গাজায় WCK ত্রাণবহরে হামলার তদন্ত শেষ করল IDF, গুরুতর ভুল স্বীকার

২০২৪ সালের এপ্রিলে গাজায় WCK ত্রাণবহরে হামলার তদন্ত শেষ করেছে IDF। জোমি ফ্র্যাঙ্ককমসহ সাতজন নিহতের ঘটনায় গুরুতর ভুল স্বীকার করলেও অপরাধমূলক অসদাচরণের সন্দেহ পায়নি সেনাবাহিনী।

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (IDF) ২০২৪ সালের এপ্রিলে গাজায় ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেন (WCK)-এর ত্রাণবহরে প্রাণঘাতী হামলার তদন্ত শেষ করেছে। ওই হামলায় অস্ট্রেলীয় নাগরিক ও ত্রাণকর্মী জোমি ফ্র্যাঙ্ককমসহ সাতজন মানবিক সহায়তাকর্মী নিহত হন। IDF জানিয়েছে, ঘটনায় গুরুতর পরিচালনাগত ও সিদ্ধান্তগত ভুল হয়েছিল, তবে কমান্ডারদের সিদ্ধান্তে অপরাধমূলক অসদাচরণের যুক্তিসঙ্গত সন্দেহ পাওয়া যায়নি।

২০২৪ সালের এপ্রিলে গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া WCK-এর যানবাহনের একটি বহরে ইসরায়েলি সামরিক হামলা হয়। ঘটনায় সাতজন ত্রাণকর্মী নিহত হন। নিহতদের মধ্যে অস্ট্রেলীয় নাগরিক লালজাওমি ‘জোমি’ ফ্র্যাঙ্ককমও ছিলেন।

IDF-এর তদন্তে স্বীকার করা হয়েছে যে সেনাসদস্যদের পক্ষ থেকে গুরুতর ভুল হয়েছিল। তদন্ত অনুযায়ী, সেনাসদস্যরা ভুলভাবে শনাক্ত করেছিলেন যে বহরে হামাসের একজন যোদ্ধা ছিলেন। ওই ভুল শনাক্তকরণের পর সামরিক অভিযান চালানো হয়।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, হামলাটি ইচ্ছাকৃতভাবে ত্রাণকর্মীদের লক্ষ্য করে চালানো হয়নি এবং পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কমান্ডারদের সিদ্ধান্তকে অপরাধমূলক অসদাচরণের আওতায় রাখা যায় না।

IDF জানিয়েছে, ঘটনায় একাধিক স্তরে ব্যর্থতা ছিল। এর মধ্যে পরিস্থিতি সম্পর্কে সঠিক তথ্য সংগ্রহে ঘাটতি, লক্ষ্য শনাক্তকরণে ভুল এবং সামরিক প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ না করা অন্তর্ভুক্ত।

তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল, সেনাসদস্য বা কমান্ডাররা ইচ্ছাকৃতভাবে মানবিক সহায়তাকর্মীদের লক্ষ্য করেছিলেন কি না। সেনাবাহিনী জানিয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত ভিত্তি পাওয়া যায়নি।

অপরাধমূলক দায় নির্ধারণ না করা হলেও IDF ঘটনায় হওয়া ভুলগুলোকে গুরুতর বলে উল্লেখ করেছে।

অস্ট্রেলীয় সরকার ২০২৪ সালে ঘটনাটি নিয়ে একটি পর্যালোচনা করিয়েছিল। সেই পর্যালোচনায় বলা হয়েছিল, IDF-এর হামলা প্রক্রিয়া অনুসরণে গুরুতর ব্যর্থতার ফল ছিল।

প্রতিবেদনে পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতনতার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ঘাটতির কথা বলা হয়েছিল। তবে অস্ট্রেলীয় পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত ছিল, WCK কর্মীদের ইচ্ছাকৃতভাবে বা তাঁদের পরিচয় জেনে লক্ষ্যবস্তু করার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

জোমি ফ্র্যাঙ্ককমের পরিবার তাঁর মৃত্যুর পর জবাবদিহি ও বিচারের দাবি জানিয়ে আসছে। ২০২৬ সালের মার্চে তাঁর মৃত্যুর দ্বিতীয় বার্ষিকীতে তাঁর ভাই মাল ফ্র্যাঙ্ককম বলেছিলেন, পরিবার এখনও বিচারের দিকে পর্যাপ্ত অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছে না।

ফ্র্যাঙ্ককম পরিবার জানিয়েছে, জবাবদিহির একটি স্পষ্ট প্রক্রিয়া তাঁদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। জোমি মানবিক সহায়তার কাজে যুক্ত ছিলেন এবং গাজায় প্রয়োজনমতো মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার প্রচেষ্টার অংশ ছিলেন।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বুধবার একসঙ্গে পাঁচটি প্রধান তদন্তের ফল প্রকাশ করেছে। কয়েকটি ঘটনায় সেনাসদস্যদের অপরাধমূলক দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, আর কয়েকটি ঘটনায় আরও অপরাধমূলক তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছে।

সেনাবাহিনী জানুয়ারি ২০২৪ সালে পাঁচ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি শিশু হিন্দ রজবের মৃত্যুর ঘটনায় অপরাধমূলক তদন্ত শুরু করার কথা জানিয়েছে। ওই সময় হিন্দ তাঁর পরিবারের গাড়ির ধ্বংসাবশেষের মধ্যে আটকে ছিলেন। তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্য এর আগেই নিহত হয়েছিলেন।

হিন্দ সাহায্যের জন্য ফোন করেছিলেন এবং তাঁর ঘটনা আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়েছিল। এখন IDF ঘটনাটি নিয়ে অপরাধমূলক তদন্ত শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

IDF ২০২৫ সালের মার্চে তেল আল-সুলতান এলাকায় ফিলিস্তিনি প্যারামেডিকদের একটি বহরে হামলার ঘটনাতেও অপরাধমূলক তদন্তের সুপারিশ করেছে। ওই ঘটনায় ১৫ জন নিহত হন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলায় ব্যবহৃত অ্যাম্বুলেন্সগুলোর ধ্বংসাবশেষ এবং নিহতদের দেহাবশেষ পরে সেনাসদস্যরা একটি অগভীর গণকবরে দাফন করেছিলেন।

এই ঘটনায় আরও অপরাধমূলক তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছে, কারণ সামরিক অভিযানের সঙ্গে যুক্ত সম্ভাব্য অপরাধমূলক দিকগুলোর অতিরিক্ত তদন্তের প্রয়োজন বলে মনে করা হয়েছে।

IDF ফেব্রুয়ারি ২০২৪ এবং নভেম্বর ২০২৩ সালে মেডেসাঁ সঁ ফ্রঁতিয়ের, অর্থাৎ ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্সের কর্মীদের মৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত দুটি ঘটনাও তদন্ত করেছে।

সেনাবাহিনীর মতে, এই দুটি ঘটনাতেও সেনাসদস্যদের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক অসদাচরণের ভিত্তি পাওয়া যায়নি। বুধবার প্রকাশিত পাঁচটি তদন্তে তাই বিভিন্ন ঘটনার বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত সামনে এসেছে।

একদিকে কয়েকটি ঘটনায় সেনাসদস্যদের অপরাধমূলক দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে হিন্দ রজব ও প্যারামেডিকদের ঘটনায় আরও অপরাধমূলক তদন্তের দিকে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

গাজা যুদ্ধে মানবিক সহায়তাকর্মীদের নিরাপত্তা আন্তর্জাতিকভাবে উদ্বেগের বিষয় হয়ে রয়েছে। WCK ত্রাণবহরে হামলার ঘটনাটি এই বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

ঘটনার পর ইসরায়েল তার সামরিক প্রক্রিয়ায় ভুল স্বীকার করেছিল এবং দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছিল।

জোমি ফ্র্যাঙ্ককমের ঘটনায় IDF-এর তদন্তের সিদ্ধান্ত হলো, গুরুতর ভুল হয়েছিল, কিন্তু অপরাধমূলক অসদাচরণের যুক্তিসঙ্গত সন্দেহ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এর বিপরীতে হিন্দ রজব ও প্যারামেডিকদের মৃত্যুর ঘটনায় অপরাধমূলক তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছে।

 

Leave a comment