মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা আবারও বৃদ্ধি পেয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পস (IRGC) দাবি করেছে যে তারা কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
অন্যদিকে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) দাবি করেছে যে সব হামলাই সফলভাবে প্রতিহত করা হয়েছে এবং কোনো মার্কিন সামরিক স্থাপনার ক্ষতি হয়নি।
ইরানের দাবি অনুযায়ী, কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। হামলায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা বলেছেন, অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দ্বারা মাঝপথেই ধ্বংস করা হয়েছে এবং কিছু ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে। বাহরাইনেও একাধিক ড্রোন হামলা প্রতিহত করা হয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। মার্কিন ও স্থানীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যৌথভাবে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে সক্ষম হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা পদক্ষেপেরও নিশ্চিত করেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন বাহিনী হরমুজ প্রণালীর কাছে অবস্থিত ইরানের কেশম দ্বীপের একটি যোগাযোগ টাওয়ারকে লক্ষ্য করে অভিযান চালিয়েছে।
মার্কিন পক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, এলাকায় সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হওয়ার প্রেক্ষাপটে আত্মরক্ষার অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া হরমুজ প্রণালীর নিকটে একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে হামলার তথ্যও সামনে এসেছে। বোতসোয়ানার পতাকাবাহী ওই ট্যাঙ্কারটি ইরানের খার্গ দ্বীপের দিকে যাচ্ছিল। ঘটনার পর জাহাজটিতে আগুন লাগা এবং ধোঁয়া দেখা যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রভাব বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও পড়েছে। অপরিশোধিত তেলের দামে এক শতাংশের বেশি বৃদ্ধি রেকর্ড করা হয়েছে।
ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বেড়ে প্রায় ব্যারেলপ্রতি ৯৭ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। একই সময়ে মার্কিন ডব্লিউটিআই ক্রুডও প্রায় ব্যারেলপ্রতি ৯৫ ডলারের স্তরে লেনদেন হতে দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তেজনা আরও বাড়লে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে।

এই পরিস্থিতির মধ্যে গাজা ও লেবাননেও উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম (WFP) জানিয়েছে, গাজায় একটি বড় সাইবার হামলার কারণে প্রায় ছয় লাখ পরিবারের তথ্য ফাঁস হয়েছে। ফাঁস হওয়া তথ্যে নাম, পরিচয়পত্রের তথ্য, মোবাইল নম্বর এবং অবস্থানসংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
অন্যদিকে, লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘর্ষ তীব্র হয়েছে। হিজবুল্লাহ দাবি করেছে যে তারা দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক স্থাপনা ও ট্যাঙ্কের ওপর একাধিক হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে ইসরায়েলি বিমান হামলাও অব্যাহত রয়েছে।
দক্ষিণ লেবাননের পরিস্থিতির অবনতির পর জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন UNIFIL-এর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, শান্তি বজায় রাখা এবং যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার মূল উদ্দেশ্য পূরণে মিশনটি কার্যকর হতে পারছে না।
ইসরায়েল অভিযোগ করেছে যে UNIFIL হিজবুল্লাহর সামরিক তৎপরতা প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে, হিজবুল্লাহ-সমর্থকদের দাবি, মিশনটির অবস্থান ইসরায়েলের পক্ষে ঝুঁকে রয়েছে।
উত্তেজনাপূর্ণ এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক বক্তব্যও জোরদার হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লেবাননে চলমান সামরিক হামলা নিয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
সূত্রগুলোর দাবি, আলোচনার সময় উভয়ের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা হয় এবং ট্রাম্প বেসামরিক নাগরিকদের ক্রমবর্ধমান মৃত্যুর বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি ইসরায়েলের সামরিক কৌশল নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে সংঘাত আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করতে পারে। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং তাদের মিত্র দেশগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক তৎপরতা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
হরমুজ প্রণালীর মতো কৌশলগত সামুদ্রিক রুটে যেকোনো সামরিক পদক্ষেপ বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।










