছে। তেল উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ ও রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত কোনো বড় স্থাপনায় হামলা হলে তা আঞ্চলিক বাজারের জন্যও উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
তবে হুথিদের এই দাবি এবং ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত স্বাধীন নিশ্চিতকরণ এখনও পাওয়া যায়নি।
বিমানবন্দরগুলোতে হামলার পর ইয়েমেনে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোট হুথি অবস্থানের বিরুদ্ধে বড় আকারের পাল্টা সামরিক অভিযান চালানোর দাবি করেছে।
জোটের মতে, ইয়েমেনে ৮০টির বেশি সামরিক অবস্থানকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। পাশাপাশি জোট দাবি করেছে, সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করা একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ প্ল্যাটফর্মও ধ্বংস করা হয়েছে।
জোটের মুখপাত্র কর্নেল তুর্কি আল-মালিকির মতে, ইয়েমেনের রাজধানী সানায় এই অভিযান চালানো হয়। তাঁর দাবি, সংশ্লিষ্ট স্থান থেকে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে আরও একটি হামলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল।
এর ফলে সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ধারাবাহিকতা আবারও তীব্র হয়েছে।
ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহী ও সরকারপন্থী বাহিনীর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে সংঘর্ষ চলছে। সৌদি আরব ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন করে আসছে। অন্যদিকে, হুথি সংগঠন দেশটির বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে ইয়েমেনের সরকারপন্থী বাহিনী হুথিদের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযান জোরদার করেছে। এর প্রধান লক্ষ্য লোহিত সাগরের উপকূল এবং বাব আল-মন্দেব প্রণালির আশপাশের কৌশলগত এলাকায় নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করা।
বাব আল-মন্দেব বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোর একটি। এটি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সমুদ্রপথে বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে হুথি বাহিনী ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করে মোচা ও বাব আল-মন্দেবের আশপাশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকার নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছিল।
এর ফলে কৌশলগত সমুদ্রপথের আশপাশে হুথিদের সামরিক উপস্থিতি শক্তিশালী হয় এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে। এর জবাবে সৌদি সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনী অক্টোবরের শুরুতে সামরিক অভিযান জোরদার করে।
৫ অক্টোবর শুরু হওয়া অভিযানে ইয়েমেনি সেনাবাহিনী বাব আল-মন্দেবের কাছে ধুবাব এলাকা-সহ কয়েকটি কৌশলগত স্থানের ওপর পুনরায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি করেছে।
এরপর সরকারি বাহিনী মোচার দিকে অগ্রসর হয়ে শহরটিকে হুথি নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করারও দাবি করেছে। পাওয়া প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারি বাহিনী গত মাসে হুথিদের দখলে যাওয়া কয়েকটি এলাকা থেকে তাদের পিছু হটিয়েছে।
সৌদি বিমানবন্দরে হামলা এবং এর পর ইয়েমেনে পাল্টা বিমান হামলার প্রভাব দুই পক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। লোহিত সাগর ও বাব আল-মন্দেব এলাকা বৈশ্বিক বাণিজ্য ও সামুদ্রিক নিরাপত্তার দিক থেকে ইতিমধ্যেই সংবেদনশীল।
এই অঞ্চলে যেকোনো ধরনের সামরিক উত্তেজনা বাড়লে আন্তর্জাতিক শিপিং, জ্বালানি সরবরাহ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর চাপ বাড়তে পারে। বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামোর মতো বেসামরিক গুরুত্বসম্পন্ন স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হলে সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়।
সৌদি আরব ও হুথিদের করা একাধিক সামরিক দাবির স্বাধীন নিশ্চিতকরণ এখনও বাকি। তবে বিমানবন্দরগুলোতে হামলায় বেসামরিক নাগরিকদের নিহত ও আহত হওয়ার বিষয়টি সংঘাতের মানবিক প্রভাবকে আবারও সামনে এনেছে।
আগামী দিনগুলোতে পাল্টা সামরিক অভিযান কতটা বিস্তৃত হয় এবং দুই পক্ষের হামলার এই ধারাবাহিকতা আঞ্চলিক সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করে কি না, তা পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হবে।












